দক্ষিণ এশিয়ার নারী ফুটবলে ভারতের একচ্ছত্র আধিপত্যের ইতিহাস দীর্ঘদিনের হলেও, গত দুটি সাফ টুর্নামেন্টে টানা চ্যাম্পিয়ন হয়ে সেই ধারায় পরিবর্তন এনেছিল বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল। পূর্ববর্তী দুই আসরেই বাংলাদেশের মেয়েরা ভারতের জালে তিনবার করে বল পাঠিয়ে দাপুটে জয় সুনিশ্চিত করেছিল। তবে ভারতের গোয়ায় চলমান নারী সাফ টুর্নামেন্টে গ্রুপ পর্বের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে সেই জয়ের ধারা ব্যাহত হয়েছে। স্বাগতিক ভারতের কাছে ৩-০ গোল ব্যবধানে পরাজিত হয়েছে বাংলাদেশ। এই ফলাফলের ফলে দীর্ঘ সাত বছর পর অর্থাৎ ২০১৯ সালের পর এই প্রথম ভারতের নারী ফুটবল দলের কাছে পরাজয় বরণ করতে হলো বাংলাদেশকে।
Table of Contents
একাদশে পরিবর্তন ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত
ম্যাচের পূর্বে বাংলাদেশ দলের অভ্যন্তরীণ রণকৌশল এবং একাদশে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। নারী ফুটবল দলের নিয়মিত অধিনায়ক আফিদাকে এই টুর্নামেন্ট শুরুর আগে নেতৃত্বের দায়িত্ব দেওয়া হলেও, পরবর্তীতে প্রধান কোচ পিটার বাটলার মারিয়া মান্দাকে নতুন অধিনায়ক হিসেবে মনোনীত করেন। নেতৃত্ব হারানোর পাশাপাশি এই ম্যাচে শুরুর একাদশেও নিজের জায়গা হারান আফিদা।
তার পরিবর্তে রক্ষণভাগে খেলতে নামা সুরমা জান্নাত আশানুরূপ পারফরম্যান্স প্রদর্শন করতে পারেননি। অন্যদিকে, পূর্ববর্তী ম্যাচ মিস করা অভিজ্ঞ মিডফিল্ডার মনিকা চাকমা সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ভারতের বিপক্ষে এই গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে একাদশে প্রত্যাবর্তন করেন। তবে ডিফেন্ডার শিউলি আজিমকে এই ম্যাচের একাদশে রাখেননি কোচ পিটার বাটলার।
প্রথমার্ধের খেলা ও ভারতের লিড
টুর্নামেন্টের প্রথম ম্যাচে মালদ্বীপের বিপক্ষে খেলার মাত্র ১১ সেকেন্ডের মাথায় গোল করে রেকর্ড গড়েছিলেন বাংলাদেশের ফরোয়ার্ড আনিকা রানিয়া সিদ্দিকী। ভারতের বিপক্ষে ম্যাচের প্রথমার্ধে তিনি গোলের একটি সুবর্ণ সুযোগ পেয়েও তা মাঠের বাস্তবতায় কাজে লাগাতে ব্যর্থ হন। ম্যাচের শুরু থেকেই স্বাগতিক ভারত সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে খেলতে থাকে। তাদের পরিকল্পিত ও আক্রমণাত্মক ফুটবলের সামনে বাংলাদেশের রক্ষণভাগ বেশ কয়েকবার পরাস্ত হয়।
ম্যাচের ৩৫তম মিনিটে প্রথম গোলের দেখা পায় স্বাগতিক দেশ। উড়ান্ত একটি বল বাংলাদেশের ডিফেন্ডাররা সঠিকভাবে ক্লিয়ার বা প্রতিহত করতে ব্যর্থ হলে, বক্সের ভেতর বল পেয়ে যান ভারতের ফুটবলার পিয়ারি। তিনি নিখুঁত কোনাকুনি শটের মাধ্যমে বল বাংলাদেশের জালে জড়িয়ে দলকে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে নেন। এই একমাত্র গোলের লিড বজায় রেখেই প্রথমার্ধ শেষে ড্রেসিংরুমে ফেরেভারতীয় দল।
দ্বিতীয়ার্ধের বিপর্যয় ও গোলের ব্যবধান বৃদ্ধি
দ্বিতীয়ার্ধে গোল পরিশোধ করে ম্যাচে সমতা ফেরানোর উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ আক্রমণাত্মক খেলার চেষ্টা করলেও রক্ষণভাগের মারাত্মক ভুলে উল্টো আরেকটি গোল হজম করে। ভারতীয় ফরোয়ার্ড বল নিয়ে বক্সের ভেতর প্রবেশ করলে বাংলাদেশের ডিফেন্ডার সুরমা জান্নাত তাকে নিয়মবহির্ভূতভাবে ফাউল করেন। রেফারি তাৎক্ষণিকভাবে পেনাল্টির বাঁশি বাজান।
ভারতের পক্ষে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নামা লিন্ডাকম পেনাল্টি থেকে গোল করতে কোনো ভুল করেননি। ২-০ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ার পর বাংলাদেশ দল মানসিকভাবে ম্যাচ থেকে ছিটকে পড়ে এবং তাদের পরাজয় কেবল সময়ের অপেক্ষা হয়ে দাঁড়ায়। এরপর ম্যাচের শেষ দিকে ভারতীয় ফুটবলার মালাভিকা আরও একটি গোল করলে পরাজয়ের ব্যবধান ৩-০ গোলে উন্নীত হয় এবং ভারত পূর্ণ জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে।
পয়েন্ট টেবিলের সমীকরণ ও সেমিফাইনাল
গ্রুপ পর্বে টানা দুই ম্যাচে জয়লাভ করে মোট ৬ পয়েন্ট অর্জন করার মাধ্যমে স্বাগতিক ভারত ‘এ’ গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন হিসেবে শেষ চারে পা রেখেছে। অন্যদিকে, ভারতের কাছে ম্যাচটি হেরে গেলেও পূর্বের জয়ের ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশ গ্রুপ রানার্স-আপ হিসেবে সেমিফাইনাল খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে। সেমিফাইনালে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ হিসেবে খেলবে অন্য গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন দল নেপাল। আগামী ৩ জুন ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে দল দুটি মুখোমুখি হবে।
বাংলাদেশের পারফরম্যান্সের সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা
গত দুই আসরের ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন হলেও এবারের টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের শুরুটা আশানুরূপ বা শক্তিশালী হয়নি। অপেক্ষাকৃত দুর্বল প্রতিপক্ষ মালদ্বীপের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে ৪-২ গোল ব্যবধানে জিতলেও, ম্যাচের একপর্যায়ে মালদ্বীপ ২-২ গোলে সমতা এনে বাংলাদেশের ডিফেন্সকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছিল। অথচ সেই একই মালদ্বীপ ভারতের বিপক্ষে কোনো গোল করতে পারেনি এবং উল্টো ১১-০ গোলের বিশাল ব্যবধানে পরাজিত হয়েছিল।
মালদ্বীপ ম্যাচের ধারাবাহিকতায় ভারতের বিপক্ষেও বাংলাদেশের পারফরম্যান্স ছিল বেশ ম্রিয়মাণ। মাঠে কোনো প্রকার নিয়ন্ত্রিত ও পরিকল্পিত ফুটবল ফুটিয়ে তুলতে পারেননি মারিয়া মান্দারা। পুরো ম্যাচে কেবল ঋতুপর্ণা চাকমার দূরপাল্লার কয়েকটি শটই ছিল বাংলাদেশের আক্রমণের একমাত্র উল্লেখযোগ্য দিক।
