লা মাসিয়ার আঁতুড়ঘর থেকে উঠে আসা ডাচ মিডফিল্ডার জাভি সিমন্সের ক্যারিয়ার যেন এক দীর্ঘ অভিযানের গল্প। লিওনেল মেসি, নেইমার এবং কিলিয়ান এমবাপ্পের মতো কিংবদন্তিদের ছায়ায় বেড়ে ওঠা এই ২২ বছর বয়সী তারকা এখন লন্ডনের ক্লাব টটেনহ্যাম হটস্পারে নিজের একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার পথে। গত আগস্টে আরবি লাইপজিগ থেকে ৫১.৮ মিলিয়ন পাউন্ডের বিশাল ট্রান্সফার ফি-তে স্পার্সে যোগ দিলেও, মৌসুমের প্রথমার্ধটা তাঁর জন্য সহজ ছিল না। তবে ১০ জানুয়ারি অ্যাস্টন ভিলার বিপক্ষে এফএ কাপের সেই তিক্ত অভিজ্ঞতা সিমন্সের ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়ে দিয়েছে। বিরতিতে ২-০ তে পিছিয়ে থাকার সময় ভক্তদের দুয়োধ্বনি শুনে মুষড়ে না পড়ে বরং নিজেকে নতুন করে চেনার সংকল্প করেছিলেন তিনি। সেই ম্যাচের পর থেকে সিমন্স আর পেছনে ফিরে তাকাননি।
Table of Contents
মাঠের পারফরম্যান্স ও পরিসংখ্যানের উত্থান
১০ জানুয়ারির সেই ম্যাচের পর থেকে টটেনহ্যাম পাঁচটি ম্যাচ খেলেছে এবং এর মধ্যে তিনটিতেই সিমন্স ছিলেন দলের সেরা খেলোয়াড়। চ্যাম্পিয়ন্স লিগে বরুশিয়া ডর্টমুন্ড ও আইন্ট্রাখট ফ্রাঙ্কফুর্টের বিপক্ষে জয় এবং ম্যানচেস্টার সিটির বিরুদ্ধে ২-২ ড্রয়ের ম্যাচে তাঁর পারফরম্যান্স ছিল চোখধাঁধানো। অপ্টা (Opta)-এর পরিসংখ্যান বলছে, গত ছয় ম্যাচে তাঁর খেলার ধরণ আমূল বদলে গেছে। প্রথম ২৩ ম্যাচে তিনি যেখানে ২৪টি গোলের সুযোগ তৈরি করেছিলেন, সেখানে শেষ ৬ ম্যাচেই তৈরি করেছেন ১৭টি সুযোগ।
নিচে গত কয়েক ম্যাচে সিমন্সের পারফরম্যান্সের একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো:
| সূচক (Metrics) | প্রথম ২৩ ম্যাচ (গড়) | শেষ ৬ ম্যাচ (গড়) |
| সুযোগ তৈরি (Chances Created) | ১.০৪ | ২.৮৩ |
| সফল ড্রিবলিং (Successful Dribbles) | ২.১ | ৪.৫ |
| গোলমুখে শট (Shots on Target) | ০.৮ | ১.৯ |
| পাসিং একিউরেসি (Passing Accuracy) | ৮২% | ৮৯% |
কেন বদলে গেলেন সিমন্স?
সিমন্সের এই নাটকীয় পরিবর্তনের পেছনে কোচ থমাস ফ্রাঙ্ক-এর নতুন ফরমেশন (৩-৪-২-১) বড় ভূমিকা রেখেছে। এখানে তিনি বাঁ-দিকের ‘নাম্বার টেন’ পজিশনে খেলার স্বাধীনতা পাচ্ছেন। এছাড়া ডমিনিক সোলাঙ্কের ইনজুরি কাটিয়ে ফেরা সিমন্সকে একজন যোগ্য স্ট্রাইকার খুঁজে পেতে সাহায্য করেছে। তবে মাঠের বাইরের শৃঙ্খলাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। সিমন্স এখন নিজের জন্য একটি বিশেষ বিশেষজ্ঞ দল পরিচালনা করেন:
ব্যক্তিগত প্রশিক্ষক ও শেফ: খাদ্যাভ্যাস এবং শারীরিক সক্ষমতা বজায় রাখতে কাজ করেন।
ভিডিও অ্যানালিস্ট: নিজের প্রতিটি পদক্ষেপ বিশ্লেষণ করেন।
মাইন্ডসেট কোচ: মানসিক চাপ সামলানো এবং ধ্যানের মাধ্যমে একাগ্রতা বৃদ্ধি করেন।
জীবনের নানা চড়াই-উতরাই ও আভিজাত্য
সাত বছর বয়সে বার্সেলোনায় যোগ দেওয়া এই ফুটবলারের নাম রাখা হয়েছিল কিংবদন্তি জাভি হার্নান্দেজের নামে। মাত্র ১২ বছর বয়সে নেইমারের সঙ্গে বিজ্ঞাপনচিত্রে অভিনয় করা এই কিশোর পিএসজিতে যাওয়ার সময় ইনস্টাগ্রামে ১৬ লক্ষ অনুসারী নিয়ে গিয়েছিলেন। লা মাসিয়াতে তাঁর ডাকনাম ছিল ‘রিজোস ডি ওরো’ বা সোনালী কোঁকড়া চুলের বালক। নেদারল্যান্ডসের হয়ে ইতিমধ্যে ৩২টি ম্যাচ খেলা সিমন্স সাতটি ভাষায় (ডাচ, সুরিনামি ডাচ, স্প্যানিশ, কাতালান, ইংরেজি, ফরাসি এবং জার্মান) সাবলীল কথা বলতে পারেন।
স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে মেলবন্ধন
সিমন্স কেবল মাঠের ফুটবলার নন, তিনি লন্ডনের স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গেও মিশে যাচ্ছেন। ক্লাবের কিংবদন্তি লেডলি কিং এবং মাইকেল ডসন তাকে টটেনহ্যামের অলিগলি ঘুরিয়ে দেখিয়েছেন। এমনকি টটেনহ্যামের বিখ্যাত সঙ্গীত জুটি ‘চ্যাস অ্যান্ড ডেভ’ সম্পর্কেও তিনি গুগলে অনুসন্ধান করে ভক্তদের মন জয় করেছেন। অন্যদিকে, অ্যালঝেইমার্স সোসাইটির কার্যক্রমে অংশ নিয়ে তিনি তাঁর মানবিক দিকটিও ফুটিয়ে তুলেছেন, কারণ তাঁর দাদী নিজেও এই রোগে আক্রান্ত।
আগামী শনিবার ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিপক্ষে যখন সিমন্স মাঠে নামবেন, তখন তিনি আর কোনো মহাতারকার ছায়া নন, বরং নিজেই এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে দ্যুতি ছড়াতে প্রস্তুত।
