ইউরোপীয় ফুটবলের সাবেক প্রভাবশালী নেতা ও উয়েফার সাবেক সভাপতি মিশেল প্লাতিনি আবারও বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার বর্তমান সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর তীব্র সমালোচনা করেছেন। তাঁর অভিযোগ, ইনফান্তিনোর নেতৃত্বে ফিফায় গণতান্ত্রিক চর্চা ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে এবং সংস্থাটি ধীরে ধীরে এককেন্দ্রিক ও স্বৈরাচারী সিদ্ধান্তের দিকে ঝুঁকছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্লাতিনি বলেন, ইনফান্তিনো এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি ক্ষমতাকেন্দ্রিক এবং ধনী ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী মহলের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট।
প্লাতিনির ভাষায়, ইনফান্তিনো দ্বিতীয় সারির নেতা হিসেবে দক্ষ ছিলেন, কিন্তু শীর্ষ নেতৃত্বে তাঁর সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট। তিনি বলেন, উয়েফায় মহাসচিব হিসেবে ইনফান্তিনো দক্ষতার পরিচয় দিলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তিনি মূলত অর্থ ও ক্ষমতার প্রভাবকে প্রাধান্য দেন। প্লাতিনির মতে, এই প্রবণতা তাঁর চরিত্রগত দুর্বলতা, যা এখন ফিফার নীতিনির্ধারণে সরাসরি প্রতিফলিত হচ্ছে।
করোনাভাইরাস মহামারির পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে বলে মন্তব্য করেন প্লাতিনি। তাঁর দাবি, বৈশ্বিক সংকটকে কেন্দ্র করে জরুরি সিদ্ধান্ত নেওয়ার অজুহাতে ইনফান্তিনো ক্ষমতা আরও কেন্দ্রীভূত করেছেন। এর ফলে ফিফার নির্বাহী কাঠামোতে আলোচনা ও বিরোধী মতের জায়গা সংকুচিত হয়েছে।
২০২৬ সালের বিশ্বকাপ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে আয়োজনের সিদ্ধান্ত এবং এর আগে ইনফান্তিনোর যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্ন তোলেন প্লাতিনি। বিশেষ করে একটি নতুন ‘ফিফা শান্তি পুরস্কার’ চালু করে বিশ্বকাপ ড্র অনুষ্ঠানে ট্রাম্পকে সেই পুরস্কার দেওয়ার ঘটনাকে তিনি রাজনৈতিক পক্ষপাতের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
২০১৬ সালে দুর্নীতি কেলেঙ্কারিতে জড়ানো সেপ ব্ল্যাটারের উত্তরসূরি হিসেবে ইনফান্তিনো ফিফার দায়িত্ব নেন। প্লাতিনির মতে, ব্ল্যাটারের সময়ে নানা বিতর্ক থাকলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণে তুলনামূলকভাবে বেশি আলোচনা ও অংশগ্রহণের সুযোগ ছিল। তিনি বলেন, ব্ল্যাটারের মূল সমস্যা ছিল ক্ষমতায় দীর্ঘদিন থাকার আকাঙ্ক্ষা, তবে ফুটবলের প্রতি তাঁর আবেগ প্রশ্নাতীত ছিল।
বর্তমান ফুটবল প্রশাসকদের ভূমিকা নিয়েও সমালোচনা করেন প্লাতিনি। তাঁর মতে, আজকের অনেক প্রশাসকই খেলাটিকে ভালোবাসার চেয়ে প্রশাসনিক পদ ও ক্ষমতাকে বেশি গুরুত্ব দেন। ফুটবল হোক বা অন্য কোনো খেলা—তাতে তাঁদের ব্যক্তিগত আগ্রহ খুব বেশি নয়।
ইনফান্তিনোর সঙ্গে প্লাতিনির দ্বন্দ্ব দীর্ঘদিনের। প্লাতিনির অভিযোগ, ব্ল্যাটারের কাছ থেকে পাওয়া দুই মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁর অঘোষিত অর্থের বিষয়টি সুইস প্রসিকিউটরদের জানিয়ে ইনফান্তিনো ইচ্ছাকৃতভাবে তাঁর ফিফা সভাপতি হওয়ার পথ রুদ্ধ করেছিলেন। এই পুরোনো বিরোধ এখন নতুন করে বিশ্ব ফুটবলের রাজনীতিকে আলোচনার কেন্দ্রে এনেছে।
ফিফা নেতৃত্ব ও সমালোচনার তুলনামূলক চিত্র
| বিষয় | সেপ ব্ল্যাটার | জিয়ান্নি ইনফান্তিনো |
|---|---|---|
| নেতৃত্বের ধরন | দীর্ঘমেয়াদি, বিতর্কিত | কেন্দ্রীয় ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক |
| গণতান্ত্রিক চর্চা | তুলনামূলক বেশি আলোচনা | সীমিত পরিসর |
| রাজনৈতিক সম্পর্ক | কম প্রকাশ্য | উচ্চপর্যায়ের ঘনিষ্ঠতা |
| সমালোচনার ধরন | দুর্নীতি ও ক্ষমতার লোভ | স্বৈরাচার ও পক্ষপাত |
এই প্রেক্ষাপটে প্লাতিনির বক্তব্য নতুন করে প্রশ্ন তুলছে—বিশ্ব ফুটবলের শাসনব্যবস্থা কি সত্যিই গণতন্ত্র থেকে সরে গিয়ে এককেন্দ্রিক ক্ষমতার দিকে এগোচ্ছে?
