মেক্সিকোর ঐতিহাসিক আজতেকা স্টেডিয়ামে উপস্থিত হাজার হাজার স্বাগতিক সমর্থককে স্তব্ধ করে দিয়ে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে ইংল্যান্ড। প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে নির্ধারিত সময়ের প্রায় এক ঘণ্টা পর ম্যাচটি শুরু হয়। শুরু থেকেই মেক্সিকানদের একের পর এক আক্রমণের বিপরীতে দারুণ কৌশলে খেলেছে থমাস টুখেলের শিষ্যরা। আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণের এই রোমাঞ্চকর ম্যাচে প্রথমার্ধেই ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে যায় থ্রি লায়ন্সরা। দ্বিতীয়ার্ধে লাল কার্ডের নাটকীয়তায় ইংল্যান্ড ১০ জনের দলে পরিণত হলেও, শেষ পর্যন্ত ৩-২ ব্যবধানের জয় নিয়েই মাঠ ছাড়ে তারা। অন্যদিকে, আসরের অন্যতম সহ-আয়োজক মেক্সিকোর বিদায়ে স্তব্ধ হয়ে গেছে পুরো স্টেডিয়াম।
Table of Contents
মাঠের বাইরে বৈরী পরিবেশ ও কঠোর নিরাপত্তা
ম্যাচের আগে থেকেই মাঠের বাইরের আবহাওয়া ছিল বেশ উত্তপ্ত। শেষ ষোলোর এই গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচটি খেলতে মেক্সিকোয় পা রাখার পর থেকেই ইংলিশ ফুটবলারদের নানামুখী বিরূপ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। স্বাগতিক মেক্সিকান সমর্থকেরা বিমানবন্দরে ইংলিশ দলকে দুয়ো ধ্বনি দিয়ে ‘অভ্যর্থনা’ জানায়। এমনকি তাদের যাত্রাপথেও সমর্থকেরা অনেক দূর পর্যন্ত ধাওয়া করে এবং টিম হোটেলের বাইরে গিয়ে উচ্চ শব্দে হট্টগোল করার পরিকল্পনা করে, যাতে ইংলিশদের মনোযোগ ও ঘুমে ব্যাঘাত ঘটে। তবে এর আগে ইকুয়েডর ম্যাচের অপ্রীতিকর অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি হতে দেয়নি মেক্সিকোর স্থানীয় নিরাপত্তা বাহিনী। কঠোর নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে ফেলা হয় ইংলিশ শিবিরের চারপাশ, ফলে মাঠের বাইরের এই মনস্তাত্ত্বিক লড়াই খেলায় বড় কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি।
মাঠের লড়াইয়ে মেক্সিকোর দাপট, ইংল্যান্ডের কার্যকারিতা
ম্যাচের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে পুরো ম্যাচজুড়েই আধিপত্য ছিল মেক্সিকোর। বিখ্যাত আজতেকা স্টেডিয়ামে বল পজেশনে অনেক এগিয়ে ছিল স্বাগতিকরা; ম্যাচের ৬৭ শতাংশ সময় বল ছিল তাদের নিয়ন্ত্রণে। পুরো ম্যাচে তারা ১৯টি শট নেয়, যার মধ্যে ৪টি ছিল অন-টার্গেট বা গোলমুখে। বিপরীতে, ইংল্যান্ড মাত্র ৫টি শট নেওয়ার সুযোগ পায়। তবে ইংলিশদের আক্রমণগুলো ছিল অত্যন্ত নিখুঁত ও কার্যকর। তাদের ৫টি শটের মধ্যে ৪টিই ছিল লক্ষ্যভেদী, যার তিনটিই মেক্সিকোর জালে জড়ায়।
বেলিংহ্যামের জোড়া গোল ও কোয়ানসার লাল কার্ড
চলতি বিশ্বকাপের প্রথম চারটি ম্যাচে মেক্সিকোর রক্ষণভাগ ছিল একদম নিরেট, তারা কোনো গোলই হজম করেনি। তবে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার এই লড়াইয়ে ইংলিশ মিডফিল্ডার জুড বেলিংহ্যামের কোনো জবাবই ছিল না মেক্সিকান ডিফেন্ডারদের কাছে। ম্যাচের প্রথম ৩৫ মিনিট পর্যন্ত স্কোরলাইন গোলশূন্য সমতায় থাকলেও, এরপরই শুরু হয় বেলিংহ্যাম ম্যাজিক। মাত্র ৯৮ সেকেন্ডের ব্যবধানে পরপর দুটি দৃষ্টিনন্দন গোল করে ইংল্যান্ডকে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে দেন এই তারকা।
তবে বিরতির ঠিক আগমুহূর্তে দারুণ ফর্মে থাকা মেক্সিকোর ফরোয়ার্ড হুলিয়ান কুইনোনেস এক গোল শোধ করলে ব্যবধান দাঁড়ায় ২-১। দ্বিতীয়ার্ধের ৫৪ মিনিটে ঘটে ম্যাচের সবচেয়ে নাটকীয় ঘটনা। মেক্সিকোর হেসুস গায়ার্দোকে অত্যন্ত বাজেভাবে ফাউল করায় রেফারি ইংল্যান্ডের ডিফেন্ডার জ্যারেল কোয়ানসাকে সরাসরি লাল কার্ড দেখান। ফলে ম্যাচের একটি বড় অংশ থমাস টুখেলের দলকে ১০ জন নিয়ে খেলতে হয়। ১০ জনের দলের বিপক্ষে মেক্সিকো অল-আউট ফুটবল শুরু করলেও হ্যারি কেইনের পেনাল্টি থেকে গোল ইংল্যান্ডকে ৩-১ ব্যবধানে এগিয়ে দেয়। পরবর্তীতে কেইনের একটি ফাউলের সুবাদে পেনাল্টি পায় মেক্সিকো। মেক্সিকান তারকা রাউল হিমিনেজ স্পট কিক থেকে নিখুঁত শটে স্কোরলাইন ৩-২ করলেও তা কেবল ব্যবধানই কমিয়েছে, দলের পরাজয় এড়াতে পারেনি।
আজতেকার ঐতিহাসিক রেকর্ড ও মেক্সিকোর আক্ষেপ
১৯৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক আজতেকা স্টেডিয়ামে এটি মেক্সিকোর ফুটবল ইতিহাসে মাত্র তৃতীয় প্রতিযোগিতামূলক পরাজয়। এর আগে এই মাঠে তারা ২০০১ সালে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে কোস্টারিকার কাছে এবং ২০১৩ সালে হন্ডুরাসের কাছে ২-১ ব্যবধানে হেরেছিল। মেক্সিকান সমর্থকদের আশা ছিল, ১৯৮৬ সালের পর এবার তারা ঘরের মাঠে কোয়ার্টার ফাইনালে পা রাখবে। কিন্তু এই হারের ফলে টানা আটবার ‘রাউন্ড অব সিক্সটিন’ বা শেষ ষোলোর ধাপ থেকেই বিদায় নিতে হলো ‘এল ত্রি’দের। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের গ্রুপপর্ব থেকে বিদায় নেওয়ার পর এবার কিছুটা উন্নতি হলেও, ঘরের মাঠে এই হার মেক্সিকান ফুটবল ভক্তদের মনে দীর্ঘকাল এক তিক্ত অভিজ্ঞতা হিসেবে থেকে যাবে।
