ইউক্রেনীয় ওয়েবসাইটের বিতর্কিত তালিকায় ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো

বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার (FIFA) সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর নাম ইউক্রেনের বিতর্কিত ‘মিরোতভোরেৎস’ (Myrotvorets) ওয়েবসাইটের তথাকথিত ‘কিল লিস্ট’ বা হত্যা তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ইউক্রেন রাষ্ট্রসমর্থিত এই অনলাইন প্ল্যাটফর্মটি মূলত সেই সব ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করে, যাদের তারা ইউক্রেনের ‘শত্রু’ বলে মনে করে। ইনফান্তিনোর মতো একজন আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বকে এই তালিকায় রাখায় ক্রীড়া ও রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

অভিযোগের ভিত্তি ও প্রেক্ষাপট

মিরোতভোরেৎস ওয়েবসাইটের পক্ষ থেকে ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে ‘ইউক্রেনের বিরুদ্ধে মানবিক আগ্রাসন’ এবং রাশিয়াকে ‘পদ্ধতিগত সহযোগিতা’ প্রদানের অভিযোগ আনা হয়েছে। তাদের দাবি, ফিফা সভাপতি বিভিন্ন সময়ে রাশিয়ার পক্ষে প্রচারণা বা প্রোপাগান্ডা ছড়াতে সহায়তা করেছেন। বিশেষ করে, ২০১৯ সালে ক্রেমলিনে এক জমকালো অনুষ্ঠানের মাধ্যমে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন যখন ইনফান্তিনোকে দেশটির রাষ্ট্রীয় সম্মান ‘অর্ডার অব ফ্রেন্ডশিপ’-এ ভূষিত করেছিলেন, সেই স্মৃতিকে বর্তমান পরিস্থিতির সাথে যুক্ত করে এই অভিযোগ তোলা হয়েছে।

ইনফান্তিনোর মন্তব্য ও ইউক্রেনের প্রতিক্রিয়া

সম্প্রতি একটি আন্তর্জাতিক সাক্ষাৎকারে ইনফান্তিনো মন্তব্য করেছিলেন যে, রুশ ফুটবলারদের আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ফিরে আসার সুযোগ দেওয়া উচিত। তিনি মনে করেন, দীর্ঘস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা ও বয়কট কেবল ‘হতাশা ও ঘৃণা’র জন্ম দেয়। তাঁর এই উদারপন্থী অবস্থান ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের ক্ষুব্ধ করেছে। ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রেই সিবিগা ফিফা সভাপতিকে ‘নৈতিকভাবে অধঃপতিত’ বলে কঠোর সমালোচনা করেছেন।

নিচে মিরোতভোরেৎস ওয়েবসাইট এবং ফিফা সভাপতির বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরা হলো:

বিষয়ের নামবিস্তারিত বিবরণ ও তথ্য
ব্যক্তিত্বের নামজিয়ান্নি ইনফান্তিনো (সভাপতি, ফিফা)
ওয়েবসাইটের নামমিরোতভোরেৎস (Myrotvorets)
মূল অভিযোগরুশ প্রোপাগান্ডা ছড়ানো ও রাশিয়াকে সমর্থন প্রদান।
বিতর্কিত সম্মাননা২০১৯ সালে পুতিন প্রদত্ত ‘অর্ডার অব ফ্রেন্ডশিপ’।
বিপজ্জনক দিকতালিকায় থাকা ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ ও ‘ডেট অব এলিমিনেশন’ কলাম।
রাশিয়ার অবস্থানক্রীড়া ও রাজনীতিকে আলাদা রাখার আহ্বান এবং নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদ।

‘মিরোতভোরেৎস’ ওয়েবসাইটের কুখ্যাতি

মিরোতভোরেৎস ওয়েবসাইটটি নিজেকে একটি স্বাধীন নাগরিক উদ্যোগ হিসেবে দাবি করলেও, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার মতে, ইউক্রেনের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর সাথে এর গভীর যোগসূত্র রয়েছে। এই ওয়েবসাইটটি ‘কিল লিস্ট’ নামে পরিচিত হওয়ার প্রধান কারণ হলো, ইতিপূর্বে এই তালিকায় নাম থাকা বেশ কয়েকজন সাংবাদিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব রহস্যজনকভাবে নিহত হয়েছেন। ওয়েবসাইটের প্রতিটি প্রোফাইলে ব্যক্তির জন্মতারিখের নিচে ‘ডেট অব এলিমিনেশন’ বা ‘নির্মূলের তারিখ’ নামক একটি ঘর থাকে, যা অত্যন্ত উস্কানিমূলক ও বিপজ্জনক হিসেবে বিবেচিত হয়।

আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গন ও রাজনৈতিক সংকট

২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই ফিফা এবং উয়েফা রুশ জাতীয় দল ও ক্লাবগুলোকে সকল আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা থেকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। মস্কো এই সিদ্ধান্তকে সর্বদা ‘বৈষম্যমূলক’ এবং অলিম্পিক চার্টারের লঙ্ঘন বলে দাবি করে আসছে। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে বলেন, অলিম্পিক আন্দোলন এবং ক্রীড়া জগতকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা কখনোই কাম্য নয়।

ইউক্রেনীয় সাইটের এই পদক্ষেপ বিশ্ব ক্রীড়া প্রশাসনের শীর্ষ ব্যক্তিত্বদের জন্য এক ধরণের পরোক্ষ হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই ঘটনা কেবল ইনফান্তিনোর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নয়, বরং বৈশ্বিক ক্রীড়া কূটনীতির জটিলতাকেও নতুন করে উন্মোচিত করেছে। পশ্চিমা বিশ্বের অনেক নেতার নামও আগে এই তালিকায় উঠেছে, যা প্রমাণ করে যে ইউক্রেনীয় জাতীয়তাবাদের এই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মটি কোনো আন্তর্জাতিক শিষ্টাচারের তোয়াক্কা করছে না।

Leave a Comment