
মাত্র দুই ঘণ্টার সফরে ইনফান্তিনোর গুরুত্বপূর্ণ আশ্বাস
বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো বাংলাদেশের ফুটবল উন্নয়নে নতুন করে আশার বার্তা দিয়েছেন। মরক্কো থেকে ভুটান যাওয়ার পথে ঢাকায় মাত্র দুই ঘণ্টার যাত্রাবিরতি শেষে তিনি জানিয়েছেন, দেশের দক্ষিণাঞ্চলে একটি ট্রেনিং সেন্টার ও ফুটবল একাডেমি প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা রয়েছে। বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চল নিয়েও উন্নয়ন প্রকল্পের কথা ভাবছে ফিফা। এসব উদ্যোগ নিয়ে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) সঙ্গে আলোচনা চলছে। ফুটবলের বিকাশে সহযোগিতা আরও জোরদার করতে শিগগিরই বাংলাদেশে ফেরার আগ্রহও প্রকাশ করেছেন ফিফা সভাপতি।
গতকাল বাফুফের ফেসবুক পেজে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের উদ্দেশে ইনফান্তিনো এসব কথা বলেন। তিনি জানান, এবারের সফরটি ছিল অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। তবে বাংলাদেশের ফুটবলের উন্নয়নে কাজ এগিয়ে নিতে বাফুফে সভাপতি তাবিথ আউয়ালের সঙ্গে তাঁর আলোচনা হয়েছে।
ইনফান্তিনো বলেন, ‘এবারের সফরটা খুবই স্বল্প সময়ের ছিল। তবে খুব শিগগিরই আবার আমাদের ফিরতে হবে। এ নিয়ে আমরা সভাপতির (তাবিথ আউয়াল) সঙ্গে আলোচনা করছি। দেশের দক্ষিণাঞ্চলে একটি ট্রেনিং সেন্টার ও একাডেমি প্রতিষ্ঠার দারুণ কিছু প্রকল্প রয়েছে। দেশের অন্যান্য অংশেও এমন প্রকল্প রয়েছে।’
বাংলাদেশকে বড় ও ফুটবলপ্রেমী দেশ হিসেবে উল্লেখ করে ফিফা সভাপতি বলেন, দেশের ফুটবলের উন্নয়নে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে দুই পক্ষ একসঙ্গে কাজ করতে চায়। সে লক্ষ্যেই বাংলাদেশে ফেরার সম্ভাব্য কয়েকটি তারিখ নিয়ে আলোচনা চলছে।
ঢাকায় যাত্রাবিরতিতে তাবিথের সঙ্গে সাক্ষাৎ
মরক্কো থেকে ভুটানের রাজধানী থিম্পু যাওয়ার পথে গতকাল দুপুরে ঢাকায় অবতরণ করেন ইনফান্তিনো। থিম্পুতে সরাসরি ফ্লাইট না থাকায় ঢাকায় তাঁর যাত্রাবিরতি হয়। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাঁকে স্বাগত জানান বাফুফে সভাপতি তাবিথ আউয়াল। সেখানে তাঁদের মধ্যে সৌজন্য সাক্ষাৎ হয়। এ সময় বাফুফের কার্যনির্বাহী কমিটির কয়েকজন সদস্য ও কর্মকর্তাও উপস্থিত ছিলেন।
স্বল্প সময়ের এই সাক্ষাতে বাংলাদেশের ফুটবল অবকাঠামোর উন্নয়ন, ফিফা ফরোয়ার্ড কর্মসূচির অর্থায়ন এবং তৃণমূল পর্যায়ে খেলাটির প্রসারের বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। দেশের ফুটবলের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা কীভাবে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানো যায়, তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে বলে বাফুফের তথ্য থেকে জানা যায়।
ফিফা ফরোয়ার্ড কর্মসূচির আওতায় সদস্য দেশগুলো ফুটবলের অবকাঠামো, প্রশিক্ষণব্যবস্থা ও সাংগঠনিক সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য সহায়তা পেতে পারে। বাংলাদেশের মতো দেশে এ ধরনের সহযোগিতা কাজে লাগিয়ে আধুনিক প্রশিক্ষণসুবিধা তৈরি, মাঠের মান উন্নয়ন এবং তরুণ খেলোয়াড়দের বিকাশের সুযোগ বাড়ানো সম্ভব।
১৫ একর জমি ও দুটি স্টেডিয়ামের দায়িত্ব পেয়েছে বাফুফে
বাফুফের তথ্য অনুযায়ী, সরকার ইতিমধ্যে ফেডারেশনকে ১৫ একর জমি এবং দুটি স্টেডিয়ামের দায়িত্ব দিয়েছে। এসব সম্পদ ব্যবহার করে ফুটবলের অবকাঠামো উন্নয়নের পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
ফিফার অর্থায়নে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনাও রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে স্টেডিয়াম সংস্কার, ফ্লাডলাইট স্থাপন, টেকনিক্যাল সেন্টার নির্মাণ এবং সিলেটে হাইব্রিড পিচ তৈরি।
পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত হলে দেশের ফুটবল অবকাঠামো উন্নয়নে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। স্টেডিয়ামে ফ্লাডলাইট স্থাপন করা গেলে সন্ধ্যার পর ম্যাচ ও অনুশীলনের সুযোগ বাড়বে। আধুনিক টেকনিক্যাল সেন্টার প্রশিক্ষণ কার্যক্রম, কোচদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং খেলোয়াড়দের প্রস্তুতির জন্য সহায়ক হতে পারে। অন্যদিকে, হাইব্রিড পিচের উন্নয়ন মাঠের খেলার উপযোগিতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে এসব প্রকল্পের সুফল পেতে হলে নির্মাণকাজের পাশাপাশি নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং খেলোয়াড়দের জন্য পর্যাপ্ত ব্যবহারের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়, সেগুলোকে দেশের ফুটবল উন্নয়নের কাজে দীর্ঘমেয়াদে ব্যবহার করাও গুরুত্বপূর্ণ।
দক্ষিণাঞ্চলের প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের জন্য নতুন সুযোগ
ইনফান্তিনোর বক্তব্যে দক্ষিণাঞ্চলে ট্রেনিং সেন্টার ও একাডেমি প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ফুটবলের সুযোগ-সুবিধা ছড়িয়ে দেওয়া গেলে ঢাকার বাইরে থেকেও প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের উঠে আসার পথ সহজ হতে পারে।
একটি কার্যকর ফুটবল একাডেমিতে বয়সভিত্তিক প্রশিক্ষণ, দক্ষ কোচের তত্ত্বাবধান, শারীরিক সক্ষমতা বাড়ানোর অনুশীলন এবং নিয়মিত প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সুযোগ থাকা প্রয়োজন। এসব সুবিধা তরুণ খেলোয়াড়দের কৌশলগত দক্ষতা ও খেলার অভিজ্ঞতা বাড়াতে সাহায্য করে।
আঞ্চলিক পর্যায়ে প্রশিক্ষণকেন্দ্র গড়ে উঠলে স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিভা শনাক্ত করার সুযোগও বাড়তে পারে। এতে বিভিন্ন জেলার সম্ভাবনাময় খেলোয়াড়দের প্রশিক্ষণব্যবস্থার আওতায় আনা সহজ হবে। তবে এ ধরনের প্রতিষ্ঠান সফল করতে হলে প্রশিক্ষণের মান, কোচ নিয়োগ, অর্থায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচালনার বিষয়ে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা প্রয়োজন।
এখন পর্যন্ত দক্ষিণাঞ্চলে প্রস্তাবিত একাডেমি ও ট্রেনিং সেন্টারের নির্দিষ্ট স্থান, নির্মাণ ব্যয়, অর্থায়নের বিস্তারিত কাঠামো কিংবা বাস্তবায়নের সময়সীমা প্রকাশ করা হয়নি। ফলে পরিকল্পনাগুলো বাস্তবে রূপ নিতে কবে নাগাদ কাজ শুরু হবে, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
জাকার্তার বৈঠকেও গুরুত্ব পেয়েছিল বাংলাদেশের ফুটবল
বাংলাদেশের ফুটবল উন্নয়ন নিয়ে ফিফার সঙ্গে বাফুফের আলোচনা এবারই প্রথম নয়। চলতি মাসের শুরুতে ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তায় ফিফা আসিয়ান কাপের ফাঁকে ইনফান্তিনোর সঙ্গে বৈঠক করেন তাবিথ আউয়াল।
সেখানে বাংলাদেশের পুরুষ ও নারী ফুটবল, বয়সভিত্তিক প্রতিযোগিতা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং ফিফার বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হয়। বাংলাদেশের ফুটবলে ফিফার সহায়তা অব্যাহত রাখার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়।
বাফুফে সভাপতি আগেই জানিয়েছিলেন, উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর কাজ দৃশ্যমান হলে সেগুলোর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনে বাংলাদেশে আসতে প্রস্তুত রয়েছেন ইনফান্তিনো। ঢাকায় এবারের সংক্ষিপ্ত যাত্রাবিরতিতে তাঁর দেওয়া বার্তা সেই সম্ভাবনাকে আরও জোরালো করেছে। তবে পরবর্তী সফরের তারিখ এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
ফিফার সঙ্গে ধারাবাহিক যোগাযোগ বজায় রাখা বাংলাদেশের ফুটবলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি দক্ষ কোচ তৈরি, বয়সভিত্তিক দলগুলোর প্রশিক্ষণ এবং নারী ফুটবলের বিকাশেও পরিকল্পিত বিনিয়োগ প্রয়োজন। এসব ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা কাজে লাগাতে পারলে দেশের ফুটবল উন্নয়নের ভিত্তি আরও শক্তিশালী হতে পারে।
ফিফা নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হয়নি: তাবিথ
আগামী বছরের মার্চে অনুষ্ঠেয় ফিফা সভাপতি নির্বাচনে তৃতীয় মেয়াদে প্রার্থী হয়েছেন ইনফান্তিনো। তবে এই নির্বাচন নিয়ে তাঁর সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি বলে জানিয়েছেন তাবিথ আউয়াল।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বাফুফে সভাপতি বলেন, তাঁদের আলোচনায় নির্বাচন বা রাজনৈতিক বিষয় স্থান পায়নি। তাঁরা মূলত বাংলাদেশের ফুটবলের উন্নয়ন নিয়েই কথা বলেছেন।
তাবিথ জানান, ফিফার সভাপতি পদে প্রার্থীদের মনোনয়ন জমা দেওয়ার তারিখ ১৮ নভেম্বর। কারা মনোনয়নপত্র জমা দেন, তা দেখার পর বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন নিজেদের অবস্থান নির্ধারণ করতে পারবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান প্রশাসনিক কাঠামোর অধীনে প্রয়োজনীয় কাজগুলো এগিয়ে নেওয়াই এখন গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বরের আগে যেসব কাজ সম্পন্ন করা প্রয়োজন, সেগুলো শেষ করার ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।
আশ্বাসের বাস্তবায়নই এখন বড় চ্যালেঞ্জ
ইনফান্তিনোর সংক্ষিপ্ত ঢাকা সফর বাংলাদেশের ফুটবল উন্নয়নে নতুন সম্ভাবনার কথা সামনে এনেছে। দক্ষিণাঞ্চলে প্রশিক্ষণকেন্দ্র ও একাডেমি প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে আঞ্চলিক পর্যায়ে খেলোয়াড় তৈরির সুযোগ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে স্টেডিয়াম সংস্কার, টেকনিক্যাল সেন্টার নির্মাণ এবং অন্যান্য অবকাঠামোগত উদ্যোগ দেশের ফুটবলকে আরও সংগঠিত করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে পরিকল্পনা থেকে বাস্তবায়নে পৌঁছাতে প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা, অর্থায়নের নিশ্চয়তা, নির্ধারিত সময়সীমা এবং কার্যকর তদারকি। ফিফার সহায়তা যথাযথভাবে কাজে লাগানো গেলে শুধু অবকাঠামো নয়, খেলোয়াড়দের প্রশিক্ষণ ও প্রতিযোগিতার পরিবেশেও ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।
এখন বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের অপেক্ষা, ইনফান্তিনোর দেওয়া আশ্বাস কত দ্রুত বাস্তব রূপ পায় এবং প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলো দেশের ফুটবলে কতটা কার্যকর প্রভাব ফেলে।