মালয়েশিয়ান ফুটবল দীর্ঘদিন ধরেই প্রশাসনিক দুর্বলতা ও কাঠামোগত সংকটের অভিযোগে জর্জরিত। তবে জাল নথি ব্যবহার করে বিদেশে জন্ম নেওয়া খেলোয়াড়দের জাতীয় দলে খেলানোর অভিযোগ সেই সংকটকে এবার প্রকাশ্য কেলেঙ্কারিতে রূপ দিয়েছে। এশিয়ান কাপ বাছাই পর্বে অযোগ্য খেলোয়াড় খেলানোর ঘটনায় তীব্র সমালোচনা ও আন্তর্জাতিক চাপের মুখে সর্বশেষ দেশটির ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এফএএম)-এর পুরো নির্বাহী কমিটি একযোগে পদত্যাগ করেছে, যা মালয়েশিয়ান ফুটবলের ইতিহাসে বিরল ঘটনা।
বুধবার এফএএমের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ইউসুফ মাহাদি আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাহী কমিটির পদত্যাগের ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, এই সিদ্ধান্তের মূল উদ্দেশ্য সংস্থাটির সুনাম ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থ রক্ষা করা এবং এমন ঝুঁকি কমানো, যা ভবিষ্যতে পুরো মালয়েশিয়ান ফুটবলের ওপর আরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এই পদত্যাগ ফিফা ও এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনকে এফএএমের শাসনব্যবস্থা, প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ও নীতিগত ত্রুটি স্বাধীনভাবে পর্যালোচনার সুযোগ করে দেবে।
২০২৫-২০২৯ মেয়াদের জন্য নির্বাচিত নির্বাহী কমিটি মাত্র ১১ মাস আগে দায়িত্ব নিয়েছিল। সেই কমিটির সব সদস্যই সর্বসম্মত ও স্বেচ্ছাসিদ্ধান্তে পদত্যাগ করেছেন, যাতে চলমান তদন্ত ও সংস্কার প্রক্রিয়ায় কোনো প্রভাব না পড়ে এবং সংস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা পুনরুদ্ধার সম্ভব হয়।
এই সংকটের সূত্রপাত হয় গত বছরের সেপ্টেম্বরে। তখন বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা অভিযোগ আনে, মালয়েশিয়া সাতজন বিদেশে জন্ম নেওয়া খেলোয়াড়কে মালয়েশিয়ান বংশোদ্ভূত হিসেবে দেখিয়ে জাল নথি জমা দিয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ফিফা ওই সাত খেলোয়াড়কে এক বছরের জন্য নিষিদ্ধ করে এবং এফএএমকে চার লাখ মার্কিন ডলার জরিমানা করে। এফএএম এই শাস্তির বিরুদ্ধে আপিল করলেও ফিফার সংশ্লিষ্ট কমিটি তা খারিজ করে দেয় এবং শাসনব্যবস্থায় দৃশ্যমান শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেওয়ার জন্য সংস্থাটির কড়া সমালোচনা করে।
পরবর্তীতে এফএএম সুইজারল্যান্ডের কোর্ট অব আরবিট্রেশন ফর স্পোর্টসে (সিএএস) আপিল করে। আপিল পর্যালোচনার সময় সিএএস ফিফার নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে স্থগিত করায় সংশ্লিষ্ট খেলোয়াড়রা আবারও মাঠে নামার অনুমতি পান। এরই মধ্যে তারা ২০২৭ এশিয়ান কাপ বাছাই পর্বে ভিয়েতনামের বিপক্ষে ম্যাচে অংশ নেন, যেখানে মালয়েশিয়া ৪-০ গোলে জয় পায়। তবে ওই ম্যাচের পরই অভিযোগের ভিত্তিতে ফিফা নতুন করে তদন্ত শুরু করে।
অভিযোগ অনুযায়ী, খেলোয়াড়রা আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, নেদারল্যান্ডস ও স্পেনের নাগরিক ছিলেন এবং ফিফার নিয়ম লঙ্ঘন করে দ্রুত নাগরিকত্ব দেওয়া হয়। খেলোয়াড় অযোগ্যতার প্রমাণ পাওয়ায় গত মাসে ফিফা মালয়েশিয়ার তিনটি ম্যাচের ফল বাতিল করে দেয় এবং প্রতিটি ম্যাচ ৩-০ গোলে পরাজয় হিসেবে গণ্য করে। পাশাপাশি এফএএমকে ১০ হাজার সুইস ফ্রাঁ জরিমানাও করা হয়।
কেলেঙ্কারির সংক্ষিপ্ত চিত্র
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| অভিযুক্ত খেলোয়াড় | ৭ জন |
| খেলোয়াড়দের জন্মদেশ | আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, নেদারল্যান্ডস, স্পেন |
| ফিফার শাস্তি | ১২ মাস নিষেধাজ্ঞা (সাময়িক স্থগিত) |
| এফএএমের জরিমানা | ৪ লাখ মার্কিন ডলার |
| বাতিল ম্যাচ | ৩টি (৩-০ গোলে পরাজয় গণ্য) |
এই কেলেঙ্কারি মালয়েশিয়ায় ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। সমর্থকরা শুধু এফএএম নয়, যেসব সরকারি সংস্থা নাগরিকত্ব প্রদানের প্রক্রিয়ায় জড়িত ছিল, তাদের বিরুদ্ধেও তদন্ত ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা দাবি করছেন। অনেক আইনপ্রণেতা মনে করছেন, এই ঘটনা শুধু ফুটবল নয়, রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের স্বচ্ছতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
কবে সিএএসে চূড়ান্ত রায় হবে, তা এখনো অনিশ্চিত। তবে নির্বাহী কমিটির পদত্যাগ স্পষ্ট করে দিয়েছে—এই কেলেঙ্কারি মালয়েশিয়ান ফুটবলে একটি যুগান্তকারী মোড় এনে দিয়েছে, যার প্রভাব দীর্ঘদিন অনুভূত হবে।
