
বিশ্বকাপ ফাইনাল পরিচালনার এক সপ্তাহ পরই রেফারিং ছাড়লেন ভিনচিচ
বিশ্বকাপ ফাইনাল বাঁশি বাজিয়ে নিয়ন্ত্রণের নেওয়ার ঠিক এক সপ্তাহের মাথায় পেশাদার রেফারিং থেকে অবসরের আকস্মিক ঘোষণা দিয়েছেন স্লোভেনিয়ার খ্যাতনামা রেফারি স্লাভকো ভিনচিচ। স্লোভেনিয়ান ফুটবল ফেডারেশনের পক্ষ থেকে এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতির মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। বর্ণাঢ্য এক দীর্ঘ ক্যারিয়ারের ইতি টানার এমন ঘোষণায় বিশ্ব ফুটবলাঙ্গনে বেশ আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
এর ঠিক এক সপ্তাহ আগে অনুষ্ঠিত রোমাঞ্চকর ফাইনালে নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময়ের লড়াই শেষে ফেরান তোরেসের করা একমাত্র গোলে আর্জেন্টিনাকে পরাজিত করে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে স্পেন। সেই ফাইনাল ম্যাচের মূল নির্ধারিত ৯০ মিনিট শেষে অতিরিক্ত যোগ করা সময়ে চেলসির মিডফিল্ডার এনজো ফার্নান্দেজকে লাল কার্ড দেখান রেফারি ভিনচিচ। তবে ম্যাচ শেষ হওয়ার পর পরই মাঠে কিছু অপ্রীতিকর দৃশ্য দেখা যায়, যেখানে আর্জেন্টিনার তারকা লিয়ান্দ্রো পারেদেসকে স্পেনের তরুণ মিডফিল্ডার গাভিকে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দিতে দেখা যায়। যদিও সেই ঘটনায় পারেদেসকে সরাসরি কোনো কার্ড দেখাননি ভিনচিচ, তবে সেই উত্তপ্ত ঘটনাটি নিয়ে পরবর্তীতে ফিফা স্বাধীনভাবে তদন্ত শুরু করে।
মূলত এই ফাইনাল ম্যাচ পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই আলোচনায় ছিলেন ভিনচিচ। ফিফা যখন আনুষ্ঠানিকভাবে ফাইনাল পরিচালনার জন্য তার নাম ঘোষণা করে, তখন আবেগ ধরে রাখতে না পেরে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন এই স্লোভেনিয়ান রেফারি। তাঁর পেশাদারিত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ আন্তর্জাতিক ফুটবল ইতিহাস ও পরিসংখ্যান ফেডারেশন (আইএফএফএইচএস) তাকে এবারের বিশ্বকাপের সেরা রেফারি হিসেবে ভূষিত করে। এছাড়াও ইতালিয়ান রেফারিদের প্রভাবশালী সংগঠন এআইএ তাকে ইউরো কিংবা বিশ্বকাপের সেরা ম্যাচ অফিশিয়ালকে প্রদান করা মর্যাদাপূর্ণ দ্বিবার্ষিক ‘জুলিও কাম্পানাতি পুরস্কার’ দিয়ে সম্মানিত করে।
চলমান এই টুর্নামেন্টে মোট চারটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ পরিচালনার দায়িত্ব সফলভাবে পালন করেছেন ভিনচিচ। এর মধ্যে রয়েছে গ্রুপ পর্বের ব্রাজিল-মরক্কো ও জর্ডান-আলজেরিয়া ম্যাচ, শেষ ষোলোর লড়াইয়ে মেক্সিকো-ইকুয়েডর ম্যাচ (যেখানে মাঠে খেলোয়াড়দের মুখ ঢেকে কথা বলার নতুন নিয়ম ভাঙার দায়ে ইকুয়েডরের ডিফেন্ডার পিয়েরো হিনকাপিয়েকে লাল কার্ড দেখিয়েছিলেন তিনি) এবং সবশেষ মহাগুরুত্বপূর্ণ ফাইনাল ম্যাচটি।
উল্লেখ্য, ২০১৯ সাল থেকে উয়েফার এলিট রেফারি প্যানেলের নিয়মিত সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসা ভিনচিচ এর আগে সফলভাবে ইউরো ২০২০ এবং ইউরো ২০২৪ টুর্নামেন্টে স্পেন ও ইতালির মধ্যকার হাই-ভোল্টেজ সেমিফাইনাল ম্যাচ পরিচালনা করেছিলেন। তাঁর দীর্ঘ বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় মাইলফলক ছিল ২০২৪ সালের উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনাল ম্যাচটি পরিচালনা করা, যেখানে বরুসিয়া ডর্টমুন্ডকে ২-০ গোলে পরাজিত করে রেকর্ড পঞ্চদশ বারের মতো শিরোপা জিতেছিল রিয়াল মাদ্রিদ। এর বাইরেও তিনি ২০২২ সালের ইউরোপা লিগ ফাইনাল (রেঞ্জার্স বনাম আইনট্রাখট ফ্রাঙ্কফুর্ট) পরিচালনা করেন এবং ২০২১ সালের ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড বনাম ভিয়ারিয়াল ইউরোপা লিগ ফাইনালে চতুর্থ রেফারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এমনকি গত ২০২৫ সালে তুরস্কের ঐতিহ্যবাহী সুপার লিগে গালাতাসারাই ও জোসে মরিনিওর দল ফেনারবাচের মধ্যকার উত্তেজনাপূর্ণ ম্যাচ পরিচালনার দায়িত্বও দেওয়া হয়েছিল তাকে। কাতার বিশ্বকাপের মঞ্চেও তিনি দুটি ম্যাচ পরিচালনা করেছিলেন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল গ্রুপ পর্বে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে সৌদি আরবের ঐতিহাসিক ও অঘটনের সেই জয়ী ম্যাচটি।
স্লোভেনিয়ান ফুটবল ফেডারেশনের পাঠানো বিবৃতি এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ভিনচিচের চলমান এই মৌসুমটি অনেক আগে থেকেই তার রেফারিং ক্যারিয়ারের ‘বিদায়ী মৌসুম’ হিসেবে নির্ধারিত ছিল। অর্থাৎ ফাইনাল ম্যাচের পরবর্তী বিভিন্ন সমালোচনা বা বিতর্কের মুখে এই সিদ্ধান্ত হঠাৎ করে নেওয়া হয়নি; বরং আগে থেকেই পরিকল্পিতভাবে এই বিশ্বকাপকেই তার বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের শেষ ধাপ হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন তিনি। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পাওয়া আইএফএফএইচএসের সেরা রেফারি পুরস্কার ও জুলিও কাম্পানাতি সম্মাননাকে তাঁর এই বিদায়ী মৌসুমের সেরা প্রাপ্তি ও মুকুট হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
খেলোয়াড় হিসেবে নয়, বরং ২০১২ সালের ইউরো টুর্নামেন্টে অতিরিক্ত বা ষষ্ঠ রেফারি হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের যাত্রা শুরু করেছিলেন ভিনচিচ। সুদীর্ঘ চৌদ্দ বছরের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে তিনি একাই উয়েফার শীর্ষ দুটি ক্লাব প্রতিযোগিতায় মোট ৭২টি ম্যাচ অত্যন্ত সফলভাবে পরিচালনা করেছেন। বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও বড় মঞ্চ বিশ্বকাপ ফাইনালের বাঁশি বাজানোর মাধ্যমেই তিনি তার পেশাদার রেফারিং জীবনের চিরতরে যবনিকা টানলেন।