বিশ্বকাপ ফুটবলের টানটান উত্তেজনার রেশ কাটতে না কাটতেই মাঠের বাইরের এক অনাকাঙ্ক্ষিত বিতর্কে জড়াল বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। ফাইনাল ম্যাচজুড়ে শৃঙ্খলাভঙ্গের একাধিক গুরুতর অভিযোগে এবার আলবিসেলেস্তেদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক তদন্তে নামছে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা। ফাইনাল ম্যাচের উত্তেজনাপূর্ণ ও বিতর্কিত মুহূর্তগুলোর ভিডিও ফুটেজ এবং ম্যাচ রেফারির ম্যাচ-পরবর্তী আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন খতিয়ে দেখে এই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে নিশ্চিত করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম স্কাই স্পোর্টস।
সদ্যসমাপ্ত ফাইনালে মাঠের ভেতর ফুটবলারদের আচরণ এবং ম্যাচ শেষে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের কিছু ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই তদন্ত প্রক্রিয়া শুরু করেছে ফিফার ডিসিপ্লিনারি কমিটি। পুরো টুর্নামেন্ট জুড়ে দুর্দান্ত খেলা উপহার দিলেও, শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচে দলটির বেশ কয়েকজন তারকা ফুটবলার ও কোচের আচরণ বিশ্ব ফুটবলের নীতিমালার পরিপন্থী ছিল বলে প্রাথমিক অভিযোগে বলা হয়েছে।
মাঠের সংঘর্ষ ও মূল তদন্তের ক্ষেত্রসমূহ
ফিফার এই আকস্মিক তদন্তের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ম্যাচের শেষ ভাগের কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। বিশেষ করে লিয়ান্দ্রো পারেদেসের লাল কার্ড পাওয়ার ঘটনা এবং এর পরপরই দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে তৈরি হওয়া তুমুল উত্তেজনা ফিফার নজরে এসেছে। মাঠের ভেতর প্রতিপক্ষ ফুটবলারদের সাথে হাতাহাতি এবং অসদাচরণের জন্য পারেদেস বড় ধরনের নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
একই ম্যাচে আর্জেন্টিনার ডিফেন্ডার নাহুয়েল মোলিনার বিরুদ্ধে স্পেনের মিডফিল্ডার রদ্রির দিকে ঘুষি মারার চেষ্টা করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ভিডিও ফুটেজে এই ঘটনার সত্যতা মিললে মোলিনাকেও দীর্ঘ মেয়াদে মাঠের বাইরে থাকতে হতে পারে। শুধু মাঠের খেলোয়াড়রাই নন, এই শৃঙ্খলাভঙ্গের তালিকায় জড়িয়েছে দলটির ডাগআউটের নামও। স্পেনের ফরোয়ার্ড দানি ওলমোকে ধাক্কা দেওয়ার ঘটনায় সরাসরি নাম এসেছে আর্জেন্টিনার সহকারী কোচ রবার্তো আয়ালার। ফিফার আচরণবিধির সুনির্দিষ্ট ধারা অনুযায়ী একজন কোচের এমন আচরণকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে।
পুরস্কার বিতরণী ও স্পোর্টসম্যানশিপের অভাব
ম্যাচ চলাকালীন ঘটনার বাইরেও আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের স্পোর্টসম্যানশিপ বা খেলোয়াড়সুলভ মনোভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ফাইনাল শেষে রানার্সআপ দল হিসেবে স্পেনের খেলোয়াড়রা যখন ট্রফি ও মেডেল নিচ্ছিলেন, তখন আর্জেন্টিনার ফুটবলারদের একটি বড় অংশ তাদের দিকে পিঠ ফিরিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। ফিফা এই বিষয়টিকে প্রতিপক্ষের প্রতি চরম অশ্রদ্ধা এবং ফুটবলের মূল ভাবমূর্তির পরিপন্থী হিসেবে বিবেচনা করছে।
বিশ্ব ফুটবলের অভিভাবক সংস্থাটি জানিয়েছে, ফুটবলের ফেয়ার প্লে নীতি কোনোভাবেই ক্ষুণ্ন হতে দেওয়া যাবে না। তাই ম্যাচ শেষের ভিডিও ফুটেজগুলো নিবিড়ভাবে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। যদি এই অসদাচরণের প্রমাণ মেলে, তবে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনকে (এএফএ) বড় অঙ্কের আর্থিক জরিমানার পাশাপাশি নির্দিষ্ট খেলোয়াড়দের ম্যাচ নিষেধাজ্ঞার শাস্তি ভোগ করতে হবে। এই গোটা তদন্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে এবং চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করতে ফিফার ডিসিপ্লিনারি কমিটির আরও কয়েক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।
অতীতে আর্জেন্টিনার ফিফা শৃঙ্খলাভঙ্গের রেকর্ড
আর্জেন্টাইন ফুটবল দলের বিরুদ্ধে ফিফার এমন শৃঙ্খলাভঙ্গের তদন্ত এবারই প্রথম নয়। এর আগেও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও মহাদেশীয় টুর্নামেন্টে দলটির খেলোয়াড়দের আগ্রাসী আচরণ এবং মাঠের বাইরের কর্মকাণ্ড খতিয়ে দেখেছে ফিফা। অতীতে ঘটে যাওয়া এমন কিছু প্রধান ঘটনা নিচে একটি টেবিলের মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:
| সাল | টুর্নামেন্ট ও ম্যাচ | অভিযুক্ত ব্যক্তি/পক্ষ | ঘটনার বিবরণ | ফিফার অ্যাকশন/শাস্তি |
| ২০২২ | কাতার বিশ্বকাপ (নেদারল্যান্ডস ম্যাচ) | আর্জেন্টিনা দল ও লিওনেল মেসি | ডাচ ডাগআউটের সামনে আগ্রাসী উদযাপন ও রেফারির সাথে তর্ক। | আনুষ্ঠানিক তদন্ত ও সতর্কবার্তা। |
| ২০২২ | কাতার বিশ্বকাপ (ফাইনাল ম্যাচ) | এমিলিয়ানো মার্টিনেজ | গোল্ডেন গ্লাভস নিয়ে অশালীন উদযাপন ও ড্রেসিংরুমে প্রতিপক্ষকে ব্যঙ্গ। | কোড অব কন্ডাক্ট ভাঙার তদন্ত। |
| ২০২৪ | কোপা আমেরিকা (উৎসব উদযাপন) | এনজো ফার্নান্দেজ ও অন্যান্যরা | টিম বাসের ভেতর ফরাসি খেলোয়াড়দের লক্ষ্য করে বর্ণবাদী গান। | অফিশিয়াল তদন্তের নির্দেশ। |
| ২০২৫ | বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব (ব্রাজিল ম্যাচ) | আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন | গ্যালারিতে বিশৃঙ্খলা এবং মাঠে দেরিতে প্রবেশ। | এএফএ-কে আর্থিক জরিমানা। |
| ২০২৬ | বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব (কলম্বিয়া ম্যাচ) | এমিলিয়ানো মার্টিনেজ | ম্যাচ শেষে মাঠ ছাড়ার সময় ক্যামেরাম্যানের ক্যামেরায় ধাক্কা। | ২ ম্যাচের জন্য আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা। |
নোট: ফিফার ডিসিপ্লিনারি কোডের আওতায় যেকোনো ধরনের বর্ণবাদ, শারীরিক হেনস্তা বা প্রতিপক্ষের প্রতি অসম্মানজনক আচরণের জন্য খেলোয়াড়দের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট দেশের ফুটবল বোর্ডকেও জবাবদিহি করতে হয়। এবারের তদন্তের রায়ও পূর্বের নজিরগুলোর মতোই কঠোর হতে পারে বলে ধারণা করছেন ফুটবল বিশ্লেষকরা।
