১৯৩০ সালে উরুগুয়ের মন্টেভিডিওতে যাত্রা শুরু করা ফুটবল বিশ্বকাপ এক শতাব্দীর দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। এই দীর্ঘ ইতিহাসে যেমন আছে ব্রাজিলের সাম্বা ফুটবলের সৌন্দর্য, তেমনি আছে ডিয়েগো আরমান্ডো ম্যারাডোনার একক নৈপুণ্যে বিশ্বমঞ্চ কাঁপানোর গল্প। ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপ সেই ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত অধ্যায়, যেখানে আর্জেন্টিনার সাফল্যের কেন্দ্রে ছিলেন একাই ম্যারাডোনা।
কার্লোস বিলার্দোর অধীনে আর্জেন্টিনা দলটি প্রায়ই পরিচিত ছিল ‘ম্যারাডোনা এবং বাকি ১০ জন’ নামে। কারণ পুরো টুর্নামেন্টে দলের আক্রমণ, সৃজনশীলতা, নেতৃত্ব ও গোলের প্রধান ভরসা ছিলেন অধিনায়ক ম্যারাডোনা। পেলের যুগের ব্রাজিলের মতো বহু কিংবদন্তি খেলোয়াড়ে ভরা দল আর্জেন্টিনার ছিল না। কিন্তু ম্যারাডোনা নিজের দক্ষতা দিয়ে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ ভেঙে ম্যাচের গতিপথ বদলে দিয়েছেন একাধিকবার।
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে তাঁর দুটি গোল বিশ্বকাপ ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে। প্রথমটি ‘লা মানো দে দিওস’ বা ‘ঈশ্বরের হাত’ নামে পরিচিত বিতর্কিত গোল। তবে কয়েক মিনিট পরেই তিনি মাঝমাঠ থেকে একক দৌড়ে একাধিক ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে যে গোলটি করেন, সেটি পরে ‘শতাব্দীর সেরা গোল’ হিসেবে স্বীকৃতি পায়। একইভাবে বেলজিয়ামের বিপক্ষেও সেমিফাইনালে তিনি জোড়া গোল করেন। ফাইনালে পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে আর্জেন্টিনা ৩-২ ব্যবধানে জিতে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ শিরোপা অর্জন করে।
১৯৮৬ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার নকআউট পর্ব
| পর্ব | প্রতিপক্ষ | ফলাফল | ম্যারাডোনার অবদান |
|---|---|---|---|
| কোয়ার্টার ফাইনাল | ইংল্যান্ড | ২-১ জয় | ২ গোল |
| সেমিফাইনাল | বেলজিয়াম | ২-০ জয় | ২ গোল |
| ফাইনাল | পশ্চিম জার্মানি | ৩-২ জয় | আক্রমণ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা |
১৯৮২ বিশ্বকাপের পর মূলত কলম্বিয়ার আয়োজনেই পরবর্তী আসর হওয়ার কথা ছিল। তবে অর্থনৈতিক সংকটের কারণে ১৯৮২ সালের ২৬ অক্টোবর দেশটি সরে দাঁড়ায়। ১৬ দল থেকে বিশ্বকাপ ২৪ দলে উন্নীত হওয়ায় অন্তত ১০টি বড় স্টেডিয়ামের প্রয়োজন হয়েছিল, যা কলম্বিয়ার পক্ষে তৈরি করা সম্ভব হয়নি। পরে মেক্সিকো আয়োজক হওয়ার প্রস্তাব দেয়। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডাও প্রতিযোগিতায় থাকলেও শেষ পর্যন্ত ১৯৮৩ সালের ১৯ মে মেক্সিকো দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব পায়।
বিশ্বকাপ শুরুর আট মাস আগে, ১৯৮৫ সালের সেপ্টেম্বরে ভয়াবহ ভূমিকম্পে মেক্সিকো সিটি ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী প্রায় ১০ হাজার মানুষ নিহত হন, যদিও বেসরকারি হিসাবে মৃতের সংখ্যা আরও বেশি ছিল। তবু বিশ্বকাপের জন্য নির্ধারিত ১২টি স্টেডিয়াম অক্ষত থাকায় আয়োজন চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়।
এই আসরে বিশ্বকাপের ফরম্যাটেও পরিবর্তন আনা হয়। ২৪টি দলকে ছয়টি গ্রুপে ভাগ করা হয় এবং প্রতিটি গ্রুপের শীর্ষ দুই দলের পাশাপাশি সেরা চারটি তৃতীয় স্থানধারী দলও দ্বিতীয় রাউন্ডে ওঠার সুযোগ পায়। এই নিয়মের কারণে কোনো ম্যাচ না জিতেও উরুগুয়ে ও বুলগেরিয়ার মতো দল নকআউট পর্বে পৌঁছে যায়।
১৯৮৬ বিশ্বকাপের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| আয়োজক দেশ | মেক্সিকো |
| অংশগ্রহণকারী দল | ২৪ |
| চ্যাম্পিয়ন | আর্জেন্টিনা |
| রানার্স-আপ | পশ্চিম জার্মানি |
| ফাইনালের ফল | আর্জেন্টিনা ৩-২ পশ্চিম জার্মানি |
| সেরা তারকা | ডিয়েগো ম্যারাডোনা |
ইউরোপীয় টেলিভিশন দর্শকদের সুবিধার জন্য ম্যাচগুলো দুপুরের তীব্র গরমে আয়োজন করা হয়েছিল। সেই পরিস্থিতিতেও কয়েকটি স্মরণীয় ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। কোয়ার্টার ফাইনালে ব্রাজিল ও ফ্রান্সের ম্যাচ ১-১ ড্র হওয়ার পর টাইব্রেকারে ফ্রান্স জয় পায়। বেলজিয়াম সোভিয়েত ইউনিয়নকে ৪-৩ ব্যবধানে হারায়। স্পেন ডেনমার্ককে ৫-১ গোলে পরাজিত করে।
কানাডার অংশগ্রহণও ছিল ভিন্নধর্মী। দেশটিতে ১১ জনের ফুটবলের চেয়ে ইনডোর ফুটবল বেশি জনপ্রিয় হওয়ায় তাদের দলে অনেক ইনডোর ফুটবলার ছিলেন। কোচ টনি ওয়েটার্স পূর্ণ ২২ সদস্যের দলও গঠন করতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত ১৮ জন নিয়ে দল ঘোষণা করা হয় এবং বাকি চারজনকে জরুরি প্রয়োজনে ডাকার জন্য প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছিল। তবে কানাডা তিন ম্যাচেই হেরে কোনো গোল করতে পারেনি।
আর্জেন্টিনার কোচ কার্লোস বিলার্দোও আলোচনায় ছিলেন তাঁর কুসংস্কারের জন্য। প্রতিটি ম্যাচের আগে নির্দিষ্ট জায়গায় কফি পান, নির্দিষ্ট ব্যক্তির হাতে চুল কাটানো কিংবা বাসে নির্দিষ্ট গান বাজানোর মতো নানা নিয়ম তিনি মেনে চলতেন। এমনকি ফাইনালে বিশ্বজয়ের পরও তিনি আনন্দে ভাসেননি। কারণ পশ্চিম জার্মানির দুটি গোলই কর্নার থেকে হেডে হয়েছিল, যা তাঁর কৌশলগত পরিকল্পনার ব্যর্থতা হিসেবে দেখেছিলেন তিনি।
মেক্সিকোর সেই বিশ্বকাপ শেষ পর্যন্ত স্মরণীয় হয়ে আছে মূলত ম্যারাডোনার অসাধারণ নৈপুণ্যের জন্য। ফুটবল ইতিহাসে দলীয় খেলায় একজন খেলোয়াড়ের এত বড় প্রভাব খুব কমবারই দেখা গেছে।
