বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসরকে সামনে রেখে রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেও নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করেছে ইরান। দেশটির ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি মেহদি তাজ দৃঢ়ভাবে জানিয়েছেন, ইরান বিশ্বকাপ থেকে সরে দাঁড়াবে না, তবে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে খেলতেও রাজি নয়। তাঁর ভাষায়, “আমরা আমেরিকাকে বয়কট করব, কিন্তু বিশ্বকাপকে নয়”—এই বক্তব্যই বর্তমান সংকটের মূল সুর হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আগামী ১১ জুন থেকে ১৯ জুলাই পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায় যৌথভাবে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বিশ্বকাপ। বাছাইপর্বের শুরুতেই টিকিট নিশ্চিত করা দলগুলোর মধ্যে ইরান অন্যতম। কিন্তু ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্কের নতুন করে অবনতি ঘটার পর থেকেই দলটির অংশগ্রহণ ঘিরে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়। বিশেষ করে নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক টানাপোড়েন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
বর্তমান সূচি অনুযায়ী, গ্রুপ পর্বে ইরানের তিনটি ম্যাচই যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এর মধ্যে দুটি লস অ্যাঞ্জেলসে এবং একটি সিয়াটলে। প্রতিপক্ষ হিসেবে রয়েছে নিউজিল্যান্ড, বেলজিয়াম ও মিসর। তবে এই সূচি পরিবর্তনের জন্য ইতোমধ্যেই ফিফার সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করেছে ইরান ফুটবল ফেডারেশন। তাদের প্রস্তাব, ম্যাচগুলো মেক্সিকোয় স্থানান্তর করা হোক, যেখানে নিরাপত্তা ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম বলে তারা মনে করছে।
নিচে ইরানের নির্ধারিত গ্রুপ ম্যাচগুলোর একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়া হলো:
| ম্যাচ | প্রতিপক্ষ | নির্ধারিত ভেন্যু | প্রস্তাবিত পরিবর্তন |
|---|---|---|---|
| ম্যাচ ১ | নিউজিল্যান্ড | লস অ্যাঞ্জেলস | মেক্সিকো |
| ম্যাচ ২ | বেলজিয়াম | লস অ্যাঞ্জেলস | মেক্সিকো |
| ম্যাচ ৩ | মিসর | সিয়াটল | মেক্সিকো |
রাজনৈতিক জটিলতার মধ্যেও ইরান দলের প্রস্তুতি থেমে নেই। বর্তমানে তুরস্কে অনুশীলন ক্যাম্প করছে দলটি। সেখানে আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচের অংশ হিসেবে ২৭ মার্চ নাইজেরিয়ার বিপক্ষে এবং চার দিন পর কোস্টারিকার বিপক্ষে মাঠে নামবে তারা। উল্লেখ্য, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে এই চার জাতির আমন্ত্রণমূলক টুর্নামেন্টটি জর্ডান থেকে সরিয়ে তুরস্কে আয়োজন করা হচ্ছে।
এদিকে নারী ফুটবল দল নিয়েও নতুন করে আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। এশিয়ান কাপ খেলতে অস্ট্রেলিয়ায় যাওয়া ইরানি নারী ফুটবলারদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আশ্রয়ের প্রস্তাব দেয় স্বাগতিক দেশটি। সাতজন খেলোয়াড় সেই প্রস্তাবে সাড়া দিলেও শেষ পর্যন্ত মাত্র দুজন অস্ট্রেলিয়ায় থেকে যান, বাকিরা দীর্ঘ ভ্রমণ শেষে দেশে ফিরে আসেন। বিমানবন্দরে তাঁদের স্বাগত জানান মেহদি তাজ নিজেই।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও এই পরিস্থিতিতে মন্তব্য করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন। তিনি একদিকে ইরানি খেলোয়াড়দের আশ্রয় দেওয়ার আহ্বান জানান, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে গেলে তাদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কার কথাও উল্লেখ করেন। যদিও পরে তিনি স্পষ্ট করেন, সম্ভাব্য কোনো হুমকি যুক্তরাষ্ট্র সরকারের পক্ষ থেকে আসবে না। তবু এই মন্তব্যকে কেন্দ্র করে ইরানের উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
অন্যদিকে মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লদিয়া শেইনবাউম ইতোমধ্যে জানিয়েছেন, প্রয়োজনে ইরানের ম্যাচ আয়োজন করতে প্রস্তুত রয়েছে তাঁর দেশ। তবে শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেবে ফিফাই। সংস্থাটি জানিয়েছে, তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি শুধু ক্রীড়াক্ষেত্রেই নয়, আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও কূটনীতির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বিশ্বকাপের নিরপেক্ষতা বজায় রাখা এখন ফিফার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
