২২ বছর—এক প্রজন্মের সময়। এই দীর্ঘ অপেক্ষার পর আবারও ভারতের বিপক্ষে জয়ের স্বাদ পেল বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দল। ঢাকার জাতীয় স্টেডিয়ামে মঙ্গলবারের ম্যাচ শেষে সেই মুহূর্তটি এসে পৌঁছায় যখন রেফারি শেষ বাঁশিটি বাজান, আর ক্লান্ত-অবসন্ন হামজা চৌধুরী মাঠে লুটিয়ে পড়েন। এই দৃশ্যটিই যেন বাংলাদেশের দুই দশকের জমে থাকা আকাঙ্ক্ষা ও হতাশাকে প্রতিফলিত করছিল। সতীর্থরা দৌড়ে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরার মধ্য দিয়ে উল্লাস জানিয়ে দেয়—অবশেষে ভারত-বধ সম্পন্ন।
ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে যে গোলটি, সেটি আসে ম্যাচের মাত্র ১১তম মিনিটে। দ্রুতগতির কাউন্টার অ্যাটাকে শেখ মোরসালিন ও রাকিব হোসেনের দুর্দান্ত সমন্বয় ভারতের ডিফেন্সকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়। বক্সের ঠিক বাইরে রাকিবের সাথে ওয়ান-টু পাস খেলে মোরসালিন আবার বল পান বক্সের ভিতরে। ভারতীয় ডিফেন্ডার আকাশ মিশ্রাকে কাটিয়ে নেয়া শটে গুরপ্রিত সিং সান্দুর হাত বাঁচিয়ে বল ঠাঁই নেয় জালে। জাতীয় দলে এটি ছিল মোরসালিনের সপ্তম গোল—কিন্তু গুরুত্বের দিক থেকে এটি তার সবচেয়ে মূল্যবান।
এরপর দৃশ্যপট পাল্টায়। ভারত বল দখলে রাখার চেষ্টা করলেও মাঝমাঠে হামজা চৌধুরী ও শমিত সোমের দৃঢ়তা প্রতিপক্ষের আক্রমণ বারবার আটকে দেয়। সোহেল রানা উইং দু’দিক নিয়ন্ত্রণে রেখে আক্রমণ রূপ দিচ্ছিলেন। মাঝে মাঝে রাকিব ও ফাহিম ডান ও বামদিক দিয়ে হুমকি তৈরি করেন। তবে গোলের ব্যবধান বাড়াতে পারেনি বাংলাদেশ।
ম্যাচের ৩০ মিনিটে মিতুল মারমার ভুলে হঠাৎ করে বিপদে পড়ে স্বাগতিকরা। ব্যাকপাস ভুলভাবে ট্র্যাপ করতে গিয়ে প্রায় গোল উপহার দিতে বসেছিলেন তিনি। ঠিক সেই মুহূর্তে ত্রাতা হয়ে ওঠেন হামজা—লালিয়ানজোয়ালার ক্রস হেড করে রক্ষণদেয়াল ভেঙে দিতেই পারতেন ভারতীয় ফরোয়ার্ড, কিন্তু হামজার নিখুঁত ক্লিয়ার দলকে রক্ষা করে। এর কিছু পর তপু বর্মণ ও ভারতের বিক্রমের মধ্যে সংঘর্ষ উত্তেজনা ছড়ালেও রেফারি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেন।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে ভারত আক্রমণ বাড়ায়। কয়েকটি অর্ধ-সুযোগ সৃষ্টি হলেও শেষ মুহূর্তে রক্ষণ ভাঙতে পারেনি তারা। তপু, শাকিল ও সাদ উদ্দিন সমন্বিতভাবে ডিপলাইন রেখে ভারতের ফরোয়ার্ডদের থামিয়ে দেন। অপরদিকে বাংলাদেশও পাল্টা আক্রমণে সুযোগ পায়—৭৮ মিনিটে শাকিল আহাদের লম্বা রানে নেওয়া শট ফিরিয়ে দেন গুরপ্রিত, যা ম্যাচের সেরা সেভগুলোর একটি।
শেষ ১০ মিনিটে ভারত মরিয়া হয়ে ওঠে। যোগ করা ৬ মিনিটে তাদের চাপ আরও বাড়ে। তবে শমিত, হামজা ও তপুদের শৃঙ্খলিত রক্ষণ ভারতের গোলস্বপ্ন ধুলোয় মিশিয়ে দেয়। শেষ বাঁশি বাজতেই স্টেডিয়াম যেন একসাথে নিঃশ্বাস ছেড়ে উল্লাসে মেতে ওঠে—বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসে যোগ হয় আরেকটি গৌরবময় রাত।
২০০৩ সালের জানুয়ারিতে কাঞ্চন ও মতিউর মুন্নার দুই গোলের জয় ছিল ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশের সর্বশেষ সাফল্য। এরপর ১০টি ম্যাচে জয়হীন থেকে চারটি হার ও ছয়টি ড্র—এই পরিসংখ্যান মানসিক চাপ বাড়িয়েছিল। সেই বোঝা নামিয়ে দিলেন মোরসালিনরা।
এ জয় শুধু দুই দলের লড়াই নয়; বরং বাংলাদেশের ফুটবলের মানসিক পুনর্জাগরণের ঘোষণা। বাছাইপর্বে ৫ পয়েন্ট নিয়ে দলের যাত্রা চলমান—তবে তার চেয়ে বড় বিষয় হলো দীর্ঘদিন পর একটি বড় প্রতিদ্বন্দ্বীকে হারিয়ে আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়া।
