উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপে তারকাদের মেলা ও নোরার অংশগ্রহণ

আগামী ১১ জুন থেকে উত্তর আমেরিকার তিন দেশ—যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং মেক্সিকোতে যৌথভাবে আয়োজিত হতে যাচ্ছে ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬। ফুটবল ইতিহাসের এই বৃহত্তম আসরকে স্মরণীয় করে রাখতে আয়োজক দেশগুলো ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। এবারের আসরের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, তিনটি দেশেই পৃথক পৃথক জমকালো উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রতিটি দেশের কৃষ্টি, সংস্কৃতি এবং বিশ্বসেরা সংগীত তারকাদের উপস্থিতিতে এই আয়োজনগুলো বৈশ্বিক ফুটবলে এক নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই মহাযজ্ঞের অন্যতম আকর্ষণ হিসেবে মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি কানাডার বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে পারফর্ম করবেন জনপ্রিয় নৃত্যশিল্পী ও বলিউড তারকা নোরা ফাতেহি।

মেক্সিকো সিটি: ফুটবল মহোৎসবের আনুষ্ঠানিক সূচনা

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের পর্দা উঠবে ১১ জুন মেক্সিকোর ঐতিহাসিক ‘এস্তাদিও আজতেকা’ স্টেডিয়ামে। উদ্বোধনী ম্যাচে স্বাগতিক মেক্সিকোর মুখোমুখি হবে দক্ষিণ আফ্রিকা। এই মেগা ইভেন্টের আগে মেক্সিকোর সমৃদ্ধ সংস্কৃতিকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরতে ল্যাটিন সংগীতের মহাতারকাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কলম্বিয়ার বিশ্বখ্যাত গায়ক জে বলভিন, মেক্সিকোর একাধিক গ্র্যামি জয়ী জনপ্রিয় রক ব্যান্ড ‘মানা’ এবং প্রখ্যাত পপ তারকা আলেজান্দ্রো ফের্নান্দেজ এই মঞ্চ মাতাবেন।

এছাড়াও মেক্সিকোর লাতিনো পপ আইকন বেলিন্দা এবং প্রথিতযশা গায়ক-সুরকার লিলা ডাউন্সকে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যুক্ত করার দাপ্তরিক প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকার তরুণ গায়ক টাইলা এবং লস অ্যাঞ্জেলেস আজুলেসের বিশেষ পরিবেশনা উদ্বোধনী রাতের আমেজকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ফিফা মূলত উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন ফুটিয়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।

টরন্টো: কানাডীয় আভিজাত্য ও নোরা ফাতেহির পরিবেশনা

টুর্নামেন্টের দ্বিতীয় দিনে অর্থাৎ ১২ জুন কানাডার টরন্টোতে স্বাগতিক দেশ মোকাবিলা করবে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার। কানাডায় আয়োজিত এই বিশেষ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দেশটির নিজস্ব সংগীত ঐতিহ্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক তারকাদের সমাগম ঘটবে। এই অনুষ্ঠানে পারফর্ম করার কথা রয়েছে বিশ্বখ্যাত গায়িকা আলানিস মোরিসেটে এবং জনপ্রিয় জ্যাজ গায়ক মাইকেল বাবলের। এছাড়াও মঞ্চে দেখা যাবে আলেসিয়া সারা, এলিয়ানা এবং জেসি রেয়েজ়কে।

এই আয়োজনের বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে থাকছেন নোরা ফাতেহি। উল্লেখ্য যে, নোরা ইতিপূর্বে ২০২২ কাতার বিশ্বকাপেও নিজের নৃত্যের জাদুতে ফুটবল ভক্তদের মুগ্ধ করেছিলেন। টরন্টোর এই আয়োজনটি মূলত ফুটবলের সাথে সুর ও ছন্দের এক অপূর্ব শৈল্পিক সমন্বয় হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। মরক্কো বংশোদ্ভূত এই কানাডীয় তারকার অংশগ্রহণ কানাডার প্রবাসী ও ফুটবল অনুরাগীদের মধ্যে বাড়তি উন্মাদনা সৃষ্টি করেছে।

লস অ্যাঞ্জেলেস: মার্কিন পপ ও আন্তর্জাতিক তারকাদের ভিড়

একই দিন অর্থাৎ ১২ জুন যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে স্বাগতিক দল প্যারাগুয়ের বিপক্ষে মাঠে নামবে। যুক্তরাষ্ট্রের এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটি হতে যাচ্ছে আধুনিক পপ ও হিপ-হপ সংগীতের এক অনন্য প্রদর্শনী। এখানে পারফর্ম করবেন বিশ্বখ্যাত মার্কিন পপ তারকা কেটি পেরি। তার সাথে মঞ্চে থাকবেন জনপ্রিয় র‍্যাপার ফিউচার।

এশীয় দর্শকদের জন্য এই অনুষ্ঠানের বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে থাকছেন বৈশ্বিক কে-পপ ব্যান্ড ‘ব্ল্যাকপিঙ্ক’-এর জনপ্রিয় সদস্য লিসা। এছাড়াও লস অ্যাঞ্জেলেসের এই জমকালো আয়োজনে ব্রাজ়িলীয় সংগীতের আইকন আনিতা এবং উদীয়মান গায়ক রেমা ও টাইলা অংশগ্রহণ করবেন। মূলত বৈশ্বিক সংগীতের সকল ঘরানাকে এক সুতায় গেঁথে ফুটবলের সর্বজনীনতা প্রমাণ করতেই যুক্তরাষ্ট্রের এই সুপরিকল্পিত আয়োজন।

ফিফা সভাপতির সাংস্কৃতিক রূপরেখা

২০২৬ বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো তার বিশেষ পরিকল্পনার কথা ব্যক্ত করেছেন। তিনি জানান, এবারের আসরটি কেবল ৯০ মিনিটের ফুটবল ম্যাচ নয়, বরং বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের সামনে খেলাধুলা ও সংস্কৃতির এক বৈপ্লবিক সংযোগস্থল হিসেবে উপস্থাপিত হবে। ইনফান্তিনোর মতে, মেক্সিকো সিটি থেকে শুরু হয়ে এই সাংস্কৃতিক উন্মাদনা টরন্টো ও লস অ্যাঞ্জেলেসের মাধ্যমে পুরো বিশ্বে ছড়িয়ে পড়বে। ফুটবলের মাধ্যমে বৈশ্বিক সম্প্রীতি ও বিভিন্ন মহাদেশের ঐতিহ্যকে এক মঞ্চে আনাই ফিফার মূল লক্ষ্য।

৪৮টি দলের অংশগ্রহণে ১০৪টি ম্যাচের এই দীর্ঘ আসরে মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি এই সাংস্কৃতিক উৎসবগুলো দর্শকদের ভিন্নধর্মী অভিজ্ঞতা প্রদান করবে। প্রতিটি ভেন্যুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান এমনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের নিজস্বতা বজায় থাকে এবং একইসাথে তা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড স্পর্শ করতে পারে। উত্তর আমেরিকার তিনটি ভিন্ন দেশের ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে এই বিশ্বকাপের মাধ্যমে একীভূত করার চেষ্টা করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ক্রীড়া বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, খেলা ও বিনোদনের এই সমন্বিত প্রয়াস ২০২৬ বিশ্বকাপকে ইতিহাসের অন্যতম ব্যবসা সফল ও জনপ্রিয় আসরে পরিণত করবে। সব মিলিয়ে, আগামী জুনে ফুটবল বিশ্বের নজর থাকবে এই তিন দেশের জমকালো মঞ্চগুলোর দিকে।

Leave a Comment