বাংলাদেশের ফুটবলাঙ্গনে এখন নতুন এক ধ্রুবতারার নাম মিলি আক্তার। ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার প্রত্যন্ত বারুইগ্রাম থেকে উঠে আসা এই অদম্য তরুণী এখন বিশ্বমঞ্চে বাংলার বাঘিনীদের অতন্দ্র প্রহরী। গত মঙ্গলবার (৩ মার্চ) অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে এএফসি নারী এশিয়ান কাপের মূল পর্বে শক্তিশালী চীনের বিপক্ষে ম্যাচে জাতীয় দলের জার্সিতে অভিষেক ঘটে মিলির। গোলবারের নিচে তার অতিমানবীয় পারফরম্যান্স এখন ফুটবল প্রেমীদের মুখে মুখে।
Table of Contents
এক অদম্য লড়াইয়ের গল্প
মিলির আজকের এই সাফল্যের পথটি মোটেও কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। তার বাবা মো. সামছুল হক একজন সাধারণ কলা বিক্রেতা এবং মা আনোয়ারারা বেগম গৃহিণী। অতি সাধারণ এবং অতি দরিদ্র এক পরিবারে বেড়ে ওঠা মিলিরা বর্তমানে সরকারের দেওয়া উপহারের ঘরে বসবাস করেন। চরম অভাবের মাঝেও ফুটবলের প্রতি মিলির ভালোবাসা তাকে টেনে নিয়ে গেছে খেলার মাঠে। ২০২২ সালে বাংলাদেশ সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপে বিজয়ী হওয়ার পর মিলির প্রতিভা সবার নজরে আসে। এরপর তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে নিজের এবং পরিবারের ভাগ্য বদলে ফেলেন। ঘরোয়া ফুটবলে নিয়মিত পারফরম্যান্সের ধারাবাহিকতায় তিনি এশিয়ান কাপের চূড়ান্ত স্কোয়াডে জায়গা করে নেন।
একনজরে মিলি আক্তারের ক্যারিয়ার ও অর্জন
| বিষয় | তথ্য ও বিবরণ |
| পুরো নাম | মিলি আক্তার |
| জন্মস্থান | বারুইগ্রাম, নান্দাইল, ময়মনসিংহ। |
| পেশাগত ক্লাব/বাহিনী | বাংলাদেশ সেনাবাহিনী |
| অভিষেক ম্যাচ | বাংলাদেশ বনাম চীন (৩ মার্চ, ২০২৬) |
| সাফল্য (২০২৫) | দক্ষিণ এশিয়ার সেরা গোলরক্ষক এবং একুশে পদকপ্রাপ্ত। |
| পারিবারিক অবস্থা | বাবা কলা বিক্রেতা, বাস করেন সরকারি উপহারের ঘরে। |
সিডনির মাঠে চীনের প্রাচীর
এশিয়ান কাপের রেকর্ড ৯ বারের চ্যাম্পিয়ন চীনের বিপক্ষে ম্যাচটি ছিল বাংলাদেশের জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। যদিও বাংলাদেশ ২-০ গোলে হেরে গেছে, কিন্তু মাঠের চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। চীনের শক্তিশালী আক্রমণভাগের একের পর এক জোরালো শট মিলি যেভাবে প্রতিহত করেছেন, তা সিডনির স্টেডিয়ামে উপস্থিত দর্শকদের মুগ্ধ করেছে। অভিজ্ঞতায় যোজন যোজন এগিয়ে থাকা চাইনিজ ফরোয়ার্ডদের চোখে চোখ রেখে লড়াই করেছেন এই নবাগত গোলরক্ষক।
বুধবার (৪ মার্চ) সিডনি থেকে মুঠোফোনে মিলি জানান, “অভিষেক ম্যাচে নিজের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করেছি, তবে হার এড়াতে না পারার কিছুটা অতৃপ্তি রয়ে গেছে। সামনের ম্যাচগুলোতে গোলবারের সামনে নিজেকে চীনের প্রাচীরের মতো দৃঢ় করতে চাই।” তিনি আরও জানান, নান্দাইলসহ পুরো দেশবাসীর দোয়া তাকে সাহস জোগাচ্ছে।
নান্দাইলের তিন কন্যা ও আগামীর স্বপ্ন
মিলি আক্তার একা নন, এবারের নারী এশিয়ান কাপে নান্দাইল উপজেলার মোট তিন কন্যা লাল-সবুজের প্রতিনিধি হিসেবে মাঠ মাতাচ্ছেন। মিলির সাথে রয়েছেন হালিমা আক্তার এবং প্রতিভাবান ফরোয়ার্ড সৌরভী আকন্দ প্রীতি। তাদের এই সাফল্যে পুরো নান্দাইল জুড়ে এখন উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। মিলির বাবা সামছুল হক খুশিতে আত্মহারা হয়ে বলেন, “আমার মেয়ে আজ বিশ্ববাসীর সামনে দেশের সম্মান রক্ষা করছে, এর চেয়ে বড় পাওনা আর কিছু হতে পারে না।”
গ্রুপ পর্বে বাংলাদেশের পরবর্তী প্রতিপক্ষ শক্তিশালী উত্তর কোরিয়া এবং উজবেকিস্তান। যদিও শক্তির বিচারে তারা অনেক এগিয়ে, কিন্তু চীনের বিপক্ষে লড়াইয়ের পর মিলি-প্রীতি-হালিমাদের আত্মবিশ্বাস এখন তুঙ্গে। ময়মনসিংহের বারুইগ্রাম থেকে শুরু হওয়া মিলির এই যাত্রা এখন বিশ্বজয়ের স্বপ্ন বুনছে।
