আজকের আলোচনার বিষয় ফুটবল খেলার রেফারি, ফুটবল খেলার পঞ্চম আইন।
ফুটবল খেলার রেফারি । ফুটবল খেলার পঞ্চম আইন । খেলাধুলার আইন
আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী ফুটবল খেলা পরিচালনা করার জন্য নির্ধারি প্রতিযোগিতা খেলার আয়োজক সংগঠক সংস্থা কর্তৃক নিযুক্ত ব্যক্তিকে রেফারি বল হয়। ফুটবল খেলা চলাকালীন সময়ে মাঠের সর্বোচ্চ ক্ষমতাবান ব্যক্তিই হলো ‘রেফারি’।
- রেফারি খেলা পরিচালনার জন্য মাঠে নামা মাত্রই শুধু খেলা, খেলোয়াড়, নির্বাচন, এবং লাইন্সম্যানদ্বয়ের উপরেই কর্তৃত্ব করার ক্ষমতা রাখেন এমন কি ঐ নির্ধারিত সময়ে মাঠে কর্তব্যরত পুলিশ বাহিনীর উপর হুকুমজারী করার ক্ষমতাও রাখেন। তা ছাড়া খেলা চলাকালীন সময়ে রেফারির সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অথবা খেলার ব্যাপারে কর্তৃপক্ষেরও হস্তক্ষেপ চলবে না।
- রেফারি দুজন লাইন্সম্যানের সাহায্যে খেলা পরিচালনা করবেন। তাছাড়া চতুর্থ বা স্ট্যান্ডবাই রেফারি মাঠের মধ্যে রেখার বাইরে নির্দিষ্ট স্থানে বসে তার নির্ধারিত কর্তব্য ও দায়িত্ব পালন করবেন।
- খেলা আরম্ভ হবার পূর্বেই রেফারি ও লাইন্সম্যান প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহনকারী দলের ড্রেসিং রুমে বা মাঠে প্রবেশের পূর্বে খেলোয়াড়দের হাতের আংটি তাবিজ, গলার চেইন প্রভৃতি পরা থাকলে এগুলো খুলে ফেলার নির্দেশ দেবেন এবং সীন গার্ড ও মোজা হাঁটুর নিচ পর্যন্ত আছে কি না এবং হাতের নখ সঠিকভাবে কাটা আছে কি না পরীক্ষা করে। দেখবেন। অর্থাৎ খেলোয়াড়ের শরীরে এবং বুটে আঘাত লাগার মত দ্রব্যাদি আছে কি না তা পরীক্ষা করে দেখবেন। যদি কোন খেলোয়াড় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার সময় তাদের সাথে অসদাচরণ বা দুর্ব্যবহার করে তবে তাকে ঐ খেলা হতে রেফারি বিরত রাখতে পারবেন। তবে তার পরিবর্তে অন্য খেলোয়াড় খেলতে পারবে।
- রেফারি মাঠে প্রবেশের পরে (খেলা শুরু হবার পূর্বে) কোন খেলোয়াড় যদি অভদ্র ব্যবহার বা অসদাচরণ করে, তবে রেফারি ইচ্ছে করলে তাকে ঐ খেলায় অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত রাখতে পারবেন। তবে তার পরিবর্তে অন্য খেলোয়াড় খেলতে পারবে।
- যদি খেলা চলাকালে কোন কারণে রেফারি অপরাগ হন তখন (ফিফার বর্তমান আইন অনুযায়ী) স্ট্যান্ডবাই রেফারি তার হয়ে খেলা পরিচালনা করবেন।
- খেলা আরম্ভ হবার পূর্বে রেফারি তার লাইন্সম্যানদ্বয়ের সাথে আলোচনা করে কার্যক্রম ও দায়িত্ব ঠিক করে নেবেন। লাইন্সম্যানদ্বয়কে গোল পোস্টের জাল ও খেলার মাঠের দু’পাশ ও দাগগুলো এবং খেলার সরঞ্জাম পরীক্ষা করার ভার দেবেন এবং কে কোন পার্শ্বরেখায় থাকবেন তা ঠিক করে দেবেন।
- খেলা আরম্ভের পূর্বে রেফারি খেলার জন্য উপযুক্ত বল মনোনীত করবেন, খেলার জন্য বল মনোনয়নে রেফারির সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।
- খেলা আরম্ভের জন্য উভয় দলের অধিনায়কের সামনে রেফারি মুদ্রা নিক্ষেপের মাধ্যমে টস করবেন। টসে জয়ী দল তাদের ইচ্ছেমত মাঠের যে কোন দিন বেছে নেবে এবং প্রারম্ভিক কিকের সুযোগ পাবে।
- রেফারি ঘড়ি ধরে হিসেব রেখে নির্ধারিত সময়ে খেলা আরম্ভ ও শেষ করবেন এবং খেলার মধ্য সময়ে বিরতি দেবেন।
- রেফারির মতে কোন কারণে বা দুর্ঘটনায় খেলার কিছু সময় নষ্ট হলে নষ্ট সময়টুকু খেলিয়ে রেফারি খেলার নির্ধারিত সময়ের ঘাটতি পূরণ করবেন। মধ্য বিরতির পূর্বের নষ্ট সময় মধ্য বিরতির আগে এবং বিরতির পরের নষ্ট সময় মধ্য বিরতির পরে যোগ করে খেলাবেন।
- রেফারির দেখা প্রথম প্রারম্ভিক কিকের নির্দেশের সময় থেকে খেলা শেষ না। হওয়া পর্যন্ত খেলার মাঠে রেফারির মতামত ও সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য করা হবে।
- খেলা চলার সময় রেফারির বিনা অনুমতিতে মাঠ থেকে কোন খেলোয়াড় বেরিয়ে গেলে এবং পুনঃপ্রবেশ করলে রেফারি তাকে সতর্ক করবেন বা সাময়িকভাবে মাঠের বাইরে রাখতে পারেন।
- কথায়, কাজে এবং ব্যবহারে খেলোয়াড় রেফারির কোন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বিরাগ বা অসন্তুষ্টি দেখালে রেফারি তাকে সতর্ক করে দেবেন।
- কোন খেলোয়াড় প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়ের প্রতি অসদাচরণ করলে রেফারি অপরাধী খেলোয়ারকে শান্তি দিলে যার প্রতি অসদাচরণ করা হয়েছে সেই খেলোয়াড় সন্তুষ্ট না হয়ে আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে প্রতি হিংসাপরায়নভাবে পাল্টা অসদাচরণ করলে প্রথম অসদাচরণের উপর নেয়া রেফারির সিদ্ধান্ত বলবৎ থাকবে এবং রেফারি দ্বিতীয় অসদাচরণের বিরুদ্ধে অসদাচরণের গুরুত্বানুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবেন। কেননা একই সময়ে দু’রকমের অপরাধ আইন অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ ।
- খেলা চলাকালে কোন খেলোয়াড় অপর পক্ষের কিক মারার সময় সামনে অঙ্গ তুমি করলে, লাফালে জোরে চিৎকার ইত্যাদি করে অসুবিধার সৃষ্টি করলে রেফারি সংশ্লিষ্ট খেলোয়াড়কে সতর্ক করে দেবেন বা হলুদ কার্ড দেখাতে পারেন।
- খেলার সময় কোন খেলোয়াড় মারাত্মকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হলে রেফারি সময়িকভাবে খেলা বন্ধ রাখবেন এবং যত শীঘ্র সম্ভব আহত খেলোয়াড়কে মাঠ থেকে সরিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা করবেন এবং সাথে সাথে খেলা শুরু করার ব্যবস্থা নেবেন।
- কোন খেলোয়াড় খেলা চলাকালে ব্যথা পাওয়ার ভান করে সমর্থকদের উত্তেজনা এবং সহানুভূতি যোগাতে চেষ্টা করেছে বলে রেফারি যদি মনে করেন তবে উক্ত খেলোয়াড়কে সাবধান বা হলুদ কার্ড দেখাতে পারবেন ।
- রেফারি যেটা ব্যক্তিগতভাবে দেখতে পারেননি বা তার দৃষ্টিতে আসেনি সে ক্ষেত্রে রেফারি ইচ্ছে করলে লাইন্সম্যানদ্বয়ের মতামত নিতে পারবেন।
- রেফারি লাইন্সম্যানের সংকেত গ্রহণ না করলেও হাত উঠিয়ে লাইন্সম্যানের সংকেত দেখছেন বলে জানাবেন ।
- প্রত্যেক খেলোয়াড় পূর্ণ খেলার আধমম্ভাধি সময়ে বিশ্রাম পাবার অধিকার আছে। তাই রেফারি অবশ্যই সে সুযোগ দেবেন। অতিরিক্ত সময়ের খেলায় দু’দলের মাঠ অদল-বদল ছাড়া কোন বিশ্রাম নেই।
- প্রারম্বিক-কিক, পেনাল্টি কিক এবং কমন বলের সময় রেফারি অবশ্যই বাঁশি বাজিয়ে সংকেত দেবেন।
- লীগ খেলা ছাড়া অমীমাংসিতভাবে খেলা শেষ হলে অতিরিক্ত সময়ে খেলার জন্য রেফারি আবার টস করে খেলা শুরু করবেন।
- খেলতে খেলতে খেলোয়াড়ের বুট খুলে গেলে অকুস্থল থেকে রেফারি ইনডিরেক্ট-কিক করার নির্দেশ দেবেন।
ইচ্ছাকৃত হ্যান্ডবল করে খেলার সৌন্ধর্য নষ্ট করলে রেফারি অপরাধী খেলোয়াড়কে হলুদ কার্ড প্রদর্শন করে তার বিরুদ্ধে ফ্রি-কিক করার নির্দেশ দেবেন। - খেলা চলাকালে কোন ব্যক্তি, প্রশিক্ষক মাঠের প্রান্ত বা পার্শ্ব রেখায় দাঁড়িয়ে কথায়, ইশারায় বা ভঙ্গিতে খেলোয়াড়দের উপদেশ দিতে চেষ্টা করলে রেফারি তাকে বাধা দিবেন এবং প্রয়োজনে তাকে মাঠ থেকে বের করে দিতে পারেন।
- খেলা চলাকালে কোন খেলোয়াড় ইচ্ছাপূর্বক সময় নষ্ট করলে রেফারি তাকে তার অপরাধের গুরুত্বানুযায়ী মৌখিকভাবে সতর্ক বা হলুদ কার্ড প্রদর্শন করতে পারেন।
- অংশগ্রহনকারী খেলোয়াড় ও লাইন্সম্যানদ্বয় ব্যতীত রেফারির অনুমতি ব্যতিরেকে কেউ মাঠে প্রবেশ করতে পারবে না।
- পূর্ব সতর্কীকরণ ছাড়াই মারাত্মক অসদাচরণের জন্য অপরাধী খেলোয়াড়কে সরাসরি ‘লাল কার্ড’ দেখিয়ে মাঠ থেকে বের করে দিতে পারেন। রেফারি বহিষ্কৃত খেলোয়াড়ের নামসহ বিস্তারিত তথ্যাদি ও নিজ মন্তব্যসহ ২৪ ঘন্টার মধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে রিপোর্ট পেশ করবেন। লাল কার্ড প্রা খেলোয়াড়কে অবশ্যই ড্রেসিং রুমে চলে যেতে হবে।
- বিপক্ষীয় খেলোয়াড়ের আঘাত লাগার সম্ভাবনা থাকে বলে জোড়া কাঁচি (সিজার কিক) এবং গেড়ালি কিক আইন বিরুদ্ধ। এ ধরণের কিরে প্রয়োজনবোধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে অপরাধী খেলোয়াড়কে রেফারি সতর্ক করে দিয়ে বিপক্ষকে ‘ইনডিরেক্ট ফ্রি-কিক দেবার নির্দেশ দেবেন।
নিম্নোক্ত কারণে রেফারি সাময়িকভাবে বা স্থায়ীভাবে খেলা স্থগিত করতে পারেন। তবে রেফারি কর্তৃপক্ষের নিকট বিস্তারিত ঘটনা ও নিজের মন্তব্যসহ ২৪ ঘন্টার মধ্যে রিপোর্ট পেশ করবেন।
ক) খারাপ আবহাওয়ার জন্য;
খ) পর্যাপ্ত আলো না থাকলে;
গ) মাঠ খেলার অযোগ্য হয়ে গেলে;
ঘ) হঠাৎ ঝড় বা তির্যক বৃষ্টি শুরু হলে বা মাঠের দাগ অস্পষ্ট হয়ে গেলে;
ঙ) পানি জমে বল ভাসলে;
চ) দর্শকবৃন্দ জোরপূর্বক মাঠে প্রবেশ করলে বা হস্তক্ষেপ করলে এবং খেলার পরিবেশ না থাকলে;
ছ) খেলার মাঠে সাজ-সরঞ্জামাদি ঠিক না থাকলে;
জ) দু’দলের খেলোয়াড়গণ মারামারিতে লিপ্ত হলে;
ঝ) কোন দল খেলতে অস্বীকার করলে;
ঞ) খেলা চলাকালে খেলোয়াড় রেফারির সিদ্ধান্ত অমান্য করলে;
ট) যদি কোন দল অথবা দলের খেলোয়াড়েরা খেলার মাঠে অচলাবস্থা সৃষ্টি করে।
জানা দরকার
ফুটবল খেলা চলাকালে রেফারির করণীয়ঃ
১. গোল পোষ্ট জটলার মুখে খেলার সময় রেফারি এমন দূরত্বে অবস্থান করবেন, যেখান থেকে সমস্ত ঘটনা পরিষ্কারভাবে দেখা যায়।
২. কোন ঘটনা রেফারির চোখ এড়িয়ে গেলে সে সম্পর্কে লাইন্সম্যানের পরামর্শ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতেও পারেন ।
৩. খেলা চলাকালে খেলার রেফারি অবশ্যই মাঠের ভেতরে থাকবেন।
৪. দর্শকদের উচ্ছৃংখলতা, সূর্যের আলো অথবা অন্যান্য যে কোন অসুবিধার জন্য দু’জন। লাইন্সম্যানকে একদিকেই নিয়ে খেলা চালানো যেতে বাধা নেই। এক্ষেত্রে রেফারিকে অপর পাশের পুরো টাচ লাইন দেখতে হবে।
৫. রেফারি খেলা চালানোর সময় ডায়াগোনাল অর্থাৎ দু’পেনাল্টি বক্সের কোনাকোনি দৌড়ে খেলা পরিচালনা করবেন। তাতে দু’জন লাইন্সম্যানের চোখের সামনে থাকবে।
৬. খেলার আরম্ভে প্রতিদ্বন্দ্বি দলের ম্যানেজার বা প্রশিক্ষক নিজ নিজ দলের খেলোয়াড়ের নামের তালিকা রেফারির কাছে পেশ করে থাকেন। খেলা শেষ হবার পর রেফারি ঐ তালিকার উপর খেলার শুরু, বিরতি, এবং শেষ হবার সময় এবং খেলোয়াড়ের নাম বরাবর কার্যক্রম, গোলের সংখ্যা ও সময় অসদাচরণজনিত ব্যবহার ইত্যাদি লিপিবদ্ধ করে প্রতিযোগিতার সংশ্লিষ্ট সংগঠক কর্তৃপক্ষের কাছে পেশ করবেন।
৭. খেলা সময়িক বন্ধের (খেলা চলাকালীন সময়ে) সময় রেফারিকে স্ট্যান্ডবাই বা চতুর্থ রেফারির প্রতি নজর দিতে হবে। কারণ, সে সময় খেলোয়াড় বদলি বা অন্য কোন সংকেত রেফারির জন্য থাকতে পারে।
৮. কমন বলে রেফারি অবশ্যই দু’পক্ষের দু’জন খেলোয়াড়ের মাঝে বল ড্রপ দেবেন।
৯. খেলার উপযোগী বা অনুপযোগী আলোর বিচার করতে রেফারি মাঠের কেন্দ বিন্দুতে দাঁড়িয়ে উভয় গোলে বল দৃষ্টিগোচর হয় কিনা দেখবেন ।
