২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহারের মাধ্যমে এক নতুন বাস্তবতায় প্রবেশ করতে যাচ্ছে। বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় এই ক্রীড়া আসরে ম্যাচ কৌশল নির্ধারণ থেকে শুরু করে সামগ্রিক ইভেন্ট পরিচালনা পর্যন্ত বিভিন্ন ক্ষেত্রে রিয়েল-টাইম ডেটা বিশ্লেষণ এবং থ্রিডি সিমুলেশন ব্যবহৃত হবে।
প্রতিটি অংশগ্রহণকারী দলকে আলাদা এআই মডেল সরবরাহ করা হবে, যা ভিডিও ক্লিপ এবং থ্রিডি অ্যাভাটারের সাহায্যে প্রতিপক্ষ দলের খেলার ধরন বিশ্লেষণ করবে। এই মডেল সম্ভাব্য কৌশলগত ফলাফল তুলনামূলকভাবে উপস্থাপন করতে সক্ষম হবে, ফলে কোচরা পরিবর্তিত পরিকল্পনার কার্যকারিতা সম্পর্কে আগাম ধারণা পাবেন। একইসঙ্গে খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স সম্পর্কেও বিশদ বিশ্লেষণ সরবরাহ করা হবে।
‘ফুটবল এআই প্রো’ নামে পরিচিত প্রযুক্তিটি বিপুল পরিমাণ ফিফা ডেটা বিশ্লেষণ করে কাজ করে। এটি দুই হাজারেরও বেশি সূচক—যেমন প্রেসিং, মুভমেন্ট, কৌশলগত বিন্যাস, আক্রমণ ও রক্ষণ পরিবর্তনের মুহূর্ত—বিশ্লেষণ করতে সক্ষম। প্রাপ্ত তথ্য কখনো লেখা, কখনো চার্ট এবং কখনো ভিডিও ক্লিপ আকারে উপস্থাপন করা হয়, যা ব্যবহারকারীদের জন্য সহজবোধ্য করে তোলে।
এই প্রযুক্তির নির্মাতা লেনোভো, যারা বিশ্বকাপের প্রযুক্তিগত অংশীদার হিসেবে যুক্ত রয়েছে। গবেষণা অনুযায়ী, অতীতে প্রযুক্তিগত সুবিধায় এগিয়ে থাকা ধনী দলগুলোর সঙ্গে অন্যান্য দলের ব্যবধান এআই ব্যবহারের মাধ্যমে কমে আসতে পারে, ফলে প্রতিযোগিতার ভারসাম্য বৃদ্ধি পাবে।
২০২৬ বিশ্বকাপ যৌথভাবে যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো এবং কানাডার ১৬টি শহরে অনুষ্ঠিত হবে। ৪৮টি দল অংশগ্রহণ করবে এই আসরে এবং মোট ম্যাচ সংখ্যা হবে ১০৪টি। উদ্বোধনী ম্যাচ অনুষ্ঠিত হওয়ার নির্ধারিত তারিখ ১১ জুন।
খেলোয়াড়দের শরীর ডিজিটালি স্ক্যান করে এক সেকেন্ডের মধ্যেই তাদের নিখুঁত থ্রিডি প্রতিরূপ তৈরি করা হবে। এর মাধ্যমে অফসাইড সিদ্ধান্ত আরও নির্ভুল ও সহজবোধ্য হবে এবং দর্শকরাও ভিএআর সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা স্পষ্টভাবে বুঝতে পারবেন।
প্রতিটি স্টেডিয়ামের জন্য তৈরি করা হবে ‘ডিজিটাল টুইন’, অর্থাৎ বাস্তব স্টেডিয়ামের ভার্চ্যুয়াল অনুলিপি। এই ব্যবস্থায় রিয়েল-টাইমে দর্শকের উপস্থিতি, নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং খেলোয়াড়দের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে।
নিচের সারণিতে ২০২৬ বিশ্বকাপের প্রধান পরিসংখ্যান উপস্থাপন করা হলো—
| সূচক | তথ্য |
|---|---|
| আয়োজক দেশ | যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো, কানাডা |
| আয়োজক শহর | ১৬টি |
| অংশগ্রহণকারী দল | ৪৮টি |
| মোট ম্যাচ | ১০৪টি |
| উদ্বোধনী ম্যাচ | ১১ জুন |
| সম্ভাব্য ডেটা উৎপাদন | ৯০ পেটাবাইটের বেশি |
| সম্ভাব্য মোট ডেটা (আনুমানিক) | প্রায় ২ এক্সাবাইট |
প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর হিসাব অনুযায়ী, এই বিশ্বকাপ থেকে ৯০ পেটাবাইটের বেশি ডেটা উৎপন্ন হবে, যা ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের তুলনায় প্রায় ৪৫ গুণ বেশি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মোবাইল ব্যবহার এবং অন্যান্য ডিজিটাল কার্যক্রম যুক্ত হলে মোট ডেটা প্রায় ২ এক্সাবাইটে পৌঁছাতে পারে, যা বিপুল পরিমাণ তথ্যের সমতুল্য।
স্টেডিয়ামের বাইরেও প্রযুক্তির ব্যবহার বিস্তৃত হবে। ৭টি কোম্পানি ১০টি শহরে স্বয়ংচালিত রোবোট্যাক্সি পরিচালনা করবে। এসব যানবাহনে স্টিয়ারিং হুইল ছাড়াই যাতায়াত সম্ভব হবে। একইসঙ্গে কিছু শহরে মানবসদৃশ রোবট ব্যবহার করা হবে স্টেডিয়াম পরিচালনা, সরঞ্জাম পরিবহন এবং দর্শক সহায়তায়।
সাম্প্রতিক সময়ে অন্যান্য খেলাধুলাতেও এআইয়ের ব্যবহার শুরু হয়েছে। অকল্যান্ডভিত্তিক একটি বেসবল দল ম্যাচ পরিচালনায় এআই ব্যবহার শুরু করেছে, যার মধ্যে দল নির্বাচন, ব্যাটিং লাইনআপ নির্ধারণ এবং খেলোয়াড় পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত অন্তর্ভুক্ত। নরওয়ের একটি ফুটবল ক্লাবও পরীক্ষামূলকভাবে এআইকে প্রধান কোচ হিসেবে ব্যবহার করেছে।
সবদিক বিবেচনায়, ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ শুধু একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়; এটি এআই প্রযুক্তির ব্যবহারিক প্রয়োগের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত হতে যাচ্ছে।
