
সমান গোল করেও কেন মেসির চেয়ে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে এগিয়ে এমবাপ্পে?
বিশ্বকাপের মঞ্চে সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার ‘গোল্ডেন বুট’ জয় করা যেকোনো স্ট্রাইকারের জন্যই পরম আরাধ্য। মাঠের লড়াইয়ে যখন দুই বিশ্বসেরা তারকা গোলসংখ্যায় একে অপরকে স্পর্শ করেন, তখন এই পুরস্কারের ভাগ্য নির্ধারণে ফুটবলপ্রেমীদের আগ্রহের পারদ তুঙ্গে ওঠে। কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালে মুখোমুখি হওয়ার আগে কিলিয়ান এমবাপ্পে এবং লিওনেল মেসি—দুজনেরই নামের পাশে জ্বলজ্বল করছিল সমান ৮টি করে গোল। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, গোলসংখ্যা এক হওয়া সত্ত্বেও কেন এবং কোন সমীকরণে লিওনেল মেসির চেয়ে ফরাসি ফরোয়ার্ড কিলিয়ান এমবাপ্পে এই দৌড়ে এগিয়ে ছিলেন?
সাধারণ ফুটবলপ্রেমীদের মনে হতে পারে, গোল সমান হলে হয়তো পুরস্কারটি যৌথভাবে দেওয়া হয়। তবে ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার নিয়ম কিন্তু অন্য কথা বলে। গোল্ডেন বুট নির্ধারণের ক্ষেত্রে ফিফা অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট এবং কঠোর ‘টাইব্রেকার’ নীতি অনুসরণ করে, যা ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপ থেকে চালু হয়েছে। কেবল গোলসংখ্যা এক হলেই ট্রফি ভাগাভাগি করার দিন শেষ।
ফিফার নিয়ম অনুযায়ী, একাধিক খেলোয়াড়ের গোলসংখ্যা সমান হলে প্রথম টাইব্রেকার হিসেবে দেখা হয় কার ‘অ্যাসিস্ট’ বা গোলে সহায়তা বেশি। অর্থাৎ, নিজের গোলের পাশাপাশি সতীর্থদের গোল করাতেও কার ভূমিকা বেশি ছিল, সেটিই সবার আগে বিবেচনা করা হয়। এই জায়গাতেই আর্জেন্টাইন জাদুকরকে টেক্কা দিয়েছেন ফরাসি গতিদানব। কিলিয়ান এমবাপ্পে টুর্নামেন্টে ৮টি গোলের পাশাপাশি সতীর্থদের দিয়ে করিয়েছেন আরও ৩টি গোল। ফলে সরাসরি মোট ১১টি গোলে অবদান রেখে তিনি টেবিলের শীর্ষে অবস্থান নেন। অন্যদিকে, আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসি ৮টি গোল করলেও অ্যাসিস্ট করেছেন ২টি। অর্থাৎ মোট ১০টি গোলে ছিল তাঁর প্রত্যক্ষ অবদান। এই ১টি অ্যাসিস্টের ব্যবধানই এমবাপ্পেকে মেসির চেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে দাঁড় করিয়ে দেয়।
ফিফার টাইব্রেকার নিয়ম এখানেই শেষ নয়। যদি দেখা যায় দুই বা ততোধিক খেলোয়াড়ের গোল এবং অ্যাসিস্ট—উভয় সংখ্যাই হুবহু মিলে গেছে, তখন দ্বিতীয় টাইব্রেকার হিসেবে বিবেচনা করা হয় ‘মিনিট পার গোল’ অনুপাতকে। অর্থাৎ, কোন খেলোয়াড় মাঠে সব মিলিয়ে কত কম মিনিট খেলে এই গোলগুলো করেছেন, সেটি হিসাব করা হয়। কম সময় মাঠে থেকে সমান সংখ্যক গোল করা খেলোয়াড়কেই তখন বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, কেউ যদি ৯০০ মিনিট খেলে ৫টি গোল করেন আর অন্যজন ৪৫০ মিনিট খেলে ৫টি গোল করেন, তবে কম মিনিট খেলা ফুটবলারই গোল্ডেন বুট পাবেন।
চলতি আসরে গোল্ডেন বুটের মূল লড়াইটা মেসি ও এমবাপ্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও, ফুটবলের বিশ্বমঞ্চে এই পুরস্কারের দৌড়ে অন্য তারকাদের পারফরম্যান্সও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ইংল্যান্ডের অধিনায়ক হ্যারি কেইন, তরুণ তুর্কি জুড বেলিংহাম কিংবা নরওয়েজিয়ান গোলমেশিন আর্লিং হালান্ডের মতো বিশ্বমানের খেলোয়াড়রা নিজ নিজ দলের হয়ে আলো ছড়িয়েছেন। তবে নকআউট পর্বের নাটকীয়তা আর ধারাবাহিকতায় শেষ পর্যন্ত মেসি ও এমবাপ্পের দ্বৈরথই ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোল্ডেন বুট প্রতিযোগিতার জন্ম দিয়েছে। মূলত মাঠের প্রতিটি সেকেন্ডের হিসাব এবং সতীর্থদের প্রতি বাড়ানো নিখুঁত পাসই নির্ধারণ করে দেয় কার হাতে উঠবে টুর্নামেন্টের এই শ্রেষ্ঠত্বের স্মারক।