
অদৃশ্য রোগের সঙ্গে লড়েই ১৬ টেস্ট সেঞ্চুরি খাজার
ক্রিকেট মাঠে একজন ব্যাটসম্যানের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে প্রতিপক্ষের গতিময় বোলিং, দুর্বোধ্য স্পিন কিংবা নিজের অফ ফর্ম। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার সাবেক ওপেনার উসমান খাজার লড়াইটা ছিল আরও কঠিন। তাঁর প্রতিপক্ষ ছিল এমন এক রোগ, যা বাইরে থেকে দেখা যায় না, অথচ শরীরকে অসহনীয় যন্ত্রণায় বিপর্যস্ত করে দিতে পারে। মাত্র ২২ বছর বয়সে রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসে আক্রান্ত হয়েছিলেন তিনি। একসময় পরিস্থিতি এমন হয়েছিল যে ১০ মিটার হাঁটাও তাঁর জন্য কঠিন হয়ে পড়েছিল। সেই অবস্থার মধ্য থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ১৬টি টেস্ট সেঞ্চুরি করেছেন এই বাঁহাতি ব্যাটসম্যান।
দীর্ঘদিন নিজের অসুস্থতার কথা গোপন রেখেছিলেন খাজা। সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার টেলিভিশন অনুষ্ঠান ‘অস্ট্রেলিয়ান স্টোরি’তে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জীবনের সেই কঠিন অধ্যায়ের কথা প্রকাশ করেছেন ৩৯ বছর বয়সী এই ক্রিকেটার। তাঁর স্বীকারোক্তিতে উঠে এসেছে শারীরিক যন্ত্রণার পাশাপাশি মানসিক চাপ, অনিশ্চয়তা এবং পেশাদার ক্রিকেটে টিকে থাকার কঠিন বাস্তবতা।
২২ বছর বয়সেই ভয়াবহ রোগের আঘাত
২০০৯ সালে নিউ সাউথ ওয়েলসের হয়ে খেলছিলেন খাজা। অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় দলে জায়গা পাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলেন তরুণ এই ব্যাটসম্যান। ঠিক সেই সময় তাঁর শরীরে ধরা পড়ে রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি অটোইমিউন রোগ, যেখানে শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা ভুলবশত নিজের অস্থিসন্ধির সুস্থ টিস্যুতে আক্রমণ করে। এর ফলে ব্যথা, ফোলা ও প্রদাহ দেখা দিতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে রোগটি দৈনন্দিন চলাফেরাও কঠিন করে তোলে।
খাজার ক্ষেত্রে ব্যথার প্রধান কেন্দ্র ছিল বাঁ হাঁটু। যন্ত্রণা এতটাই তীব্র হয়ে উঠেছিল যে স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলা করাও তাঁর পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। যে তরুণের সামনে তখন পেশাদার ক্রিকেটে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার স্বপ্ন, তাঁকেই ভাবতে হচ্ছিল নিজের স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাওয়ার কথা।
সেই সময়ের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা স্মরণ করে খাজা বলেছেন, ‘আমি সত্যিই ভেবেছিলাম, মারা যাব।’
একজন পেশাদার ক্রিকেটারের জন্য শারীরিক সক্ষমতা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা সহজেই অনুমেয়। দীর্ঘ সময় ব্যাটিং করা, দ্রুত রান নেওয়া, মাঠে দৌড়ানো কিংবা ফিল্ডিংয়ের সময় ক্ষিপ্রতার সঙ্গে নড়াচড়া করা—সবকিছুর জন্য শরীরের ওপর নির্ভর করতে হয়। অথচ খাজার জন্য তখন কয়েক পা হাঁটাও ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। ক্রিকেট ক্যারিয়ার গড়ে তোলার আগেই সেটি থেমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল।
অসুস্থতার কথা গোপন রেখেছিলেন সতীর্থদের কাছেও
রোগটির কথা চিকিৎসকেরা জানতেন। ক্রিকেট প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদেরও বিষয়টি অজানা ছিল না। কিন্তু সতীর্থদের কাছে নিজের অসুস্থতার কথা প্রকাশ করতে চাননি খাজা। তাঁর আশঙ্কা ছিল, বিষয়টি জানাজানি হলে তাঁকে অন্যভাবে দেখা হতে পারে। কেউ হয়তো তাঁর প্রতি বিশেষ আচরণ করবেন, আবার প্রতিপক্ষও তাঁর শারীরিক দুর্বলতার সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে।
এই আশঙ্কা থেকেই নীরব থাকার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। এমনকি ডেভিড ওয়ার্নার ও মাইকেল হাসির মতো ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং সাবেক সতীর্থরাও দীর্ঘদিন তাঁর রোগ সম্পর্কে জানতে পারেননি।
একই ড্রেসিংরুমে সময় কাটানো, একসঙ্গে অনুশীলন করা কিংবা ম্যাচের পর জয় উদ্যাপন করার মধ্যেও নিজের যন্ত্রণার কথা আড়াল করে রেখেছিলেন খাজা। বাইরে থেকে তাঁকে দেখে হয়তো বোঝার উপায় ছিল না, প্রতিদিন কতটা শারীরিক ও মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে তাঁকে।
পেশাদার খেলাধুলায় একজন ক্রিকেটারের সক্ষমতা নিয়ে আলোচনা হয় মূলত তাঁর পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা নিয়ে খেলতে হলে সেই চাপের সঙ্গে যোগ হয় চিকিৎসা, শারীরিক সীমাবদ্ধতা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা। খাজার অভিজ্ঞতা সেই বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে।
ওষুধ ও ইনজেকশনেই ফিরেছিল ক্রিকেটে ফেরার আশা
রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের সঙ্গে লড়াইয়ে শুধু মানসিক দৃঢ়তা যথেষ্ট ছিল না। নিয়মিত ওষুধ গ্রহণ এবং ইনজেকশনের মাধ্যমে চিকিৎসা নিতে হয়েছে তাঁকে। চিকিৎসার সহায়তায় ধীরে ধীরে শারীরিক অবস্থার উন্নতি ঘটে। রোগ ধরা পড়ার প্রায় ছয় মাস পর আবার ক্রিকেট মাঠে ফিরতে সক্ষম হন তিনি।
চিকিৎসার গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে খাজা বলেছেন, ‘ওই ওষুধ না থাকলে আমি আর কোনো দিন ক্রিকেট খেলতে পারতাম না। এমনকি স্বাভাবিক জীবনেও ফিরতে পারতাম না।’
তাঁর এই বক্তব্যে স্পষ্ট, ক্রিকেটে ফিরে আসার পথটি কতটা অনিশ্চিত ছিল। যে চিকিৎসা তাঁকে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সুযোগ দিয়েছিল, সেটিই তাঁর পেশাদার ক্যারিয়ার চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস দীর্ঘমেয়াদি রোগ। উপযুক্ত চিকিৎসা ও নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শের মাধ্যমে অনেক রোগী উপসর্গ নিয়ন্ত্রণে রেখে দৈনন্দিন কাজ চালিয়ে যেতে পারেন। তবে রোগের তীব্রতা ও চিকিৎসায় সাড়া দেওয়ার ধরন ব্যক্তিভেদে আলাদা হতে পারে। খাজার অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, গুরুতর শারীরিক সমস্যার মধ্যেও যথাযথ চিকিৎসা ও পরিকল্পনার সহায়তায় নিজের লক্ষ্য ধরে রাখার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বারবার বাদ পড়েও জাতীয় দলে ফিরেছেন
২০১১ সালের জানুয়ারিতে সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ডে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্ট অভিষেক হয় খাজার। অস্ট্রেলিয়ার হয়ে খেলার দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণ হলেও জাতীয় দলে তাঁর পথচলা কখনোই মসৃণ ছিল না। ক্যারিয়ারের বিভিন্ন সময়ে দল থেকে বাদ পড়েছেন, পারফরম্যান্স নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়েছেন, আবার নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করে দলে ফিরেছেন।
এই ওঠানামার মধ্যেও ব্যাট হাতে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন তিনি। টেস্ট ক্রিকেটে ধারাবাহিকতা ধরে রাখা এবং দীর্ঘ ইনিংস খেলার দক্ষতার কারণে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইনআপে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা করে নেন এই বাঁহাতি ব্যাটসম্যান।
খাজার ক্যারিয়ারের অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায় ২০২১-২২ মৌসুমের অ্যাশেজ সিরিজ। সিডনি টেস্টের দুই ইনিংসেই সেঞ্চুরি করেন তিনি। দীর্ঘ বিরতির পর টেস্ট দলে ফিরে এমন পারফরম্যান্স তাঁকে নতুন করে আলোচনায় নিয়ে আসে। একই সঙ্গে প্রমাণিত হয়, ক্যারিয়ারের কঠিন সময় পেরিয়ে আবারও সর্বোচ্চ পর্যায়ে পারফর্ম করা সম্ভব।
১৬ সেঞ্চুরির আড়ালে লুকিয়ে ছিল দীর্ঘ লড়াই
টেস্ট ক্রিকেটে ৮৮ ম্যাচ খেলে খাজার সংগ্রহ ৬ হাজার ২২৯ রান। সেঞ্চুরি করেছেন ১৬টি। অস্ট্রেলিয়ার হয়ে তাঁর এই পরিসংখ্যান নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য। কিন্তু সংখ্যাগুলোর পেছনে থাকা ব্যক্তিগত সংগ্রামের কথা সতীর্থ, সমর্থক কিংবা ক্রিকেট বিশ্লেষকদের অনেকেরই জানা ছিল না।
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সিডনিতে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে অ্যাশেজের পঞ্চম টেস্ট খেলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় জানান খাজা। যে মাঠে একসময় তাঁর টেস্ট অভিষেক হয়েছিল, সেখানেই আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায় রচনা করেন তিনি। দীর্ঘ পথচলার পর অবসরে গিয়ে এবার নিজের জীবনের এমন এক অভিজ্ঞতা প্রকাশ্যে এনেছেন, যা তাঁর ক্রিকেটীয় অর্জনকে নতুন দৃষ্টিতে দেখতে সাহায্য করে।
অবসরের পর নিজের আত্মজীবনী ‘সবর’ প্রকাশের প্রস্তুতিও তাঁর জীবনের এই অধ্যায়কে সামনে এনেছে। ‘সবর’ একটি আরবি শব্দ, যার অর্থ ধৈর্য। নিজের শারীরিক অসুস্থতা, ক্রিকেটে উত্থান-পতন এবং দীর্ঘদিন ধরে ব্যক্তিগত যন্ত্রণা সামলে এগিয়ে চলার অভিজ্ঞতার সঙ্গে নামটির অর্থের মিল রয়েছে।
অন্যদের সাহস দিতে চান খাজা
নিজের অসুস্থতার কথা প্রকাশের পেছনে শুধু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়ার উদ্দেশ্য নেই। অটোইমিউন রোগে আক্রান্ত মানুষদেরও সাহস দিতে চান সাবেক এই অস্ট্রেলীয় ওপেনার। তাঁর বিশ্বাস, দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা মানেই সব স্বপ্নের সমাপ্তি নয়। উপযুক্ত চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা পেলে অনেকেই নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী এগিয়ে যেতে পারেন।
খাজা বলেছেন, ‘রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস নিয়েও যদি কেউ পেশাদার ক্রিকেটার হিসেবে সর্বোচ্চ পর্যায়ে খেলতে পারে, তাহলে আমার মনে হয়, আরও অনেক মানুষও অনেক কিছু অর্জন করতে পারবে।’
তাঁর কথার গুরুত্ব ক্রিকেটের গণ্ডি ছাড়িয়ে যায়। দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের অনেক সময় শারীরিক সমস্যার পাশাপাশি সামাজিক চাপ ও ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের সঙ্গেও লড়তে হয়। খাজার মতো একজন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারের অভিজ্ঞতা তাঁদের মনে করিয়ে দিতে পারে, অসুস্থতার কারণে জীবনের সম্ভাবনাগুলো পুরোপুরি শেষ হয়ে যায় না।
ক্রিকেটের রেকর্ড বইয়ে উসমান খাজার নামের পাশে থাকবে ৮৮টি টেস্ট, ৬ হাজার ২২৯ রান এবং ১৬টি সেঞ্চুরির হিসাব। কিন্তু তাঁর জীবনের সবচেয়ে কঠিন লড়াইয়ের কোনো স্কোরকার্ড নেই। ২২ বছর বয়সে যখন ১০ মিটার হাঁটাও কঠিন হয়ে পড়েছিল, তখনই শুরু হয়েছিল সেই লড়াই। একদিকে ছিল অসহনীয় ব্যথা, অন্যদিকে ক্রিকেটে টিকে থাকার স্বপ্ন।
সেই অদৃশ্য প্রতিপক্ষের নাম রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস। আর তার বিরুদ্ধে দীর্ঘ লড়াইয়ের মধ্য দিয়েই নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় জয়টি অর্জন করেছেন উসমান খাজা।