স্প্যানিশ ফুটবলের মেঘে ঢাকা তারা: ফুটবলার নিতার অজানা আখ্যান

ঋত্বিক ঘটকের কালজয়ী সিনেমা ‘মেঘে ঢাকা তারা’-র নিতার মতো এক করুণ অথচ মহিমান্বিত চরিত্র স্পেনের ফুটবল ইতিহাসে দীর্ঘকাল বিস্মৃতির অন্তরালে ঢাকা পড়ে ছিল। যেখানে মাঠে পুরুষদের আধিপত্যের ভিড়ে ছদ্মবেশে এক নারী হয়ে উঠেছিলেন ফুটবলের জাদুকর। স্পেনের চতুর্থ বিভাগের ক্লাব ‘ভেলেজ’-এর শতবর্ষপূর্তি উপলক্ষ্যে ক্রীড়া সাংবাদিক হেসুস হুরতাদো যখন ইতিহাস অনুসন্ধান করতে বসেন, তখন বেরিয়ে আসে ‘ভেলেতা’ বা আনা কারমোনা রুইজের অবিশ্বাস্য জীবনের গল্প। ১৯০৮ সালে মালাগার এক অতি সাধারণ পরিবারে জন্মানো এই নারীই ছিলেন স্প্যানিশ ফুটবলের সেই সাহসী নিতা, যিনি সমাজ ও নিয়মকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ফুটবল মাঠে নিজের পায়ের জাদু দেখিয়েছিলেন।

ফুটবলার নিতার সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

বৈশিষ্ট্যতথ্য
আসল নামআনা কারমোনা রুইজ (নিতা)
মাঠের নামভেলেতা (Veleta)
জন্ম ও মৃত্যু১৯০৮ – ১৯৪০
প্রথম ক্লাবস্পোর্টিং ক্লাব ডি মালাগা
উল্লেখযোগ্য ক্লাবভেলেজ ক্লাব (Vélez CF)
খেলার পজিশনমাঝমাঠ (প্লে-মেকার)
জার্সি নম্বর১০

ফুটবলের স্বপ্নে নিতার লড়াই ও সংগ্রামের সূচনা

নিতার বাবা আন্দ্রেস মালাগা বন্দরে মাল খালাসের কাজ করতেন। বন্দরের পাশে ইংরেজ নাবিকদের ফুটবল খেলা দেখে কিশোরী নিতার মনে এই খেলার প্রতি ভালোবাসা জন্মায়। তবে বিংশ শতাব্দীর শুরুতে স্প্যানিশ সমাজ কোনো মেয়ের ফুটবল খেলা কল্পনাই করতে পারত না। ফুটবল খেলার অপরাধে নিতা মা-বাবার হাতে অসংখ্যবার মার খেয়েছেন, এমনকি প্রতিবেশীদের আপত্তির মুখে তাঁকে মাথার চুল কেটে শাস্তি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নিতার স্বপ্ন ছিল পাহাড়সমান দৃঢ়। গ্যালিসিয়ান পাদরি ফ্রান্সিসকো মিগুয়েজের সহায়তায় তিনি গোপনে অনুশীলন শুরু করেন এবং ছেলেদের দল ‘স্পোর্টিং ক্লাব ডি মালাগা’-তে ধোপানি ও ম্যাসাজকর্মী হিসেবে কাজ করার ছলে নিজের ফুটবল প্রতিভা ফুটিয়ে তোলেন।

ছদ্মবেশ ও ‘জেন্টলম্যান অ্যাগ্রিমেন্ট’

নিতা যখন বুঝতে পারেন যে নারী পরিচয়ে ফুটবল খেলা সম্ভব নয়, তখন তিনি এক অনন্য কৌশলের আশ্রয় নেন। তিনি চুল ছোট করে ছাঁটেন এবং বুকের স্ফীত অংশ কাপড়ের আস্তরণে সমান করে ঢোলা জার্সি পরে মাঠে নামতেন। মাথায় পরতেন উলের বেরেট টুপি। ১৯২৭ থেকে ১৯২৯ সাল পর্যন্ত তিনি ‘ভেলেজ’ ক্লাবের হয়ে মাঠ মাতান। তাঁর সতীর্থরা তাঁর আসল পরিচয় জানলেও ‘জেন্টলম্যান অ্যাগ্রিমেন্ট’ বা পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে তা গোপন রাখেন। কারণ, নিতা ছিলেন তৎকালীন সময়ের অন্যতম সেরা কুশলী ফুটবলার। গোল করানো এবং গোল করা—উভয় ক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন অনন্য।

ট্র্যাজেডি ও অকাল প্রয়াণ

নিতার এই লুকোচুরি বেশিদিন স্থায়ী হতে পারেনি। ঈর্ষান্বিত সতীর্থ বা দর্শকদের মাধ্যমে তাঁর পরিচয় ফাঁস হয়ে গেলে ফেডারেশন কঠোর নিয়ম জারি করে। ড্রেসিংরুমে নারীদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয় এবং নিতাকে মাঠ থেকে বিতাড়িত হতে হয়। এরপর আর কোনোদিন মাঠে নামা হয়নি এই ফুটবলার নিতার। মাত্র ৩২ বছর বয়সে টাইফাস-জ্বরে আক্রান্ত হয়ে ১৯৪০ সালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর জীবনের শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী, তাঁকে তাঁর প্রিয় ফুটবল ক্লাবের জার্সিতে সমাহিত করা হয়। ফুটবল মাঠে ছদ্মবেশে লড়াই করা প্রথম নারী হিসেবে নিতা আজও নারী ফুটবলারদের জন্য এক অনুপ্রেরণার উৎস।

Leave a Comment