নাসার প্রযুক্তিতে নেইমারের চোট সারানোর মরিয়া চেষ্টা

চলতি বছরের আন্তর্জাতিক ফুটবল বিশ্বকাপ শুরু হতে আর মাত্র কয়েক দিন বাকি রয়েছে। বিশ্ব ফুটবলের এই মহোৎসবের চূড়ান্ত ক্ষণগণনা যখন বিশ্বজুড়ে চলছে, ঠিক তখনই সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে নিজের শারীরিক ফিটনেস ফিরে পাওয়ার এক কঠিন যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন ব্রাজিলের তারকা ফুটবলার নেইমার। ডান পায়ের কাফ ইনজুরি বা পেশির চোট থেকে দ্রুত মুক্তি পেতে এবং আসন্ন বিশ্বকাপের মঞ্চে মাঠে নামার সম্ভাবনা সশরীরে টিকিয়ে রাখতে এই ফুটবলার বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় মহাকাশ সংস্থা বা মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার (NASA) বিশেষ প্রযুক্তি অনুসরণে তৈরি একটি অত্যন্ত অত্যাধুনিক ও চিকিৎসাবিজ্ঞান সম্মত যন্ত্র ব্যবহার করছেন। এই বিশেষ প্রযুক্তির ব্যবহার ৩৪ বছর বয়সী এই অভিজ্ঞ ও দক্ষ ফরোয়ার্ডের বিশ্বকাপে অংশগ্রহণের আশাকে ফুটবল ভক্ত, সমর্থক ও ফুটবল বোদ্ধাদের মাঝে আরও অনেক বেশি উজ্জ্বল ও আশাব্যঞ্জক করে তুলেছে।

ব্রাজিলিয়ান শীর্ষস্থানীয় ও নির্ভরযোগ্য ক্রীড়া সংবাদমাধ্যম ‘গ্লোবো এসপোর্তে’-এর প্রকাশিত একটি বিশেষ ও বিস্তারিত প্রতিবেদন থেকে নেইমারের এই আধুনিক চিকিৎসানির্ভর পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার যাবতীয় তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, নেইমারের ডান পায়ের কাফ ইনজুরির দ্রুত নিরাময় ও পুনর্বাসন প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে নাসার প্রযুক্তি থেকে অনুপ্রাণিত একটি বিশেষ ‘অ্যান্টি-গ্র্যাভিটি ট্রেডমিল’ (যা মূলত মহাকর্ষহীন অবহেলাকারী দৌড়ানোর যন্ত্র হিসেবে পরিচিত) ব্যবহার করা হচ্ছে। গত শনিবার (৬ জুন) ব্রাজিলের এই মহাতারকা ফুটবলার স্বশরীরে এই বিশেষ ও আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন যন্ত্রটির সাহায্যে নিজের প্রথম পর্যায়ের পুনর্বাসন অনুশীলন সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন।

অ্যান্টি-গ্র্যাভিটি ট্রেডমিলের কার্যকারিতা ও প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য

নেইমারের পায়ের চোট নিরাময়ে ব্যবহৃত এই অ্যান্টি-গ্র্যাভিটি ট্রেডমিলটির কার্যপ্রণালী অত্যন্ত আধুনিক, বিজ্ঞানসম্মত এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী আবিষ্কার। এই বিশেষ যন্ত্রটির মূল কার্যকারিতা ও প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, এটিতে অনুশীলনের সময় সংশ্লিষ্ট খেলোয়াড়ের শরীরের ওজনের একটি বিশাল বা বড় অংশ কৃত্রিম উপায়ে কমিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়। মহাকর্ষ বলের প্রভাব সাময়িকভাবে ও কৃত্রিম উপায়ে কমিয়ে দেওয়ার কারণে ইনজুরিগ্রস্ত বা চোটাক্রান্ত স্থানে শরীরের স্বাভাবিক ওজনজনিত কোনো চাপ বা অতিরিক্ত ধকল পড়ে না।

এর ফলে একজন চোটপ্রাপ্ত খেলোয়াড় তার স্বাভাবিক শারীরিক সক্ষমতার তুলনায় অনেক কম ঝুঁকিতে এবং সম্পূর্ণ ব্যথামুক্ত উপায়ে দৌড়াতে, হাঁটতে ও বিভিন্ন ধরনের শারীরিক কসরত করতে পারেন। চিকিৎসা ও ক্রীড়া বিজ্ঞানীদের সুনির্দিষ্ট মতে, দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের শীর্ষস্থানীয়, নামী-দামী ও পেশাদার ক্রীড়াবিদগণ জটিল চোট থেকে দ্রুত সেরে ওঠার পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় নাসার এই বিশেষ প্রযুক্তিটি অত্যন্ত নিয়মিতভাবে ব্যবহার করে আসছেন। বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে এর কার্যকারিতা ও উপযোগিতা বহুবার প্রমাণিত হওয়ার পর, ইতিমধ্যে ব্রাজিলের স্থানীয় কয়েকটি শীর্ষ ফুটবল ক্লাবও তাদের নিজস্ব মেডিকেল সেন্টার বা চিকিৎসা সুবিধার আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে এই বিশেষ অ্যান্টি-গ্র্যাভিটি ট্রেডমিলটি যুক্ত করেছে এবং খেলোয়াড়দের সুরক্ষায় এর ব্যবহার নিশ্চিত করছে।

নেইমারের মেডিকেল পরীক্ষা ও পরবর্তী পুনর্বাসন পরিকল্পনা

নেইমারের শারীরিক অবস্থার বর্তমান পরিস্থিতি এবং কাফ ইনজুরির সর্বশেষ অগ্রগতি নিখুঁত ও বৈজ্ঞানিকভাবে মূল্যায়নের জন্য আজ সোমবার (৮ জুন) একটি নতুন ইমেজিং পরীক্ষা বা আধুনিক স্ক্যান করা হবে। ব্রাজিল জাতীয় ফুটবল দলের মেডিকেল টিমের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে যে, এই দিন ধার্যকৃত ইমেজিং পরীক্ষার ফলাফলের ওপর ভিত্তি করেই মূলত নেইমারের পরবর্তী পুনর্বাসন, ব্যায়াম ও চিকিৎসার চূড়ান্ত দীর্ঘমেয়াদী বা স্বল্পমেয়াদী পরিকল্পনা নির্ধারণ করা হবে।

যদি সোমবারের এই মেডিকেল রিপোর্টের ফলাফলে চিকিৎসকেরা তার চোটের সন্তোষজনক অগ্রগতি দেখতে পান এবং তাকে সবুজ সংকেত বা মাঠে খেলার চূড়ান্ত অনুমতি প্রদান করেন, তবেই নেইমার দলের বাকি সদস্যদের সঙ্গে পুরোদমে মাঠের শারীরিক অনুশীলনে অংশ নিতে পারবেন। চিকিৎসকদের সবুজ সংকেত বা মেডিকেল ক্লিয়ারেন্স পাওয়ার পর মাঠের অনুশীলনে তার উন্নতির গতির ওপর গভীর নজর রাখা হবে এবং এর ওপর নির্ভর করে ধীরে ধীরে তাকে বল নিয়ে মূল দলীয় অনুশীলনে ফেরার অনুমতি দেওয়া হবে। তবে এই পুরো প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সতর্কতার সাথে এবং কঠোর সুরক্ষার মধ্য দিয়ে পর্যবেক্ষণ করা হবে বলে মেডিকেল টিম সূত্রে সুনির্দিষ্টভাবে জানা গেছে।

বিশ্বকাপ এবং ব্রাজিল শিবিরের প্রত্যাশা ও ম্যাচের সময়সূচী

ব্রাজিল জাতীয় ফুটবল দলের বর্তমান প্রধান কোচ কার্লো আনচেলত্তি আগেই সংবাদমাধ্যমকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছিলেন যে, নেইমারের শারীরিক অবস্থা ও চোটের বর্তমান গতিশীল উন্নতি নিয়ে দলের টিম ম্যানেজমেন্ট এবং কোচিং স্টাফরা যথেষ্ট ইতিবাচক ও আশাবাদী। যদিও আসন্ন বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে নেইমারের শুরুর একাদশে থাকা কিংবা সরাসরি মাঠে নামার বিষয়টি এখনও চিকিৎসাগত কারণে শতভাগ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি, তবুও সেলেসাও বা ব্রাজিল শিবিরের প্রবল বিশ্বাস যে, দলের সবচেয়ে অভিজ্ঞ, দক্ষ ও নির্ভরযোগ্য এই তারকা ফুটবলার নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে মাঠে ফিরতে পারবেন।

বিশ্বকাপের আনুষ্ঠানিক সময়সূচী অনুযায়ী, আগামী ১৩ জুন মরক্কোর বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের ম্যাচ দিয়ে নিজেদের বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করবে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। মরক্কোর বিপক্ষে এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ ম্যাচের আগে নেইমারের ম্যাচ ফিটনেস এবং শারীরিক অবস্থা কেমন থাকবে, তা নিখুঁতভাবে জানতে এখন পুরো ফুটবল বিশ্বের নজর আটকে আছে ব্রাজিল দলের আসন্ন মেডিকেল রিপোর্টের ওপর। নেইমারের সুস্থতা এবং মাঠে ফেরার সক্ষমতার ওপরই মূলত নির্ভর করছে মরক্কোর বিরুদ্ধে ব্রাজিলের দলীয় রণকৌশল ও আক্রমণভাগের চূড়ান্ত রূপরেখা।

Leave a Comment