
সঠিক পথেই বাংলাদেশ দল এগোচ্ছে, আত্মবিশ্বাসী হামজা চৌধুরী
ফিফা আসিয়ান কাপের লড়াইয়ে সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে অল্প ব্যবধানে হারের তিক্ত স্বাদ পেলেও মোটেও হতাশ নন বাংলাদেশ দলের মিডফিল্ডার হামজা চৌধুরী। গত দেড় বছর ধরে জাতীয় দলের সঙ্গে এই পুরো ফুটবল যাত্রাকে তিনি অত্যন্ত ইতিবাচক এবং গঠনমূলক হিসেবে দেখছেন। তার দৃঢ় বিশ্বাস, বাংলাদেশ দল ক্রমান্বয়ে উন্নতির সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠছে এবং আগামী দিনে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বড় কোনো সাফল্য অর্জনের জন্য একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করে চলেছে।
ইংলিশ ক্লাব শেফিল্ড ইউনাইটেডের এই প্রতিভাবান ফুটবলার লাল-সবুজ জার্সিতে মাঠে নেমে বহুমুখী অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। গত বছরের মার্চ মাস থেকে বাংলাদেশ দলের সঙ্গে তার এই পথচলা শুরু হয়। এরপর থেকে দলের হয়ে খেলতে গিয়ে প্রাপ্তির ঝুড়িতে সাফল্যের চেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ ও সংগ্রামের মুহূর্তই বেশি এসেছে বলে খোলাখুলি স্বীকার করেছেন তিনি। তবে এত প্রতিকূলতার মাঝেও নিজের আশাবাদ এতটুকুও হারাননি এই তারকা। বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ফিফাকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি নিজের অনুভূতির কথাগুলো এভাবেই প্রকাশ করেছেন।
তিনি বলেন, ব্যক্তিগতভাবে এই অভিজ্ঞতা তার জীবনের অন্যতম অসাধারণ একটি অধ্যায়। পেশাদার ফুটবলে সব সময় জয়ের আনন্দ থাকে না, তাই এখানে নানা ধরনের চড়াই-উতরাই ও ব্যর্থতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। তিনি আরও যোগ করেন, দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে ভালো সময়ের তুলনায় কঠিন লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা তাদের বেশি করতে হয়েছে। তারপরও তারা দমে না গিয়ে কঠোর পরিশ্রম চালিয়ে যাচ্ছেন এবং ভবিষ্যতের সোনালী সাফল্যের জন্য একটি সুদৃঢ় ভিত্তি গড়ে তুলছেন।
হামজার বিশ্লেষণে বাংলাদেশ দল বর্তমান সময়ে একটি বিকাশমান এবং ক্রমবর্ধমান শক্তি হিসেবে নিজেদের তৈরি করছে। আসিয়ান কাপের মতো হাই-প্রোফাইল প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতা তুলনামূলকভাবে কম হলেও, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর কিংবা স্বাগতিক ইন্দোনেশিয়ার মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে লড়াকু মনোভাব নিয়ে মাঠে নামা দলকে আরও বেশি পরিপক্ব করে তুলছে। দলের এই অগ্রগতি কেবল শেষ ফলাফলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং শীর্ষস্থানীয় দলগুলোর সঙ্গে মাঠে সমানতালে লড়াই করার সক্ষমতার মধ্যেও স্পষ্টভাবে ফুটে উঠছে বলে তার বিশ্বাস।
উদাহরণস্বরূপ মালয়েশিয়ার বিপক্ষেন ম্যাচটির কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে দল আরও গোছানো এবং ভালো ফুটবল খেলেছে। মালয়েশিয়ার মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে শুরুটায় কিছুটা ধীরগতির কারণে ম্যাচ কঠিন হয়ে গেলেও তারা নিজেদের সামর্থ্য প্রমাণ করেছেন। ফিফা র্যাংকিংয়ে মালয়েশিয়া বাংলাদেশের চেয়ে প্রায় ৪৫ ধাপ এগিয়ে থাকলেও মাঠের ৯০ মিনিটের লড়াইয়ে সেই ব্যবধান সবসময় স্পষ্ট হয়ে ওঠেনি। হামজার মতে, এই স্তরে এসে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের সঙ্গে সমান তালে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারাটা তাদের জন্য একটি বিশাল ইতিবাচক দিক। র্যাংকিংয়ের ব্যবধান থাকা সত্ত্বেও ম্যাচের নির্দিষ্ট কিছু মুহূর্তে প্রতিপক্ষকে চাপে রাখা প্রমাণ করে যে দলটি সঠিক পথেই এগিয়ে চলছে।
অবশ্য বাংলাদেশ দল এখনো তাদের কাঙ্ক্ষিত বা চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেনি বলেও মনে করেন ২৭ বছর বয়সি এই অভিজ্ঞ ফুটবলার। তার মতে, দলের কাঠামোগত উৎকর্ষ সাধনের জন্য এখনও কিছু জায়গায় সুনির্দিষ্ট উন্নতির অবকাশ রয়েছে। তিনি রূপক অর্থে উল্লেখ করেন যে একটি বড় ধাঁধার শেষ দুই-তিনটি টুকরো এখনো মেলানো বাকি আছে। তবে তিনি আশাবাদী যে খুব দ্রুতই কোচিং স্টাফ ও খেলোয়াড়রা মিলে সেই ঘাটতিগুলো পূরণ করে নিতে পারবেন।
সামনের দিনগুলোতে বাংলাদেশের সামনে আরও বড় এবং কঠিন চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। আগামী নভেম্বর মাসে দেশের মাটিতে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার মর্যাদাপূর্ণ টুর্নামেন্ট সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ। হামজার জোরালো বিশ্বাস, এই টুর্নামেন্ট দলটিকে তাদের নিজেদের প্রকৃত সামর্থ্য আরও একবার বড় পরিসরে প্রমাণের দারুণ সুযোগ এনে দেবে। তিনি বলেন, নভেম্বর মাসের টুর্নামেন্টকে সামনে রেখে তারা এখন থেকেই প্রস্তুতি নিচ্ছেন এবং ইনশাআল্লাহ সেখানে ভালো কিছু অর্জন করে দেশের মুখ উজ্জ্বল করতে পারবেন।
জাতীয় দলের হয়ে আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার পাশাপাশি নতুন নতুন দেশ ও ভিন্ন সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগও বেশ উপভোগ করছেন হামজা। ক্যারিয়ারে এই প্রথম ইন্দোনেশিয়া সফরে এসে দেশটির চমৎকার পরিবেশ এবং সাধারণ মানুষের আন্তরিক আতিথেয়তায় তিনি মুগ্ধ হয়েছেন। বন্ধু ও পরিবারের সদস্যদের কাছে আগে এই দেশের অনেক প্রশংসা শুনেছিলেন তিনি। এখানকার আবহাওয়া কিছুটা উষ্ণ হলেও সব মিলিয়ে পুরো সফরটি দারুণভাবে উপভোগ করছেন এবং ভবিষ্যতে অবসরে আবার এখানে এসে ঘুরে দেখার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।
অবশ্য এসবকিছুর ঊর্ধ্বে এখন তার পুরো মনোযোগ কেবল আসন্ন ম্যাচের রণকৌশল এবং মাঠের পারফরম্যান্সের দিকেই নিবদ্ধ রয়েছে। কথা প্রসঙ্গে তিনি জানান, স্বাগতিক ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে পরবর্তী কঠিন ম্যাচে মাঠে নামার জন্য তিনি অত্যন্ত উন্মুখ হয়ে আছেন। গ্যালারিজুড়ে হাজার হাজার দর্শকের উপস্থিতি এবং ভিনদেশি সমর্থকদের গর্জন তাদের তরুণ দলের জন্য দারুণ এক অভিজ্ঞতা হবে বলে মনে করেন তিনি। ইন্দোনেশিয়া অত্যন্ত শক্তিশালী একটি দল এবং তাদের স্কোয়াডের অনেক খেলোয়াড় ইউরোপের শীর্ষস্থানীয় ফুটবল লিগগুলোতে খেলে থাকেন। তাই এই ম্যাচটি বাংলাদেশের জন্য একটি বড় পরীক্ষা হতে যাচ্ছে। তবে পিছিয়ে না থেকে নিজেদের চেয়েও এগিয়ে থাকা এমন শক্তিশালী দলের বিপক্ষে চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতেই তারা এত দূর ভ্রমণ করে ইন্দোনেশিয়ায় এসেছেন বলে দৃঢ় কণ্ঠে জানিয়েছেন তিনি।