
বিদায়লগ্নে কোচের পাশে এমবাপ্পে, বললেন ইতিহাস মনে রাখবে দেশমকে
বিশ্বকাপের মঞ্চে মাঠের লড়াই যেমন শেষ হলো, তেমনি অবসান ঘটল ফ্রান্স ফুটবলের একটি সোনালী অধ্যায়েরও। তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জয়ের স্বপ্ন নিয়ে মাঠে নেমেছিল ফরাসিরা। উদ্দেশ্য ছিল একটাই—বিদায়ী কোচ দিদিয়ের দেশমকে একটি জয় উপহার দেওয়া। কিন্তু মাঠের সমীকরণ সবসময় মনের মতো হয় না। ৪-৬ গোলের রোমাঞ্চকর ও বেদনাদায়ক হারে চতুর্থ হয়েই বিশ্বকাপ মিশন শেষ করতে হয়েছে কিলিয়ান এমবাপ্পেদের। বিদায়ের এই মুহূর্তে জয় না পাওয়ার আক্ষেপ থাকলেও, ফরাসি অধিনায়কের কণ্ঠে ঝরল গুরুর প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।
ম্যাচ শেষে নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারেননি এমবাপ্পে। হারের ক্ষত বুকে নিয়েই সংবাদমাধ্যমে তিনি স্পষ্ট করে দেন, একটিমাত্র ম্যাচের ফলাফল দিয়ে দেশমের গৌরবোজ্জ্বল ক্যারিয়ারকে মাপা যাবে না। এমবাপ্পে বলেন, “আমরা ম্যাচটা জিততে পারলাম না। কোচের জন্য বিশেষ কিছু করে দেখানোর তীব্র ইচ্ছা ছিল আমাদের। এমন একটি বিদায় উনার জন্য সত্যিই দুঃখের। আমাদের দলের কেউ চায়নি এমনটা হোক। তবে এই একটা ফলের কারণে দেশমের এত বছরের ঐতিহ্যে বিন্দুমাত্র আঁচড় পড়বে না।”
মাঠের লড়াই ও নিজেদের ব্যর্থতা স্বীকার
ম্যাচে ফ্রান্সের পারফরম্যান্সের গ্রাফ ছিল ওঠানামায় ভরা। প্রথমার্ধে দলের এলোমেলো খেলা নিয়ে কোনো অজুহাত দাঁড় করাননি ফরাসি অধিনায়ক। অকপটে নিজের ও দলের ব্যর্থতা স্বীকার করে তিনি বলেন, “ম্যাচের দুই অর্ধে আমরা দুই রকম ফুটবল খেলেছি। প্রথমার্ধের খেলা দেখে যে কেউ বলতেই পারেন যে, আমরা দেশের জার্সির মর্যাদা রাখতে পারিনি। আসলে দিনশেষে আমরা তো মানুষ, আর মানুষ বলেই হয়তো এমন ভুল ত্রুটি হয়েছে। শুরুর দিকে আমরা নিজেরাই নিজেদের খেলা বিশ্বাস করতে পারছিলাম না।”
তবে বিরতির পর ঘুরে দাঁড়ানোর মরিয়া চেষ্টা করেছিল সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। সেই প্রসঙ্গে এমবাপ্পে যোগ করেন, “ইংল্যান্ডের আক্রমণগুলোই মূলত আমাদের ঘুম ভাঙিয়ে দিয়েছিল। বিরতির পর আমরা আমাদের চেনা ছন্দ ও সেরা খেলাটা খেলতে পেরেছি। তখন দলের সবার মধ্যে আত্মবিশ্বাস অনেক বেশি ছিল।” কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই লড়াকু মনোভাবও পরাজয় এড়ানোর জন্য যথেষ্ট ছিল না।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমবাপ্পের আবেগঘন বার্তা
কোচ দেশমকে যে এমবাপ্পে কতটা উঁচুতে স্থান দেন, তা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল ম্যাচ শুরুর আগেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোচের উদ্দেশে একটি দীর্ঘ ও আবেগপূর্ণ চিঠি পোস্ট করেন এই ফরোয়ার্ড।
সেখানে তিনি লেখেন:
“আজ আপনার শেষ নৃত্য (লাস্ট ড্যান্স)। আপনাকে আরও সুন্দর ও বর্ণিল একটি সমাপ্তি উপহার দেওয়া উচিত ছিল আমাদের। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আমরা তা পারলাম না। দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে আপনি ফরাসি ফুটবলের জন্য যা করে দেখিয়েছেন, তা আসলে ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব। এই দলটাকে ভেঙে নতুন করে গড়ে তোলার পেছনে আপনার অবদান অনস্বীকার্য। মানুষ হয়তো সবসময় আপনার মহত্ত্বের সঠিক মূল্যায়ন করতে পারেনি, কিন্তু ইতিহাস ঠিকই আপনার যোগ্য সম্মান নিশ্চিত করবে।”
নিজের ক্যারিয়ারে দেশমের প্রভাবের কথা স্মরণ করে ফ্রান্স অধিনায়ক আরও লেখেন, “এতগুলো বছর ধরে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মঞ্চে আমাকে নিজের দেশের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য আপনার প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। ফ্রান্সের অন্যতম সেরা ফুটবল কিংবদন্তির পাশে থেকে কাজ করতে পারাটা আমার জন্য ছিল পরম সৌভাগ্যের। আমরা একসঙ্গে যে পথ চলেছি, যা কিছু জয় করেছি, সেই চমৎকার স্মৃতিগুলো আমার হৃদয়ে আজীবন জমা থাকবে। আপনার জীবনের নতুন অধ্যায়ের জন্য অনেক অনেক শুভকামনা। আমাদের কাছে অত্যন্ত মূল্যবান এই জার্সির মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য এবং আপনার অবিস্মরণীয় অবদানের জন্য আবারও ধন্যবাদ।”
দিদিয়ের দেশম: ফ্রান্স ফুটবলের এক সফল রূপকার
২০১২ সালে যখন দিদিয়ের দেশম ফ্রান্স জাতীয় দলের কোচের দায়িত্ব নেন, তখন দলটির ভেতরে চলছিল নানা অস্থিরতা। সেখান থেকে শক্ত হাতে দলের হাল ধরেন তিনি। গত এক যুগেরও বেশি সময়ে ফ্রান্সকে তিনি নিয়ে গেছেন ফুটবলের শীর্ষ শিখরে। তার অধীনে ফরাসিদের অর্জনের খাতাটা বেশ দীর্ঘ ও ভারী।
২০১৬ ইউরো কাপ: ঘরের মাঠে দলকে ফাইনালে তোলা।
২০১৮ বিশ্বকাপ: রাশিয়া বিশ্বকাপে ফ্রান্সকে এনে দেন দ্বিতীয় বিশ্বজয়ের স্বাদ।
২০২২ বিশ্বকাপ: কাতারের মাটিতে টানা দ্বিতীয়বার দলকে ফাইনালের মঞ্চে নিয়ে যাওয়া।
২০২৪ ইউরো কাপ: টুর্নামেন্টের সেমিফাইনালে খেলার গৌরব অর্জন।
চলতি বিশ্বকাপে মাঠের লড়াইয়ে নামার আগেই দেশম পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছিলেন, এই টুর্নামেন্টের পরেই তিনি জাতীয় দলের ডাগআউট ছেড়ে দেবেন। যদিও শেষটা ট্রফি বা মেডেল দিয়ে রাঙানো গেল না, তবুও পরিসংখ্যান আর সাফল্যের নিরিখে দিদিয়ের দেশম ফ্রান্স ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সফলতম কোচ হিসেবেই নিজের নাম অমর করে রাখলেন।