
কিরগিজ ক্লাবকে হারিয়ে এএফসি চ্যালেঞ্জ লিগের গ্রুপ পর্বে ফর্টিস এফসি
ঘরের মাঠে কৌশলগত ফুটবল ও দুর্দান্ত লড়াকু মানসিকতার পরিচয় দিয়ে এএফসি চ্যালেঞ্জ লিগের প্রাথমিক বাধা সফলভাবে পার করেছে বাংলাদেশের ফর্টিস এফসি। ঢাকার বসুন্ধরা কিংস অ্যারেনায় অনুষ্ঠিত প্রিলিমিনারি প্লে-অফ ম্যাচে কিরগিজস্তানের শক্তিশালী লিগ রানার্সআপ মুরাস ইউনাইটেডকে ১-০ গোলে হারিয়ে ঐতিহাসিক জয় তুলে নিয়েছে দলটি। এই জয়ের সুবাদে সরাসরি এএফসি চ্যালেঞ্জ লিগের মূল পর্বে জায়গা করে নিয়েছে ফর্টিস।
গত বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে তৃতীয় স্থান অর্জন করা করপোরেট ক্লাব ফর্টিস এফসি প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক কোনো প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পায়। এই মহাদেশীয় আসরকে সামনে রেখে নিজেদের স্কোয়াডকে বেশ গোছালো ও শক্তিশালী করে তোলে ক্লাবটি। একাদশে মাত্র তিনজন স্থানীয় ফুটবলার এবং আটজন ভিনদেশি খেলোয়াড়ের এক দারুণ সংমিশ্রণ ঘটিয়ে কোচ মাসুদ কায়সার ভারসাম্যপূর্ণ কৌশল সাজিয়েছিলেন।
দলের গোলপোস্টের দায়িত্বে ছিলেন শ্রীলঙ্কার অভিজ্ঞ গোলকিপার সুজন পেরেইরা। এছাড়া নেপালের মিডফিল্ডার আরিক বিস্তা, গাম্বিয়ান ফরোয়ার্ড পা ওমর বাবু, ঐতিহ্যবাহী আবাহনী লিমিটেড থেকে ধারে আসা দুই ফরোয়ার্ড ইব্রাহিম ও ইনসান এবং রক্ষণভাগে দুই জাপানি ফুটবলার শিহান ও শিমোমুরাকে নিয়ে গড়া একাদশ শুরু থেকেই মাঠে দাপট দেখায়। অন্যদিকে প্রতিপক্ষ মুরাস ইউনাইটেড ছিল শীতপ্রধান দেশের দল। ফলে ঢাকার দুপুরের তীব্র আর্দ্র গরম ওড়া রোদের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে গিয়ে শুরু থেকেই বেশ ধুঁকতে হয়েছে কিরগিজ ক্লাবটিকে। শারীরিকভাবে দীর্ঘদেহী ও শক্তিশালী খেলোয়াড়দের নিয়ে গড়া দলটিতে ইউক্রেনের তিনজন, ঘানার একজন এবং বেলারুশের একজন বিদেশি ফুটবলার খেললেও আবহাওয়ার প্রতিকূলতা তাদের খেলায় বড় প্রভাব ফেলেছিল।
ম্যাচের শুরু থেকেই দুই দল রক্ষণভাগ সুরক্ষিত রেখে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে খেলতে থাকে। মাঝমাঠে বল দখলের লড়াই জমে উঠলেও প্রথমার্ধে ফর্টিসই তুলনামূলক বেশি আক্রমণ শানিয়ে গোলের সুযোগ তৈরি করে। এ সময় গাম্বিয়ান ফরোয়ার্ড ও অধিনায়ক পা ওমর বাবুর দুর্দান্ত একটি শট প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারের পায়ে লেগে গোলপোস্টের বারে প্রতিহত হলে কপাল পোড়ে স্বাগতিকদের। এর ঠিক পরপরই ৩৭ মিনিটে মুরাস ইউনাইটেডের সেরা তারকা ও ১০ নম্বর জার্সিধারী মিডফিল্ডার জাপারভ আমির গুরুতর চোট পেয়ে মাঠ ছাড়লে সফরকারীরা বড় ধরনের ধাক্কা খায়। প্রথমার্ধের শেষদিকে ফর্টিসের লঙ্কান গোলকিপার সুজন পেরেইরাও কিরগিজ মিডফিল্ডার আতাবায়েভের একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক শট দারুণ দক্ষতায় প্রতিহত করে দলকে নিরাপদে রাখেন।
ম্যাচের মূল রোমাঞ্চ ও টার্নিং পয়েন্টটি আসে দ্বিতীয় অর্ষের শুরুতেই। ম্যাচের ৫২ মিনিটে ফর্টিস শিবিরের কাঙ্ক্ষিত গোলের দেখা মিললে পুরো গ্যালারিতে আনন্দের জোয়ার বয়ে যায়। মাঝমাঠের একটু সামনে থেকে চমৎকার একক প্রচেষ্টায় বল নিয়ে ড্রিবল করে প্রতিপক্ষের পেনাল্টি বক্সে ঢুকে পড়েন ফরোয়ার্ড পা ওমর বাবু। এরপর তিনি নিখুঁত পাস বাড়ান ইব্রাহিমের উদ্দেশ্যে। বক্সের ঠিক মাথা থেকে জোরালো ও নিচু শটে বল সোজা জালে জড়িয়ে দেন আবাহনী থেকে ধারে খেলতে আসা ফরোয়ার্ড ইব্রাহিম। স্টেডিয়ামের গ্যালারি তখন ফর্টিসের আনন্দে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে।
এক গোলে পিছিয়ে পড়ে মরিয়া হয়ে অলআউট আক্রমণে চলে যায় মুরাস ইউনাইটেড। সমতা ফেরাতে তারা একের পর এক আক্রমণ চালাতে থাকলে ফর্টিসের রক্ষণভাগ ও গোলকিপার সুজনকে বেশ চাপে পড়তে হয়। ম্যাচের ৭৪ মিনিটে ম্যাচের ভাগ্য বদলে দেওয়ার মতো এক নাটকীয় মুহূর্ত তৈরি হয়। কিরগিজদের একটি আক্রমণ প্রতিহত করার সময় ফর্টিসের বক্সের ভেতরে নেপালী মিডফিল্ডার আরিক বিস্তার হাতে বল লাগলে বাহরাইনের রেফারি মুহূর্তের মধ্যে পেনাল্টির বাঁশি বাজান। তবে ভাগ্য সেদিন ফর্টিসের পক্ষেই ছিল। মুরাসের মিডফিল্ডার শিমোমুরার স্পট কিক থেকে নেওয়া জোরালো শট গোলপোস্টের সাইড পোস্টে লেগে ফিরে আসে, ফলে নিশ্চিত পতন থেকে বেঁচে যায় স্বাগতিকরা।
ম্যাচটি দেখতে মাঠে দুই হাজার একশ তেরো জন দর্শক উপস্থিত থাকলেও গ্যালারির উন্মাদনা ছিল চোখে পড়ার মতো। ঢাক-ঢোল পিটিয়ে ও নানা স্লোগানে সমর্থকরা পুরো ম্যাচজুড়ে ফর্টিসের খেলোয়াড়দের উজ্জীবিত করে রাখেন। উল্লেখ্য, ঠিক এক বছর আগে এই আগস্ট মাসেই ঢাকার মাটিতে কিরগিজ ক্লাবের কাছে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিয়েছিল ঐতিহ্যবাহী আবাহনী লিমিটেড। সেই ক্ষতে প্রলেপ দিয়ে ফর্টিসের এই জয় দেশের ফুটবল অঙ্গনে এক নতুন আশার সঞ্চার করেছে। আগামী মাসের তৃতীয় কুয়ালালামপুরে অনুষ্ঠিত হবে ২০২৬-২৭ মৌসুমের এএফসি চ্যালেঞ্জ লিগের গ্রুপ পর্বের অফিশিয়াল ড্র। এদিকে একই প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে জর্ডানের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছে বাংলাদেশের আরেক ক্লাব পুলিশ এফসি।