
২২ বছরের বর্ণাঢ্য ফুটবল ক্যারিয়ারের ইতি টানলেন মেক্সিকান কিংবদন্তি ওচোয়া
মেক্সিকান ফুটবলের অন্যতম বড় প্রতীক ও বিশ্বস্ত দেয়াল খ্যাত গোলরক্ষক গুইলেরমো ওচোয়া পেশাদার ফুটবল থেকে আনুষ্ঠানিক বিদায় ঘোষণা করেছেন। দীর্ঘ ২২ বছরের সুদীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের ইতি টেনে গত মঙ্গলবার (২১ জুলাই) ফুটবলকে বিদায় জানান ৪১ বছর বয়সি এই তারকা।
কয়েক দিন আগেই ৪১ বছরে পা রাখা ওচোয়া আগেই আভাস দিয়েছিলেন যে ২০২৬ বিশ্বকাপই হতে যাচ্ছে তার ক্যারিয়ারের শেষ আন্তর্জাতিক মঞ্চ। টুর্নামেন্ট শেষ হওয়ার পর তার নতুন কোনো ক্লাবে যোগ দেওয়া বা ক্লাব ফুটবল চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে নানামুখী গুঞ্জন উঠলেও শেষ পর্যন্ত পেশাদার ফুটবলের গ্লাভস সম্পূর্ণ তুলে রাখার সিদ্ধান্তই বেছে নেন তিনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় আবেগ চেপে রাখতে পারেননি অভিজ্ঞ এই গোলরক্ষক। তিনি লেখেন, মাঠে তিনি নিজের সবটুকু উজাড় করে দিয়েছেন এবং ক্লাব ও জাতীয় দলের প্রতিনিধিত্ব করার সময় সর্বদা নিজের সেরাটা ঢেলে দিয়েছেন। পোস্টের এক পর্যায়ে তিনি জানান, আজ তিনি নিজের প্রিয় গ্লাভস দুটো চিরতরে তুলে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
গোলপোস্টের নিচে নিজের দুই দশকের অবিশ্বাস্য অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে ওচোয়া বলেন, একজন গোলরক্ষক হওয়ার মূল অর্থই হলো পুরো ৯০ মিনিট ধরে এমন একটা একক মুহূর্তের জন্য ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করা, যখন দল বা দেশের পুরো ভাগ্য নির্ভর করবে কেবল নিজের ওপর। আর সেই সময়টা যখন সামনে এসে দাঁড়ায়, তখন সংশয় বা দ্বিধার কোনো অবকাশ থাকে না।
বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ছয়টি বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া হাতে গোনা কয়েকজন মহাতারকার তালিকায় সগৌরবে নাম লিখিয়েছেন ওচোয়া। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ও লিওনেল মেসির মতো বিশ্বসেরা ফুটবলারদের সঙ্গেই কেবল এই অনন্য রেকর্ড ভাগাভাগি করার কীর্তি রয়েছে তার। ২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপ, ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপ এবং ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে মেক্সিকোর পোস্টের নিচে প্রথম পছন্দের গোলরক্ষক হিসেবে অবিশ্বাস্য সব সেভ করে পুরো বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন তিনি।
২০০৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে মেক্সিকোর ঐতিহ্যবাহী দল ক্লাব আমেরিকার হয়ে ফুটবলের শীর্ষ স্তরে অভিষেক ঘটেছিল ওচোয়ার। সেখানে টানা সাতটি স্মরণীয় মৌসুম কাটানোর পর ২০১১ সালে তিনি যোগ দেন ফরাসি ক্লাব আজাসিওতে। মেক্সিকোয় জন্ম নেওয়া কোনো গোলরক্ষক হিসেবে ইউরোপের শীর্ষস্থানীয় ফুটবল ক্লাবে যোগ দেওয়ার এই দৃষ্টান্ত তিনিই প্রথম স্থাপন করেন।
পরবর্তী সময়ে ইউরোপিয়ান ফুটবলে লম্বা সময় অতিবাহিত করেন তিনি। ইউরোপীয় ক্যারিয়ারে তিনি খেলেছেন স্প্যানিশ ক্লাব মালাগা ও গ্রানাডা, বেলজিয়ামের স্তান্দার্দ লিয়েজ, ইতালির সালেরনিতানা ছাড়াও এভিএস ফুটবল ও এইএল লিমাসোলের মতো ক্লাবে। মাঝে ২০১৯ সালে পুনরায় নিজের শিকড় ক্লাব আমেরিকায় ফিরে এসে সেখানে ২০২২ সাল পর্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে খেলেছেন।
নিজের বিদায়ী বার্তায় স্মৃতিচারণ করে ওচোয়া আরও লিখেছেন, শৈশবের একটি সাধারণ স্বপ্ন তাকে যে এত দূর নিয়ে আসবে তা তিনি কখনো কল্পনাও করেননি। বিদায়বেলায় বুকভরা গর্ব নিয়ে পেছনে তাকানোর অনুভূতি প্রকাশ করে তিনি জানান, কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর ভালোবাসা এবং দেশের প্রতিনিধিত্ব করার পরম তৃপ্তি সঙ্গী করেই তিনি ফুটবলকে বিদায় জানাচ্ছেন।
সদ্য সমাপ্ত ২০২৬ বিশ্বকাপে মূল গোলরক্ষক রাউল রাঙ্গেলের বিকল্প বা ব্যাকআপ হিসেবে মেক্সিকো দলে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিলেন ওচোয়া। মেক্সিকো জাতীয় দলের প্রধান কোচ জাভিয়ের আগুইরে চেক প্রজাতন্ত্রের বিপক্ষে দলের শেষ গ্রুপ পর্বের ম্যাচে শেষ ১৩ মিনিটের জন্য ওচোয়াকে মাঠে নামান।
ম্যাচটি শেষ হওয়ার পরই এক অত্যন্ত আবেগঘন মুহূর্তের সৃষ্টি হয়। যে ঐতিহ্যবাহী এস্তাদিও আজটেকা স্টেডিয়ামে তার পেশাদার ফুটবলের শুভসূচনা হয়েছিল, বিদায়ের প্রাক্কালে ঠিক সেই মাঠের গোলপোস্টে গভীর ভালোবাসায় চুমু খান তিনি। হাঁটু গেড়ে মাঠের ঘাসে বসে পড়লে সতীর্থরা ছুটে এসে তাকে পরম মমতায় জড়িয়ে ধরেন। গ্যালারি থেকে সব দর্শক বিদায় নেওয়ার পরও তিনি মাঠে থেকে যান এবং সেন্ট্রাল সার্কেলে গিয়ে একা দাঁড়িয়ে শেষবারের মতো সবাইকে বিদায় জানান।
নিজের ক্লাব ক্যারিয়ারে মেক্সিকোর ক্লাব আমেরিকার হয়ে মর্যাদাপূর্ণ লিগ শিরোপা জয়ের স্বাদ পেয়েছেন তিনি। পাশাপাশি ইউরোপিয়ান ফুটবলে স্তান্দার্দ লিয়েজের হয়ে জিতেছেন ঐতিহ্যবাহী বেলজিয়ান কাপ। অন্যদিকে মেক্সিকো জাতীয় দলের হয়ে তার অবদান ছিল অতুলনীয়। দলকে রেকর্ড ছয়টি কনকাকাফ গোল্ড কাপ শিরোপা জেতাতে প্রধান ভূমিকা রাখার পাশাপাশি ২০২০ সালের টোকিও অলিম্পিকে মেক্সিকোকে ঐতিহাসিক ব্রোঞ্জ পদক এনে দিতে দুর্দান্ত অবদান রাখেন এই কিংবদন্তি গোলরক্ষক।