ইউরোপে সান মারিনোর বিপক্ষে জয়ের লক্ষ্যে প্রস্তুত বাংলাদেশ

ইউরোপের মাটিতে প্রথমবারের মতো কোনো ইউরোপীয় প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচে অংশ নিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দল। আগামী ৫ জুন অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই ঐতিহাসিক ম্যাচে লাল-সবুজের প্রতিনিধিদের প্রতিপক্ষ ফিফা বিশ্ব র‍্যাংকিংয়ের একেবারে তলানিতে অবস্থান করা দল সান মারিনো। এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রীতি ম্যাচটিকে সামনে রেখে বাংলাদেশ দল তাদের নবনিযুক্ত প্রধান কোচ টমাস ডুলির অধীনে নিবিড়ভাবে নিজেদের প্রস্তুত করছে।

নতুন কোচের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে বাংলাদেশ শিবিরের ভেতরে এখন আমূল পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। এই পরিবর্তনের মূল কেন্দ্রে রয়েছে কোচের আধুনিক ফুটবল দর্শন এবং মাঠের পারফরম্যান্সসহ খেলোয়াড়দের সামগ্রিক মানসিকতায় ইতিবাচক বদল আনার সুনির্দিষ্ট প্রচেষ্টা।

র‍্যাংকিংয়ের সমীকরণ ও প্রধান কোচের কঠোর বার্তা

বাংলাদেশ দলের নতুন প্রধান কোচ টমাস ডুলির রণকৌশল ও বার্তা খেলোয়াড়দের কাছে একেবারেই পরিষ্কার। ফিফা বিশ্ব র‍্যাংকিংয়ের ২১১ নম্বরে অর্থাৎ সবার শেষে থাকা সান মারিনোর বিপক্ষে বাংলাদেশের হারার বা পয়েন্ট হারানোর কোনো সুযোগ নেই বলে তিনি মনে করেন। টমাস ডুলি ইচ্ছাকৃতভাবেই খেলোয়াড়দের মনে এই জয়ের চাপটুকু দিতে চান, যাতে করে তারা মাঠে নিজেদের যোগ্যতা ও দক্ষতার সর্বোচ্চ প্রমাণ দিতে পারে।

আজ বসুন্ধরা কিংস অ্যারেনায় আয়োজিত এক আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে প্রধান কোচ ডুলি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “মাঠের লড়াইয়ে আমাদের দেখিয়ে দিতে হবে যে তাদের এবং আমাদের মধ্যে মূল পার্থক্যটা কোথায়। সান মারিনো কেন বিশ্ব র‍্যাংকিংয়ের সবার শেষে অবস্থান করছে এবং আমরা কেন তাদের চেয়ে এগিয়ে, সেটা আমাদের খেলার মাধ্যমেই প্রমাণ করতে হবে।”

কোচের ফুটবল দর্শন ও বিশেষ কৌশলগত পরিকল্পনা

সান মারিনো র‍্যাংকিংয়ের তলানিতে থাকলেও তাদের মাঠের শক্তি নিয়ে পুরোপুরি অসচেতন নন বাংলাদেশ কোচ। বিশেষ করে সান মারিনোর ফুটবলারদের শারীরিক উচ্চতা এবং সেট পিসে তাদের সক্ষমতা ও কার্যকারিতা নিয়ে বেশ সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন টমাস ডুলি। এই শারীরিক প্রতিকূলতা কাটিয়ে উঠতে তিনি চান বাংলাদেশ দল যেন মাঠের ঘাস ঘেঁষে অর্থাৎ মাটি কামড়ে নিখুঁত পাসিং ফুটবল খেলে।

বর্তমান আধুনিক ফুটবলের আদলে $৪-২-৩-১$ ছকে বল পজেশন বা বল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে ধরে রেখে আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলার ওপর তিনি বিশেষ জোর দিচ্ছেন। টমাস ডুলি নিজের ফুটবল কৌশল ব্যাখ্যা করে সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “আমি মাঠের ভেতর শুধু ফুটবলের পেছনে দৌড়াতে চাই না, আমি প্রকৃতপক্ষে ফুটবল খেলতে চাই। আর এই উদ্দেশ্যে মাঠে আমাদের পাসিং এবং রিসিভিং পাসের নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত নিখুঁত ও নির্ভুল হতে হবে।” তিনি বিশ্বাস করেন, বল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে খেললে প্রতিপক্ষের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করা অনেক বেশি সহজ হবে।

কোচের দর্শনে জামালের আস্থা ও ডিফেন্স লাইনের প্রস্তুতি

দলীয় প্রস্তুতি ও ভিডিও অ্যানালাইসিস:

  • যোগাযোগ ব্যবস্থা: নতুন কোচ খেলোয়াড়দের নিয়ে অনেক চেষ্টা করছেন। তিনি নিয়মিত দলগত মিটিং করছেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী খেলোয়াড়দের সাথে ব্যক্তিগতভাবে ওয়ান-টু-ওয়ান অর্থাৎ এককভাবে কথা বলছেন। মাঠে নামার পর তিনি আসলে কী ধরণের পারফরম্যান্স চান, তা একদম পরিষ্কারভাবে বুঝিয়ে দিচ্ছেন।

  • ভুল সংশোধন: মাঠে খেলোয়াড়দের করা পূর্বের ভুলগুলো শুধরে দেওয়ার জন্য ভিডিও অ্যানালাইসিসের বা চিত্র বিশ্লেষণের দারুণ ব্যবহার করছেন প্রধান কোচ টমাস ডুলি।

  • রক্ষণভাগের উন্নতি: অতীতে বাংলাদেশ দল কীভাবে খুব সাধারণ ও সিলি গোল হজম করেছে, তা ভিডিও অ্যানালাইসিস দিয়ে দেখানো হচ্ছে। কোচ নিজে খেলোয়াড় জীবনে একজন ডিফেন্ডার ছিলেন, তাই রক্ষণভাগ নিয়ে তাঁর অগাধ জ্ঞান ডিফেন্ডারদের দারুণ কাজে দিচ্ছে।

ইউরোপ সফর ও প্রবাসী খেলোয়াড়দের অন্তর্ভুক্তি

প্রীতি ম্যাচটি খেলার উদ্দেশ্যে আগামীকাল রাতের ফ্লাইটে ইতালির রোম হয়ে সান মারিনোর উদ্দেশে দেশ ছাড়বে বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দল। এই সফরে বাংলাদেশ দলের সাথে সরাসরি সান মারিনোতে যোগ দেবেন তিন প্রবাসী ফুটবলার—হামজা চৌধুরী, শমিত শোম এবং জায়ান আহমেদ। আগামী ২ জুন এই তিন ফুটবলার দলের ক্যাম্পে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে।

সব মিলিয়ে নতুন প্রধান কোচের অধীনে একটি সম্পূর্ণ নতুন শুরুর অপেক্ষায় দিন গুনছে বাংলাদেশ ফুটবল দল। ইউরোপের মাটিতে প্রথম কোনো ম্যাচ খেলা নিয়ে খেলোয়াড়দের মধ্যে রয়েছে বাড়তি রোমাঞ্চ ও উদ্দীপনা। অধিনায়ক জামাল ভূঁইয়া দলের মূল লক্ষ্য সম্পর্কে গণমাধ্যমকে বলেন, “আমাদের জন্য সবকিছুই নতুন এবং এটি একটি নতুন শুরু। আমি আমার সেরাটা উজাড় করে দেব। অবশ্যই আমরা সামনের ম্যাচটিতে জয়লাভ করতে চাই, কারণ প্রথমবারের মতো আমরা ইউরোপের মাটিতে খেলতে যাচ্ছি। আর আমাদের নতুন কোচেরও এটি প্রথম ম্যাচ। তাই কোচের অভিষেক ম্যাচটিকে স্মরণীয় করতে আমাদের জিততেই হবে।”

Leave a Comment