বিলিয়ার্ড ও স্নুকার খেলার নিয়মাবলী । খেলাধুলার আইন

আজকের আলোচনার বিষয় বিলিয়ার্ড ও স্নুকার খেলার নিয়মাবলী। স্নুকার শব্দের আভিধানিক অর্থ আড়াল করা। খেলার সময় স্ট্রাইকার বা কিউ বলটিকে সব সময় প্রতিপক্ষের আড়ালে রাখার প্রবণতার কারণে এই খেলার সাথে নামকরণের মিল খুজে পাওয়া যায়। যদিও এই খেলার নামকরণ হয়েছে আকস্মিকভাবে।

 

বিলিয়ার্ড ও স্নুকার খেলার নিয়মাবলী । খেলাধুলার আইন
বিলিয়ার্ড

 

বিলিয়ার্ড ও স্নুকার খেলার নিয়মাবলী । খেলাধুলার আইন

জন্ম কথা

এই খেলার প্রথম প্রচলন ঘটে ভরতে। ১৮৭৫ সালে ভারতের জোব্বলপুরে ডেভেনসায়ার রেজিমেন্টের অফিসারদের মধ্যে এই খেলার প্রথম প্রচলন ঘটে। উল্লেখ আছে যে একদিন ডেভেনসায়ার রেজিমেন্টোর অফিসার নোভল বোউস চেম্বারলেন তার পার্টনারকে একটি সহজ সুযোগ মিস করার জন্য সুকার বলে ভৎসনা করেছিলেন। তখন সুকার শব্দটি একটি গালি হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এই অফিসার এই গালি শোনার পর খুবই মর্মাহত হলে সেখানকার অফিসাররা এই খেলার নাম সুকার নামকরণের সিদ্ধান্ত নেন। যাতে আর কখনো অন্য কাউকে মিস করার জন্য লুকার গালি শুনতে না হয়।

বাংলাদেশ স্নুকার

বিশ্বব্যাপী স্নুকার খেলা একটি ব্যাপক প্রচলিত খেলা হলেও বাংলাদেশে এই খেলার গতি সীমাবদ্ধ। বাংলাদেশে প্রধানত যে সকল স্থানে লুকার খেলোর প্রচলন রয়েছে তার মধ্যে নারায়নগঞ্জ ক্লাব, চিটাগাং ক্লাব ও গুলশান ক্লাব অন্যতম। এছাড়া আর্মি, নেভী বিমান বাহিনীতে এই খেলার প্রচলন রয়েছে।

বিলিয়ার্ড এ্যাসোসিয়েশন

বিশ্বব্যাপী স্নুকার খেলার সর্বপ্রথম গভর্নিং বডি হচ্ছে বিলিয়ার্ড এসোসিয়েশন। ১৮৮৫ সালে এই এ্যাসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯০৮ সালে এ খেলার নিয়ম-কানুন রক্ষার জন্য বিলিয়ার্ড কন্ট্রোল ক্লাব গঠিত হয়। ১৯১৯ সালে এই দুটি সংগঠনকে একত্রিত করে বিলিয়ার্ড ও কন্ট্রোল ক্লাব গঠিত হয়। ১৯৭১ সালে এর নামকরণ পরিবর্তন করে “বিলিয়ার্ড এন্ড স্নুকার কন্ট্রোল কাউন্সিল’ রাখা হয়। ১৯৬৮ সালে ওয়াল্ড প্রফেসনাল বিলিয়ার্ড এন্ড স্নুকার এসোসিয়েশন গঠিত হয়। এই এসোসিয়েশন এখন প্রফেসনাল খেলোয়াড়দের সর্বসময় কর্তৃপক্ষ। আর ১৯৭৩ সালে গঠিত ইন্টারন্যাশনাল বিলিয়ার্ড এন্ড সুকার ফেডারেশন অ্যামেচারদের খেলা তদারক করে। বাংলাদেশে এই খেলা বৃটিশ আমল থেকে প্রচলিত থাকলেও ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশ বিলিয়ার্ড এন্ড লুকার ফেডারেশন গঠিত হয় ।

স্নুকা্রে বর্তমানে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হচ্ছে পুরুষ বিভাগে স্কটল্যান্ডের ‘স্টিফেন হেনরী” আর মহিলা বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হচ্ছেন এলিসন কিশার”।

 

স্নুকার
স্নুকার

 

স্নুকার খেলার সরঞ্জামাদি

টেবিলঃ

মুকার খেলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হচ্ছে টেবিল। আর এই টেবিলের কারণে এই খেলাটি আর্থিকভাবে ব্যয়বহুল। টেবিলের সাইজ হচ্ছে দৈর্ঘ্য ১২ ফিট বা ৩.৬ মিটার এবং প্রস্থ হচ্ছে ৬ ফিট ১১ ইঞ্চি বা ১.৮৫ মিটার

ফ্লোর থেকে টেবিলের উচ্চতা হচ্ছে২ ফিট ১০ ইঞ্চি বা ৮৬ সেন্টিমিটার। টেবিলের উপরে চারদিকে বর্ডার থাকে এবং টেবিলের টপ মখমল জাতীয় সবুজ কাপড় বা ফেণ্ট দ্বারা আচ্ছাদিত থাকে।

বিলিয়ার্ড ও স্নুকার খেলা একই টেবিলে খেলা হয়। এই টেবিলে ৬ টি ‘পকেট’ থাকে। চার কোণায় চারটি এবং দৈর্ঘ্যে মাঝামঝিতে দুই পার্শ্বের বর্ডারে দুইটি পকেট থাকে।
প্রতি পকেটের স্টান্ডার সাইজ হচ্ছে সাড়ে তিন ইঞ্চি বা ৪৪.৯ মিলিমিটার। টেবিলকে চারভাগে ভাগ করা হয়। বীল্ক এরিয়া,স্পট, পিরামিড স্পট ও দ্য স্পট।

বল :

আর সুকার খেলার জন্য ৭ রংয়ের বল প্রয়োজন হয় এবং এই রংয়ের বল সেটিং করার জন্য ৭ টি স্পট থাকে ।

বিলিয়ার্ড ও স্নুকারের প্রতিটি বলের আকৃতি আড়াই ইঞ্চি ডায়ামিটার। মুকার খেলায় মোট ৭ টি রংয়ের ২১ টি বল থাকে। সব বলের আকৃতি সমান । এছাড়া সুকার খেলার জন্য একটি সাদা রংয়ের বল প্রয়োজন হয়। এই বলটিকে স্ট্রাইকার বা সুকারের ভাষায় কিউ বল বলা হয়। এই কিউ বল দ্বারা হিট করে সুকার খেলায় ব্যবহৃত ৭ রংয়ের ২১ টি বলকে পকেটে ফেলে পয়েন্ট সংগ্রহ করা হয় ।

সাদা রংয়ের কিউ বল ছাড়া বাকি ৭ রংয়ের ২১ টি বলকে ভিন্ন ভিন্ন নামে চিহ্নিত করা হয় । এই ২১ টি বলের মধ্যে লাল রংয়ের ১৫ টি বল হচ্ছে রেড। এছাড়া অন্য ৬ কালারের ৬টি বলকে কালার (বল) বলা হয়। এই ৬টি কালার হচ্ছে ব্লাক, পিংক, ব্লু, ব্রাউন, গ্রীন ও ইয়েলো। এই ৬টি কালার বলের পয়েন্ট ভিন্ন। ব্লাক বলটি সর্বোচ্চ ৭ পয়েন্ট, পিংক বলটি ৬ পয়েন্ট, ব্লু বলটি ৫ পয়েন্ট, ব্রাউন বলটি ৪ পয়েন্ট, গ্রীন বলটি ৩ পয়েন্ট ও ইয়েলো বলটি ২ পয়েন্ট। আর প্রতিটি রেড এক পয়েন্ট হিসেবে ১৫ টি রেড ১৫ পয়েন্ট। সাদা বলটি হচ্ছে স্ট্রাইকার বা কিউ বল । এই কিউ বল দিয়ে অন্যান্য বলকে হিট করে পকেটে ফেলে পয়েন্ট সংগ্রহ করতে হবে।

 

বিলিয়ার্ড
বিলিয়ার্ড

 

কিউঃ

বিলিয়ার্ড ও স্নুকার খেলায় লম্বা যে উডেন স্টিক দিয়ে কিউ বল বল) কে হিট করে অন্যান্য কালার ও রেড খেলা হয় সেই স্টিকারটিকে কিউ বলা হয়।

বিলিয়ার্ড ও স্নুকার খেলায় খেলার সুবিধার জন্য বিভিন্ন ধরণের ও মাপের কিছু ব্যবহার করা হয়। তবে কিউ সর্বনিম্ন দৈর্ঘ্য ৩ ফিট বা ৯১ সেন্টিমিটার হবে। কিউর বাট অর্থাৎ যে অংশ হাত দ্বারা ধরা হয় সেই অংশ সাধারণত ১ ইঞ্চি ডায়ামিটার হয়। তারপর ক্রমশ সরু হতে থাকা কিউর প্রান্ত অংশ অর্থাৎ যে প্রাপ্ত দ্বারা কিউ বলকে খেলা হয় সে প্রান্তের ডায়ামিটার হয় সাধারণত ৩%, ইঞ্চি।

কিউর মাথা লেনার (চামড়া) টেপ দ্বারা মোড়ানো থাকে।

এছাড়া বিলিয়ার্ড ও স্নুকার খেলায় আর যে সরঞ্জামানি ব্যবহার করা হয় তার মধ্যে কিউ এক্সটেনশন (কিউবলকে খেলার আধুনিক স্টিক), রেন্ট (কিউ দ্বারা কিউবলতে সর্বসম্মতভাবে খেলার জন্য কিউকে রেস্টের উপর সেট করা হয়) হাফ বাট, (রেস্টের মতো কিউকে সেট করে কিউবল খেলার জন্য ব্যবহার করা হয়), লংরেস্ট ও দা স্পাইডার (এক প্রকার রেস্ট) অন্যতম ।

স্কোর বোর্ড ঃ

বিলিয়ার্ড ও স্নুকার খেলায় প্রতিদ্বন্দ্বি খেলোয়াড়দের পয়েন্ট কাউন্ট করার জন্য স্কোর বোর্ড থাকে। যারা খেলায় স্কোর কাউন্ট করেন এবং স্কোর বোর্ড কে কত পয়েন্ট সংগ্রহ করলো তা চিহ্নিত করেন তাদেকে মার্কার বলা হয়। এছাড়া খেলা সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করার জন্য একজন রেফারি থাকেন ।

 

স্নুকার খেলার নিয়ম

অন্য যে কোন খেলার মতো সুকার খেলা টসের মাধ্যমে শুরু করতে হয়। এই খেলা সিঙ্গেলসে ও ডাবলসে খেলা যায়। হুকার খেলায় ওপেনিং শর্টের জন্য কিউ বলকে ডে এরিয়ার যে কোন স্থানে বসিয়ে খেলা শুরু করতে হয়। খেলা শুরুতে কিউ বলকে পিরামিড এরিয়ায় রেডকে হিট করে খেলা শুরু করতে হয়। প্রত্যেক দানে। খেলা শুরু করতে হবে রেডকে খেলে। রেড পকেটে পড়ার পর কালার খেলা যাবে। েেখলার শুরুতে রেড না খেলে কালার খেললে ঐ শর্টটি ফাউল হবে। একটি শর্ট মিস হলে অর্থাৎ বল পকেটে না পড়লে ঐ খেলায়াড়ের মিস হবে তখন প্রতিপক্ষ খেলার সুযোগ পাবে।

রেড বা কালারকে সুকারের ভাষায় টপ বলা হয়। একজন খেলোয়াড় একসানে যত পয়েন্ট পাবেন মার্কার তা স্কোর বোর্ডে চিহ্নিত করবে। হুকার খেলায় একজন খেলোয়াড় একটি ফ্রেম থেকে সর্বোচ্চ ১৪৭ পয়েন্ট সংগ্রহ করতে পারেন। একটি বোর্ড শেষ হলে অর্থাৎ ১৫টি রেড ও ৬টি কালার বল পকেটস্থ হলে একটি ফ্রেম শেষ হবে। যে ফ্রেমটির খেলা শেষ হলো সেই ফ্রেমটিতে যে খেলা শুরু করেছে পরবর্তী ফ্রেমটিতে তার প্রতিপক্ষ খেলা শুরু করবে।

কোন খেলোয়াড় খেলার শুরুতে রেড খেলে তারপর একটি কালার খেলতে পারবে। ঐ অবস্থায় কালার বলটি পকেটস্থ হলে আবার নিজ স্পটে ফিরে আসবে। ১৫ টি রেডের একটি রেড বোর্ডে যতক্ষণ থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত কালার বল পকেটে পট হলে সেই কালার বলটি উঠিয়ে নির্ধারিত স্পটে বসাতে হবে। উল্লেখিত প্রত্যেকটি কালারের জন্য বোর্ডে নির্দিষ্ট স্পট আছে। আর রেড পট হলে সেই ফ্রেম শেষ না। হওয়া পর্যন্ত রেড পুনরায় উঠবে না। আর একটি রেড বোর্ডে থাকা পর্যন্ত একটি কালার বল পট করে অন্য আরেকটি কালার বল খেলা যাবে না। রেড পট করে তবেই কালার খেলতে হবে।

কিন্তু যখন সব রেড পট হয়ে যাবে তখন ৬ টি কালার বল খেললে ফ্রেম শেষ না হওয়া পর্যন্ত ঐ কালার বল উঠবে না। টেবিল রেড বিহীন থাকা অবস্থায় কালার বলকে খেলার সময় সবচেয়ে কম পয়েন্ট থেকে অর্থাৎ ইয়েলো কালার থেকে পয়েন্টের ঊর্ধ্ব ক্রমানুসারে কালার খেলতে হবে এবং ব্লাক কালার সবার শেষে খেলতে হবে।

স্নুকার খেলায় একজন খেলোয়াড় যদি ফাউল করে বা মিস করে তখন প্রতিপক্ষ খেলার সুযোগ পাবে। তাকে কিউবল যে পজিশনে থাকবে সেই পজিশনে থেকে প্রতিপক্ষকে খেলা শুরু করতে হবে। যদি কিউবলটি পকেটে পড়ে যায় বা টেবিলের বাইরে যায় তখন “ডি” এরিয়ায় কিউ বলটি বসিয়ে খেলা পুনরায় শুরু করতে হবে। সাধারণত ৩.৫ বা ৭ ফ্রেমে একটি গেম শেষ হয় এবং যতটি ফ্রেম খেলা হোক না কেন ঐ ফ্রেমগুলো থেকে বেশি পয়েন্ট অর্জনকারী জয়ী হবেন।

 

স্নুকার খেলার উল্লেখযোগ্য কিছু নিয়ম

রেড খেলার সময় কিউবল পকেটে পট হলে ফাউল হবে। এতে প্রতিপক্ষ চার পয়েন্ট পাবে । আর যদি কোন কালার বল খেলার সময় কিউবল পকেটে পড়ে তাহলে প্রতিপক্ষ ঐ কালার বলের সমান পয়েন্ট পাবে। কিন্তু কালার বলটি যদি চার পয়েন্টের কম হয় তাহলে প্রতিপক্ষ চার পয়েন্ট পাবে।

কিউবলকে যদি একচান্সে খেলা না যায় তাহলে সেই খেলোয়াড়ের সেই দান মিস হবে। যদি কিউবল রেডে না লাগে তাহলে ফাউল শর্ট হবে এবং প্রতিপক্ষ চার থেকে সাত পয়েন্ট পাবে। আবার কোন কালার বল খেলার সময় কিউবল যদি ঐ বলে হিট না করে রেডে হিট করে তাহলে প্রতিপক্ষ ঐ কালার বলের সমান পয়েন্ট পাবে।

যদি কিউবল খেলার সময় জাম্প করে টেবিলের বাইরে চলে যায় তাহলে ফাউল হবে এবং বল খেলতে গিয়ে এমন হয়েছে প্রতিপক্ষ সেই বলের সমান পয়েন্ট পাবে। আবার কিউ বল দ্বারা খেলে এক সঙ্গে দুটি রেড পকেটে পট হলে তখন যে খেলেছে সে দুই পয়েন্ট পাবে। কিন্তু একসঙ্গে দুটি কালার বল খেলা যাবে না। যদি খেলার সময় রেড ও কালার বল একসঙ্গে পকেটে পড়ে তাহলে ফাউল হবে এবং বলে প্রতিপক্ষ মিনিমাম চার থেকে সাত পয়েন্ট পাবে ।

আবার যদি কালার খেলার সময় রেড বা অন্য কালার পকেটে যায় বা একটি কালার খেলার সময় অন্য কালারে টাচ হয় তাহলে যে কালার খেলা হলো এবং যে বল পকেটে পড়লো বা টাচ হলো দুটি কালারের মধ্যে যে কালারের পয়েন্ট বেশি প্রতিপক্ষ ফাউল স্বরূপ সেই পয়েন্ট পাবে।

রেড বোর্ডে থাকা অবস্থায় কালার খেলতে হলে মেনশন করতে হবে । যে কোন কালারে খেলা হবে এবং যে কালার খেলার জন্য মেনশন করা হয়েছে তা না করে অন্য কালার বা রেড খেলা হলে বা ফাউল করা হলে প্রতিপক্ষ সাত পয়েন্ট পাবে। আবার একটি রেড খেলার পর পুনরায় আরেকটি রেড খেলা যাবে না। ছয় কালারের যে কোন কালার খেলতে হবে। যদি একটি রেড খেলার পর আর একটি রেড খেলা হলে ফাউল স্বরূপ প্রতিপক্ষ ব্লাক কালারের সমান সাত পয়েন্ট পাবে। এছাড়া মুকার খেলার আরো অনেক নিয়ম রয়েছে। কয়েকটি ফ্রেম খেলা হলে যে কেউ এ খেলাটি রপ্ত করতে পারবে।

Leave a Comment