ইতালিয়ান ফুটবলে গভীর সংকট ও পতনের সময়

ইতালিয়ান ফুটবল বর্তমানে বহুমাত্রিক সংকটের মধ্যে দিয়ে অতিক্রম করছে, যা জাতীয় দল ও ক্লাব—উভয় পর্যায়েই প্রতিফলিত হয়েছে। চারবারের বিশ্বকাপজয়ী দেশটি টানা তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের মূল পর্বে জায়গা করে নিতে ব্যর্থ হয়েছে। একই সঙ্গে ইউরোপীয় ক্লাব প্রতিযোগিতাগুলোতেও ইতালির প্রতিনিধিদের ধারাবাহিক ব্যর্থতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিশ্লেষকদের মতে, গত চার দশকের মধ্যে এটি ইতালিয়ান ফুটবলের সবচেয়ে দুর্বল সময়গুলোর একটি।

চলতি মৌসুমে ইউরোপা লিগের কোয়ার্টার ফাইনালে ইতালির ক্লাব বোলোনিয়া দুই লেগ মিলিয়ে ৭-১ গোল ব্যবধানে অ্যাস্টন ভিলার কাছে পরাজিত হয়। একই সময়ে কনফারেন্স লিগে ফিওরেন্তিনা ক্রিস্টাল প্যালেসের বিপক্ষে দুই লেগ মিলিয়ে ৪-২ গোলে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নেয়। এর ফলে ইউরোপের তিনটি প্রধান ক্লাব প্রতিযোগিতা—চ্যাম্পিয়নস লিগ, ইউরোপা লিগ ও কনফারেন্স লিগ—কোনোটিতেই ইতালির কোনো দল সেমিফাইনালে পৌঁছাতে পারেনি।

এর আগে চ্যাম্পিয়নস লিগে ইতালির শেষ প্রতিনিধি হিসেবে থাকা আতালান্তাও শেষ ষোলো থেকে বিদায় নেয়। ১৯৮৬-৮৭ মৌসুমের পর এই প্রথম এমন পরিস্থিতি তৈরি হলো, যখন ইউরোপীয় প্রতিযোগিতার কোনো সেমিফাইনালে ইতালিয়ান ক্লাবের উপস্থিতি নেই।

ইউরোপীয় প্রতিযোগিতায় ইতালিয়ান ক্লাবগুলোর ফলাফল

প্রতিযোগিতাক্লাবপ্রতিপক্ষফলাফল (দুই লেগে)পর্যায়
ইউরোপা লিগবোলোনিয়াঅ্যাস্টন ভিলা৭-১ পরাজয়কোয়ার্টার ফাইনাল
কনফারেন্স লিগফিওরেন্তিনাক্রিস্টাল প্যালেস৪-২ পরাজয়কোয়ার্টার ফাইনাল
চ্যাম্পিয়নস লিগআতালান্তাউল্লেখ নেইবিদায়শেষ ষোলো

জাতীয় দলের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি অনুকূল নয়। ২০২৬ বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের প্লে-অফ ফাইনালে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার কাছে টাইব্রেকারে ৪-১ ব্যবধানে হেরে মূল পর্বে খেলার সুযোগ হারায় ইতালি। নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময় শেষে ম্যাচটি ১-১ গোলে সমতায় থাকলেও পেনাল্টি শুটআউটে ব্যর্থতা তাদের বিশ্বকাপ স্বপ্ন ভেঙে দেয়।

এই ব্যর্থতার পর জাতীয় দলের কোচ জেনারো গাত্তুসো পদত্যাগ করেন। পাশাপাশি ইতালি ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি গ্যাব্রিয়েল গ্রাভিনাও দায়িত্ব ছাড়েন। তিনি স্বীকার করেন, ইতালির ঘরোয়া ফুটবল কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং সামগ্রিক সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে।

পরিস্থিতি নিয়ে ইতালির অভিজ্ঞ কোচ ফাবিও ক্যাপেলো মন্তব্য করেন যে, বর্তমান অবস্থা আরও খারাপ হওয়ার সুযোগ নেই। একই সঙ্গে কার্লো আনচেলত্তি উল্লেখ করেন, ইতালিয়ান ফুটবল কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় পিছিয়ে পড়েছে। তার মতে, সিরি আ লিগের আর্থিক সীমাবদ্ধতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার অভাব বিদেশি খেলোয়াড়দের আকর্ষণ কমিয়ে দিয়েছে।

অবকাঠামোগত সমস্যাও এই সংকটকে আরও গভীর করেছে। ২০৩২ ইউরো তুরস্কের সঙ্গে যৌথভাবে আয়োজনের প্রস্তুতি চললেও স্টেডিয়াম উন্নয়ন প্রকল্পগুলো নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী এগোচ্ছে না। এই প্রেক্ষাপটে উয়েফা সভাপতি আলেক্সান্দার সেফেরিন সতর্ক করেছেন যে, সময়মতো কাজ সম্পন্ন না হলে ইতালিতে ইউরো আয়োজন ব্যাহত হতে পারে।

বর্তমানে ইতালিয়ান ফুটবল প্রশাসন একটি রূপান্তরপর্বের মধ্যে রয়েছে। ফেডারেশন নির্বাচনের আগে নতুন কোচ বা নেতৃত্ব নিয়োগের সম্ভাবনা কম। ফলে সামগ্রিকভাবে ইতালিয়ান ফুটবল এক ধরনের অনিশ্চয়তা ও অচলাবস্থার মধ্যে অবস্থান করছে, যেখানে ভবিষ্যৎ পুনর্গঠনের দিকনির্দেশনা এখনো স্পষ্ট নয়।

Leave a Comment