
সেভিয়ার জালে রাফিনিয়ার হ্যাটট্রিক: ভেঙে দিলেন মেসির ১৭ বছরের রেকর্ড
২০২৬-২৭ মৌসুমের শুরুটা যেন জাদুকরী ছন্দে কাটাচ্ছেন রাফিনিয়া। বার্সেলোনার জার্সিতে মাঠে নেমে একের পর এক অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্স উপহার দিচ্ছেন এই ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড। সম্প্রতি সেভিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে পিছিয়ে পড়েও অসাধারণ এক জয় তুলে নিয়েছে কাতালান ক্লাবটি। দলের সেই জয়ের মূল নায়ক ছিলেন রাফিনিয়া নিজে। দুর্দান্ত এক হ্যাটট্রিক করে তিনি পুরো ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের মুঠোয় নিয়ে আসেন। এই জয়ের সুবাদে লা লিগার প্রথম সাত ম্যাচেই তার নামের পাশে এখন জমা হয়েছে অবিশ্বাস্য ১২টি গোল।
ফুটবল পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, স্প্যানিশ লিগের ইতিহাসের শুরুর দিকে এমন বিধ্বংসী ফর্ম খুব কম খেলোয়াড়ের পক্ষেই দেখানো সম্ভব হয়েছে। বিখ্যাত পরিসংখ্যানবিদ মিস্টারচিপের তথ্য অনুযায়ী, লা লিগার প্রথম সাত ম্যাচে অন্তত ১২ বা তার বেশি গোল করার অনন্য নজির এর আগে গড়েছেন মোটে সাতজন ফুটবলার। এই তালিকার চূড়ায় রয়েছেন রিয়াল ওভিয়েদোর কিংবদন্তি এস্তেবান এচেভাররিয়া। সুদূর ১৯৪৩-৪৪ মৌসুমে তিনি লিগের প্রথম সাত ম্যাচে করেছিলেন ১৪ গোল। পরবর্তীতে ২০১৪-১৫ মৌসুমে রিয়াল মাদ্রিদের জার্সিতে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো করেছিলেন ১৩ গোল। সেই সোনালী সময়ে রোনালদো শেষ পর্যন্ত ৩৫ ম্যাচে করেছিলেন মোট ৪৮ গোল।
অন্যদিকে, বার্সেলোনার ইতিহাসের অন্যতম সেরা তারকা লিওনেল মেসি তার ক্যারিয়ারে কখনোই লা লিগার প্রথম সাত ম্যাচে ১২ গোলের দেখা পাননি। বার্সেলোনার হয়ে খেলার দীর্ঘ ১৭ বছরেও এই মাইলফলক ছুঁতে ব্যর্থ হয়েছেন আর্জেন্টাইন জাদুকর। অতীতে মেসি তার সেরা ফর্মে প্রথম সাত ম্যাচে সর্বোচ্চ ১১ গোল করতে পেরেছিলেন। রাফিনিয়া এবার সেই সংখ্যা তো ছাড়িয়েই গেছেন, সাথে গড়েছেন এক ঐতিহাসিক রেকর্ড।
সেভিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ছিলেন রাফিনিয়া। ম্যাচের প্রথমার্ধে তিনি প্রথম গোলটি করেন নিজের ডান পায়ে। সতীর্থ আন্দ্রেস ক্রিশিয়ানসেনের একটি রক্ষণচেরা পাস থেকে বল পেয়ে প্রতিপক্ষের এক ডিফেন্ডারকে চমৎকারভাবে কাটিয়ে তিনি বল জালে জড়ান। এরপর ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই তরুণ সেনসেশন লামিন ইয়ামালের একটি নিখুঁত ক্রসে মাথা ছুঁইয়ে বার্সেলোনাকে এগিয়ে দেন তিনি। ম্যাচের ৬৯ মিনিটে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ইয়ামালের বাড়ানো লম্বা বল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে তিনি প্রতিপক্ষের গোলরক্ষককে একা পেয়ে যান। বাম পায়ের চতুর ও আলতো চিপ শটে বল জালে পাঠিয়ে দলের জয় পুরোপুরি নিশ্চিত করেন এই ফরোয়ার্ড।
ফুটবলপ্রেমীদের কাছে এই গোলগুলোর ধরণ বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। একটি গোল এসেছে ডান পায়ে, একটি হেডে এবং অন্যটি বাম পায়ে। ফুটবলের পরিভাষায় এই বিশেষ অর্জনকে বলা হয় ‘পারফেক্ট হ্যাটট্রিক’। সেভিয়ার বিপক্ষে রাতে মাঠে নেমে অবিকল এই কীর্তিটিই গড়ে দেখিয়েছেন রাফিনিয়া। বার্সেলোনার মতো ঐতিহ্যবাহী ক্লাবে ১৭ বছর কাটিয়েও যে রেকর্ড লিওনেল মেসির নামের পাশে যোগ হয়নি, রাফিনিয়া এবার সেটি নিজের করে নিলেন।
মাঠের খেলায় রাফিনিয়া এখন ক্রমশ লিওনেল মেসির পুরোনো ছায়া হয়ে উঠছেন। বার্সেলোনার বর্তমান কোচ হানসি ফ্লিক তাকে মাঠে খেলাচ্ছেন ‘ফলস নাইন’ বা ছদ্ম স্ট্রাইকার ভূমিকায়। কেন্দ্রীয় এই পজিশনে নেমে তিনি অবিশ্বাস্য মুন্সিয়ানা দেখাচ্ছেন। চলতি মৌসুমে মোটে ৭ ম্যাচে ১২ গোল করার পাশাপাশি তিনি সতীর্থদের দিয়ে করিয়েছেন আরও ৩টি গোল।
অবশ্য রাফিনিয়ার এই ঘুরে দাঁড়ানোর পেছনে ব্যক্তিগত লড়াইয়ের একটি গল্পও রয়েছে। ঠিক আগের মৌসুমটি চোট আর ইনজুরির কারণে তার জন্য মোটেও ভালো কাটেনি। ফিটনেস সমস্যার কারণে সেবার গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচগুলো মিস করেছিলেন, এমনকি ছিটকে যেতে হয়েছিল বিশ্বকাপ থেকেও। যার সরাসরি প্রভাব পড়েছিল ক্যারিয়ারে; ২০২৬ সালের মর্যাদাপূর্ণ ব্যালন ডি’অরের সংক্ষিপ্ত তালিকাতেও তার নাম জায়গা পায়নি। হয়তো সেই হতাশা আর নিজেকে নতুন করে বিশ্বমঞ্চে প্রমাণের তাগিদ থেকেই রাফিনিয়া এখন মাঠে আগুন ঝরাচ্ছেন। বার্সেলোনার আক্রমণভাগকে নেতৃত্ব দিয়ে তিনি প্রমাণ করে দিয়েছেন যে, সঠিক সুযোগ এবং পজিশন পেলে যেকোনো পুরনো রেকর্ডই পুনর্লিখন সম্ভব।