২০২৬ বিশ্বকাপ: ফুটবল উন্মাদনার অন্তরালে ঘনীভূত নানাবিধ বৈশ্বিক উদ্বেগ

আগামী সোমবার থেকে শুরু হচ্ছে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের এক মাসের আনুষ্ঠানিক ক্ষণগণনা বা কাউন্টডাউন। বিশ্ব ফুটবলের এই সর্ববৃহৎ আসরকে ঘিরে ক্রীড়াপ্রেমীদের মাঝে ব্যাপক উদ্দীপনা থাকলেও, এবারের আয়োজনটি ঘিরে তৈরি হয়েছে নজিরবিহীন কিছু বৈশ্বিক উদ্বেগ। টিকিটের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সামরিক সংঘাতের মতো বিষয়গুলো এই মহাযজ্ঞের ওপর আগেভাগেই নেতিবাচক ছায়া ফেলেছে। উত্তর আমেরিকার তিন দেশ—যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিতব্য এই টুর্নামেন্টে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো রেকর্ড সংখ্যক ৪৮টি দল অংশ নিচ্ছে।

সময়সূচি ও আয়োজনের ব্যাপ্তি

২০২৬ বিশ্বকাপের এই বিশাল আসরটি প্রায় ছয় সপ্তাহব্যাপী স্থায়ী হবে। টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে ১১ জুন মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক ‘এস্তাদিও আজতেকা’ স্টেডিয়ামে। দীর্ঘ লড়াই শেষে ১৯ জুলাই নিউ জার্সির ৮২,৫০০ আসনবিশিষ্ট ‘মেটলাইফ স্টেডিয়ামে’ ফাইনালের মাধ্যমে পর্দা নামবে এই আসরের। ফুটবল ইতিহাসের বৃহত্তম এই আয়োজনে সর্বমোট ১০৪টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে, যার মধ্যে সিংহভাগ অর্থাৎ ৭৮টি ম্যাচই আয়োজিত হবে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে।

টিকিটের আকাশচুম্বী মূল্য ও জনরোষ

এবারের বিশ্বকাপের টিকিটের মূল্য নির্ধারণ নিয়ে বিশ্বজুড়ে ফুটবল ভক্তদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালের সবচেয়ে দামি টিকিটের মূল্য ছিল ১,৬০০ ডলার। তবে ২০২৬ সালের আসরের জন্য ফিফা সর্বোচ্চ মূল্যের যে টিকিটটি বাজারে এনেছে, তার দাম দাঁড়িয়েছে রেকর্ড ৩২,৯৭০ মার্কিন ডলার।

ফুটবল সাপোর্টার্স ইউরোপ (এফএসই) এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিকে ‘চরম শোষণমূলক’ এবং সাধারণ ভক্তদের প্রতি ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ বলে অভিহিত করেছে। যদিও ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো এই উচ্চমূল্যকে সমর্থন করে জানিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের উন্নত বিনোদন জগতের বাজার বাস্তবতা বিবেচনা করেই দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। ফিফা এই টুর্নামেন্ট থেকে প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলার আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এখন পর্যন্ত প্রায় ৫০ কোটির বেশি টিকিটের আবেদন জমা পড়েছে, যা বিগত ২০১৮ ও ২০২২ বিশ্বকাপের সম্মিলিত আবেদনের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি। এমনকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও টিকিটের এই অস্বাভাবিক দাম দেখে বিস্ময় প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে, ব্যক্তিগতভাবে তিনিও টিকিট কিনতে এত অর্থ ব্যয় করবেন না।

ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও যুদ্ধের প্রভাব

মাঠের খেলার চেয়েও বর্তমানে বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি। গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপ বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। বিশ্বব্যাংক ইতিমধ্যে সতর্কবাণী দিয়েছে যে, মধ্যপ্রাচ্যের এই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত অনেক অঞ্চলে দুর্ভিক্ষের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে।

এই সামরিক উত্তেজনার ফলে বিশ্বকাপে ইরানের অংশগ্রহণ নিয়ে এক প্রকার অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এটিই প্রথম ঘটনা যেখানে আয়োজক দেশ টুর্নামেন্ট শুরুর ঠিক আগমুহূর্তে অন্য একটি অংশগ্রহণকারী দেশের সঙ্গে সরাসরি সামরিক দ্বন্দ্বে লিপ্ত রয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ইরান তাদের গ্রুপ পর্বের ম্যাচগুলো যুক্তরাষ্ট্র থেকে সরিয়ে মেক্সিকোতে আয়োজনের প্রস্তাব দিলেও ফিফা তা সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে। গত ৩০ এপ্রিল ভ্যাঙ্কুভারে অনুষ্ঠিত ফিফা কংগ্রেসে জিয়ান্নি ইনফান্তিনো নিশ্চিত করেছেন যে, ইরান নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রেই তাদের ম্যাচগুলো খেলবে।

ফেবারিট দল ও ফুটবলের নতুন দিগন্ত

বিতর্ক ও প্রতিকূলতা ছাপিয়ে মাঠের লড়াই নিয়ে ভক্তদের মধ্যে জল্পনা-কল্পনার শেষ নেই। বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা ও তারকা ফুটবলার লিওনেল মেসিকে এই আসরেও অন্যতম ফেবারিট হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। শিরোপার দৌড়ে তাদের শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে থাকছে ইউরো চ্যাম্পিয়ন স্পেন, ২০১৮-এর শিরোপাধারী ফ্রান্স এবং দীর্ঘ সময় পর বড় কোনো শিরোপার প্রত্যাশায় থাকা ইংল্যান্ড।

এবারের সম্প্রসারিত বিশ্বকাপের একটি বিশেষ আকর্ষণ হলো নতুন কিছু দেশের অভিষেক। বিশেষ করে জনসংখ্যার বিচারে বিশ্বের ক্ষুদ্রতম দেশ কুরাসাও এবং কেপ ভার্দে প্রথমবারের মতো বিশ্বমঞ্চে ফুটবল খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে। ফিফা প্রধান আশা প্রকাশ করেছেন যে, আগামী ১১ জুন বল মাঠে গড়ালে বিশ্বের মানুষ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সকল তিক্ততা ভুলে আবারও ফুটবলের চিরচেনা নাটকীয়তা ও আনন্দে মেতে উঠবে। তবে ক্রমবর্ধমান সামরিক ও রাজনৈতিক চাপ কতটুকু স্বাভাবিক থাকবে, তা নিয়ে বৈশ্বিক বিশ্লেষকদের মধ্যে গভীর সংশয় রয়েই গেছে।

Leave a Comment