
২৮ বছর পর রূপকথা: বিশ্বমঞ্চ কাঁপিয়ে ওসলোতে বীরোচিত সংবর্ধনা পেলেন হালান্ডরা
বিশ্বকাপ ফুটবলের আসরে দীর্ঘ ২৮ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে এবার রীতিমতো রূপকথা তৈরি করেছে নরওয়ে জাতীয় ফুটবল দল। মাঠের পারফরম্যান্সে বিশ্ববাসীকে তাক লাগিয়ে দিয়ে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান অঞ্চলের এই দেশটি প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার অনন্য এক নজির গড়ে। যদিও আমেরিকার মায়ামিতে অনুষ্ঠিত সেই রুদ্ধশ্বাস শেষ আটের লড়াইয়ে ইংল্যান্ডের জুড বেলিংহামের অতিরিক্ত সময়ের নাটকীয় গোলে তাদের বিদায় নিতে হয়েছিল, তবে নরওয়ের এই লড়াকু ফুটবলারদের বীরত্বগাথা ফুটবল ইতিহাসের পাতায় চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। আর এই সোনালী ও ঐতিহাসিক অভিযান শেষে দেশে ফেরার পর আর্লিং হালান্ড ও মার্টিন ওডেগার্ডদের বরণ করে নিতে পুরো নরওয়ে মেতে উঠল এক রাজকীয় ও আবেগময় উৎসবে।
জাতীয় দলের এই অসামান্য অর্জনকে রাজকীয় সম্মান দিতে কোনো ত্রুটি রাখেনি নরওয়ে সরকার ও সাধারণ জনগণ। নরওয়ে ফুটবল দলের অফিশিয়াল ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে প্রকাশিত একটি ভিডিও চিত্রে সেই অভূতপূর্ব উদযাপনের দৃশ্য ফুটে ওঠে। ভিডিওতে দেখা যায়, ফুটবলারদের বহনকারী বিশেষ বিমানটি যখন দেশের আকাশসীমায় প্রবেশ করে, তখন সেটিকে রাজকীয় সম্মান জানিয়ে চারপাশ থেকে পাহারা (এসকর্ট) দিয়ে ওসলো বিমানবন্দর পর্যন্ত নিয়ে আসে নরওয়েজিয়ান বিমানবাহিনীর একঝাঁক যুদ্ধবিমান। রানওয়েতে চাকা ছোঁয়ার পর থেকেই শুরু হয় উৎসবের মূল আবহ। বিমানবন্দরে ফুটবলারদের স্বাগত জানাতে আগে থেকেই উপস্থিত ছিলেন রাজপরিবারের শীর্ষস্থানীয় সদস্যরা এবং হাজার হাজার উচ্ছ্বসিত সমর্থক।
হালান্ডের হাতে খেলনা ‘র্যাকুন’ ও নেট দুনিয়ায় হাসির রোল
বিমান থেকে নামার সময় দলের প্রধান তারকা ও বিশ্বসেরা গোলমেশিন আর্লিং হালান্ডের একটি মজার কাণ্ড উপস্থিত সবার নজর কাড়ে এবং নিমিষেই পরিবেশকে হালকা করে তোলে। দেখা যায়, সবুজ মাঠের রক্ষণভাগের ত্রাস এই স্ট্রাইকারের এক হাতে ধরা ছিল একটি সাধারণ খালি বোতল এবং অন্য হাতে ছিল একটি তুলতুলে খেলনা বা স্টাফড ‘র্যাকুন’। বিশ্বখ্যাত একজন অ্যাথলেটকে এমন সাধারণ ও হাস্যরসাত্মক ভঙ্গিতে বিমান থেকে নামতে দেখে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুহূর্তেই সাড়া পড়ে যায়। ভক্তদের মাঝে এই ছবি ও ভিডিও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল ও হাসির খোরাক জোগায়।
যুবরাজের ঢোল আর ওসলোর বুকে ঐতিহ্যবাহী ‘ভাইকিং রো’
বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা শেষে ওসলোর মূল চত্বরে নরওয়ের রাজপরিবারের সদস্যরা আমজনতার সাথে একাত্ম হয়ে বিশ্বকাপে নিজেদের দলের অসামান্য সাফল্য উদযাপনে শামিল হন। মাঠের ভেতর অধিনায়ক মার্টিন ওডেগার্ড ও হালান্ড যেভাবে ম্যাচ জেতার পর ঐতিহ্যবাহী ও জাদুকরী ‘ভাইকিং রো’ উদযাপনের সুর তুলেছিলেন, দেশের মাটিতেও সেই একই ঐতিহাসিক আবহের পুনরাবৃত্তি ঘটে।
এবারের উদযাপনে রাজকীয় নেতৃত্ব দেন স্বয়ং যুবরাজ হাকোন। তিনি নিজে সাধারণ মানুষের মাঝে এসে বিশাল এক ঢোল বাজিয়ে সমর্থকদের সাথে সুর তোলেন, যা উপস্থিত হাজারো মানুষের মধ্যে উন্মাদনা আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। রাজপরিবারের এমন স্বতঃস্ফূর্ত ও মাটির কাছাকাছি এসে সাধারণ নাগরিকদের সাথে আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার ঘটনাটি পুরো আয়োজনে ভিন্ন এক অনন্য মাত্রা যোগ করে।
খোলা ছাদের বাসে ঐতিহাসিক বিজয় শোভাযাত্রা
রাজকীয় উদযাপনের পর খেলোয়াড়দের জন্য একটি চমৎকার ও সুসজ্জিত খোলা ছাদের বাসের ব্যবস্থা করা হয়। সেই বাসে চেপে ফুটবলাররা পুরো ওসলো শহরজুড়ে এক রঙিন বিজয় শোভাযাত্রায় অংশ নেন। প্রিয় তারকাদের একনজর দেখতে রাস্তার দুই পাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা লক্ষাধিক সমর্থক করতালি ও গগনবিদারী স্লোগানে মুখরিত করে তোলেন চারপাশ। ফুটবলার ও সমর্থকেরা একে অপরকে হাত নেড়ে ও অভিবাদন জানিয়ে নরওয়ের ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে স্মরণীয় এই অভিযানের অংশীদার হওয়ার জন্য ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। নরওয়েবাসীদের এই বাঁধভাঙা ভালোবাসা ও উন্মাদনা প্রমাণ করে দিল, ট্রফি না জিতলেও কোটি মানুষের হৃদয় ঠিকই জয় করে নিয়েছেন হালান্ডরা।