ইরান নারী ফুটবল: স্বাধীনতার সন্ধানে বিপর্যস্ত যাত্রা

‘আমার পছন্দ, আমার দেশ’—তেহরানের ভালিআসর স্কয়ারে উজ্জ্বল বিলবোর্ডে প্রকাশিত এই স্লোগান যেন ইরানের নারী ফুটবল দলের সংগ্রাম ও আত্মনিষ্ঠার প্রতীক। সম্প্রতি আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে দেশের জাতীয় টেলিভিশন সরাসরি সম্প্রচার করছিল। সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে ছিলেন দলের খেলোয়াড়রা, পাশে সরকারি কর্মকর্তারা। পতাকাবাহী সমর্থকরা উল্লাসের মধ্য দিয়ে বীরোচিত অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন।

ইরান নারী দল ‘লায়নেস’ নামে পরিচিত। এশিয়ান কাপের অস্ট্রেলিয়ার প্রতিযোগিতায় তারা তিনটি ম্যাচই হেরেছে। তবে দেশে ফেরার মাত্র কিছু দিন পর এই সংবর্ধনা আয়োজন করা হয়, যা যুদ্ধবিধ্বস্ত পরিস্থিতিতেও ছিল সরকারের কাছে একটি বড় জয়। দলের কয়েকজন খেলোয়াড় ব্রিসবেনে সেফ হাউসে থাকা অবস্থায় দেশত্যাগের পরিকল্পনা করেছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত মাত্র দুজনই সেখানে থাকেন।

ইরান ফুটবল ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট মেহেদি তাজ জানান, “এ অ্যাথলেটরা তাদের মাতৃভূমি, পতাকা, নেতা ও বিপ্লবের প্রতি অনুগত।” জার্সি ও বাধ্যতামূলক কালো হিজাব পরে খেলোয়াড়রা জাতীয় সংগীতের সঙ্গে সঙ্গ গেয়েছিলেন। তবে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে দেখা যায়, খেলোয়াড়দের মুখে বিষণ্নতার ছাপ স্পষ্ট।

মানবিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

ইরান জাতীয় দলের অনেক সদস্য মাত্র ২১ বছর বয়সী। তাদের সামনে দুইটি পথ ছিল:

  1. দেশে থাকা: যুদ্ধবিধ্বস্ত এবং দমনমূলক শাসকগোষ্ঠীর মুখোমুখি হওয়া।
  2. প্রবাসে আশ্রয়: স্বাধীনতা এবং নিরাপত্তা, কিন্তু পরিবারের জন্য বিপদ।

সাবেক জাতীয় খেলোয়াড় মোহাম্মদ তাগভি বলেন, “তাদের পরিবারকে লক্ষ্য করে চাপ প্রয়োগ করা হয়। এ মেয়েরা এখনও শিশু—তাদের মানসিক চাপ অসীম।”

২০১৯ সালে সাহার খোদায়ারি নামের তরুণী আজাদি স্টেডিয়ামে প্রবেশের চেষ্টা করে গ্রেপ্তার হন। পরে তিনি আদালতের প্রাঙ্গণে আগুন ধরিয়ে মারা যান। ফিফার নিয়ম অনুযায়ী নারী দর্শক এবং জাতীয় নারী দল থাকা বাধ্যতামূলক, না হলে পুরুষ দলও আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে অংশ নিতে পারবে না।

এশিয়ান কাপ ও দমনমূলক পরিস্থিতি

ইরান নারী দল ২ মার্চ দক্ষিণ কোরিয়ার বিরুদ্ধে প্রথম ম্যাচ খেলে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই। জাতীয় সংগীতের সময় তারা গলা মেলাননি। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন তাদের ‘যুদ্ধকালীন বিশ্বাসঘাতক’ আখ্যা দেয়। পরবর্তী ম্যাচে তারা শুধু জাতীয় সংগীত গাননি, সামরিক অভিবাদন প্রদর্শন করেছেন।

দলের যাত্রা শুধু মাঠেই সীমাবদ্ধ ছিল না—রাজনৈতিক চাপ ও গোয়েন্দা নজরদারি তাদের সঙ্গে ছিল প্রতিনিয়ত। ব্রিসবেনের হোটেলে থাকা খেলোয়াড়দের উপর নজরদারি ও যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা ছিল।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

অস্ট্রেলিয়া এবং আন্তর্জাতিক মহলে দলটির নিরাপদ আশ্রয় নিয়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। কিছু খেলোয়াড় অস্ট্রেলিয়ায় থাকলেও পরিবারের নিরাপত্তার কারণে দেশ ফিরে আসে। বর্তমানে ব্রিসবেনে দুই খেলোয়াড় অনুশীলন করছেন।

খেলোয়াড়ের বয়সঅবস্থানহোটেলে অবস্থাসিদ্ধান্ত
34আতেফে রামাজানজাদেহসেফ হাউসআশ্রয় নেন
21ফাতেমেহ পাসানদিদেহসেফ হাউসআশ্রয় নেন
বাকিরাবিভিন্নমালয়েশিয়ার হোটেলদেশে ফেরেন

এই সংবর্ধনা ও আন্তর্জাতিক দৃষ্টি সত্ত্বেও খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা নিশ্চিত নয়। সোয়ানসবোরো জানিয়েছেন, ইন্টারনেট বন্ধ ও গোয়েন্দা নজরদারির কারণে শাস্তির সম্ভাবনা এখনও রয়ে গেছে—ফুটবল থেকে নিষিদ্ধকরণ অথবা কঠোর নির্যাতন।

ইরান নারী ফুটবল দলের এই যাত্রা কেবল খেলা নয়; এটি এক সাহসী সংগ্রাম, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ও মানবাধিকারের জন্য বীরত্বের প্রতীক।

Leave a Comment