
তিন মহাদেশের ফুটবল কর্তাদের বিকল্প টুর্নামেন্টের ভাবনা
ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর একটি বিতর্কিত উদ্যোগকে ঘিরে বিশ্ব ফুটবলে তৈরি হওয়া উত্তেজনা আরও জটিল রূপ নিচ্ছে। ফিফার প্রতিযোগিতাগুলোর বাণিজ্যিক স্বত্ব বা শেয়ার বিক্রির পরিকল্পনা নিয়ে সংস্থাটির অভ্যন্তরে যে বিরোধ শুরু হয়েছে, এবার তা বিকল্প ফুটবল টুর্নামেন্ট আয়োজনের চিন্তা পর্যন্ত গড়িয়েছে।
ইনফান্তিনোর নেতৃত্বের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে তাঁরই তিন সহসভাপতি—উয়েফা সভাপতি আলেকসান্দার সেফেরিন, এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের সভাপতি সালমান বিন ইব্রাহিম আল খলিফা এবং উত্তর ও মধ্য আমেরিকা ও ক্যারিবীয় ফুটবল কনফেডারেশনের সভাপতি ভিক্টর মন্তালিয়ানি—যৌথভাবে একটি চিঠি দিয়েছেন। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমেে এক প্রতিবেদনে বিষয়টি উঠে এসেছে।
চিঠিতে তিন ফুটবলপ্রধান ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে ‘প্রতারণার মাধ্যমে’ বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগ তুলেছেন। একই সঙ্গে বাতিল হয়ে যাওয়া শেয়ার বিক্রির প্রক্রিয়া নিয়ে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
বিরোধের সূত্রপাত ফিফার প্রতিযোগিতাগুলোর বাণিজ্যিক কাঠামো নিয়ে পরিকল্পনা প্রকাশের পর। বিশেষ করে বিশ্বকাপের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতার শেয়ার বিক্রির উদ্যোগ নিয়ে ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা কঠোর অবস্থান নেয়। ফিফার পরিকল্পনা প্রকাশের পর উয়েফার ৫৫টি সদস্য সংস্থা জরুরি বৈঠকে বসে। সেখানে সর্বসম্মতভাবে বিশ্বকাপসহ ফিফার বিভিন্ন প্রতিযোগিতা বর্জনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তীব্র বিরোধিতার মুখে ফিফা পরে শেয়ার বিক্রির পরিকল্পনা বাতিল করে। ইনফান্তিনোও এ নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করেন। কিন্তু তাতে উয়েফার অবস্থান বদলায়নি। বরং এএফসি এবং কনক্যাকাফও ইউরোপীয় সংস্থাটির অবস্থানের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে।
এখন সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো, বিশ্বকাপ বর্জনের হুমকি বাস্তবে রূপ নিলে তার বিকল্প কী হতে পারে। তিন মহাদেশের ফুটবল কর্তারা সম্ভাব্য বিকল্প প্রতিযোগিতা আয়োজনের বিষয়টি প্রাথমিকভাবে আলোচনা করছেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এমন উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে জাতীয় দলের ফুটবলারদের জন্য বিশ্বকাপের বাইরে বড় পরিসরের একটি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা আয়োজনের প্রয়োজন হতে পারে। তবে সম্ভাব্য টুর্নামেন্টের দল নির্বাচন, কাঠামো, সময়সূচি কিংবা পরিচালনব্যবস্থা নিয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
এই বিরোধের রাজনৈতিক দিকটিও গুরুত্বপূর্ণ। ফিফার ২১১টি সদস্যদেশের প্রত্যেকটির একটি করে ভোট রয়েছে। সভাপতি নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্য প্রয়োজন অন্তত ১০৬ ভোট। উয়েফার সদস্যসংখ্যা ৫৫ হলেও এএফসি ও কনক্যাকাফের সঙ্গে মিলে চিঠিতে স্বাক্ষরকারী তিন কনফেডারেশনের মোট সদস্যদেশের সংখ্যা ১৪৩। ফলে এই তিন অঞ্চলের সমন্বিত অবস্থান ফিফা সভাপতির নির্বাচনে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
আগামী মার্চে মরক্কোয় ফিফা কংগ্রেসে সভাপতি নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। ইনফান্তিনো সেখানে পুনর্নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সভাপতি পদে আগ্রহীদের মনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষ সময় ১৮ নভেম্বর। ফলে নির্বাচনের আগে কনফেডারেশনগুলোর অবস্থান, জোট এবং সমর্থনের হিসাব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
তবে ইনফান্তিনোও একেবারে একা নন। মরক্কোয় সাম্প্রতিক এক বৈঠকে ফিফার কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা তাঁর নেতৃত্বের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবল কনফেডারেশন কনমেবল এবং আফ্রিকান ফুটবল কনফেডারেশনও তাঁর পক্ষে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ব্যক্তিগত পর্যায়েও আর্জেন্টিনা, মেক্সিকো, প্যারাগুয়ে, কাতার ও কুয়েত তাঁর প্রতি সমর্থনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
ফলে ফিফার অভ্যন্তরীণ এই বিরোধ এখন শুধু একটি বাণিজ্যিক পরিকল্পনা বাতিলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এটি সংস্থাটির নেতৃত্ব, কনফেডারেশনগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক এবং আগামী সভাপতি নির্বাচনের সমীকরণেও প্রভাব ফেলতে পারে। আর বিশ্বকাপ বর্জনের হুমকি বাস্তবে পরিণত হলে বিকল্প আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের ধারণা বিশ্ব ফুটবলের জন্য নতুন এক নজির তৈরি করতে পারে।