
হাজার ম্যাচের ক্লাবে দি মারিয়া, আগে ছিলেন দুই আর্জেন্টাইন
আর্জেন্টাইন ফুটবলের ইতিহাসে আরও একটি অনন্য মাইলফলক স্পর্শ করেছেন আনহেল দি মারিয়া। পেশাদার ফুটবল ক্যারিয়ারে এক হাজার ম্যাচ খেলার কীর্তি গড়েছেন বিশ্বকাপজয়ী এই তারকা। শৈশবের ক্লাব রোজারিও সেন্ট্রালের হয়ে মাঠে নেমেই এই বিরল অর্জনের মালিক হন তিনি। আর্জেন্টিনার ফুটবলে এর আগে কেবল লিওনেল মেসি ও হাভিয়ের জানেত্তি এই মাইলফলক ছুঁয়েছিলেন।
২০২৪ সালের কোপা আমেরিকা জয়ের পর আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের জার্সি তুলে রাখেন দি মারিয়া। এরপর নিজের পেশাদার ফুটবলের শুরুর ঠিকানায় ফিরে যান তিনি। রোজারিও সেন্ট্রালের হয়ে খেলতে খেলতেই ৩৮ বছর বয়সী এই উইঙ্গার এখন ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়ের স্বাদ নিচ্ছেন। তবে বয়স তাঁর পথচলায় বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। বরং দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময়ের ক্যারিয়ারে ধারাবাহিকতা ধরে রেখে তিনি পৌঁছে গেছেন এমন এক জায়গায়, যেখানে ফুটবলারদের সংখ্যা হাতে গোনা।
গত ১৩ আগস্ট রোজারিও সেন্ট্রালের হয়ে কোপা লিবার্তাদোরেসের শেষ ষোলোর প্রথম লেগে মাঠে নামেন দি মারিয়া। সেই ম্যাচটিই ছিল তাঁর পেশাদার ক্যারিয়ারের এক হাজারতম উপস্থিতি। পরবর্তী সময়ে আর্জেন্টিনার শীর্ষ লিগে তাল্লেরাসের বিপক্ষে আরও একটি ম্যাচ খেলেছেন তিনি। ফলে তাঁর মোট ম্যাচসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২টি।
তবে ফুটবলের পরিসংখ্যান সংরক্ষণকারী আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান আরএসএসএসএফের হিসাবে তাঁর ম্যাচসংখ্যা ১ হাজার ১টি। এর কারণ, তাল্লেরাসের বিপক্ষে সর্বশেষ ম্যাচটি ওই পরিসংখ্যানভান্ডারে তখনও যুক্ত হয়নি। সংস্থাটির তথ্য কোপা লিবার্তাদোরেসের শেষ ষোলোর ফিরতি লেগ পর্যন্ত হালনাগাদ করা হয়েছিল।
এক হাজার ম্যাচের মাইলফলক কতটা বিরল, সেটিও ফুটবলের পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়। আরএসএসএসএফের হিসাব অনুযায়ী, শীর্ষ পর্যায়ের ম্যাচের পাশাপাশি আঞ্চলিক ও অপেশাদার লিগ, বয়সভিত্তিক দল এবং বাতিল হয়ে যাওয়া ম্যাচসহ বিভিন্ন ধরনের খেলা ধরলে বিশ্বে অন্তত এক হাজার ম্যাচ খেলা ফুটবলারের সংখ্যা ৮২। কিন্তু কেবল শীর্ষ পর্যায়ের লিগ, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক কাপ প্রতিযোগিতা, আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট এবং অনূর্ধ্ব-২৩ দলের ম্যাচ বিবেচনায় নিলে সংখ্যাটি নেমে আসে ৩২-এ।
সেই ছোট তালিকাতেই এখন জায়গা করে নিয়েছেন দি মারিয়া। উইকিপিডিয়ার হিসাবেও এক হাজার ম্যাচের মাইলফলক স্পর্শ করা ফুটবলারদের তালিকায় তাঁর নাম রয়েছে।
আর্জেন্টিনার ফুটবলে অবশ্য দি মারিয়ার আগে আরও দুজন এই কৃতিত্ব অর্জন করেছেন। প্রথমজন তাঁরই দীর্ঘদিনের জাতীয় দলের সতীর্থ লিওনেল মেসি। আরেকজন আর্জেন্টিনার সাবেক তারকা রক্ষণভাগের খেলোয়াড় হাভিয়ের জানেত্তি।
আরএসএসএসএফের হিসাবে মেসি শীর্ষ পর্যায়ের ফুটবলে ১ হাজার ১৬৮টি ম্যাচ খেলেছেন। আর্জেন্টিনার সংবাদমাধ্যম ‘এল গ্রাফিকো’র হিসাবে তাঁর ম্যাচসংখ্যা ১ হাজার ১৭০। অন্যদিকে ইন্টার মিলানের কিংবদন্তি জানেত্তি আরএসএসএসএফের হিসাবে শীর্ষ পর্যায়ে ১ হাজার ৮১ ম্যাচ খেলেছেন। ‘এল গ্রাফিকো’র হিসাবে তাঁর সংখ্যা আরও বেশি—১ হাজার ৯৯।
দি মারিয়ার দীর্ঘ ক্যারিয়ারের শুরু অবশ্য হয়েছিল রোজারিও সেন্ট্রালেই। ২০০৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর আর্জেন্টিনার শীর্ষ লিগে এই ক্লাবের হয়ে তাঁর অভিষেক হয়। এরপর খুব দ্রুতই ইউরোপের ফুটবলে নিজের জায়গা তৈরি করেন তিনি। পর্তুগালের বেনফিকা থেকে শুরু করে স্পেনের রিয়াল মাদ্রিদ, ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, ফ্রান্সের প্যারিস সাঁ-জার্মাঁ এবং ইতালির জুভেন্টাস—ইউরোপের একাধিক বড় ক্লাবে খেলেছেন তিনি।
ক্লাব ফুটবলে তাঁর সাফল্যের তালিকাও দীর্ঘ। পর্তুগাল, স্পেন ও ফ্রান্সে লিগ শিরোপা জিতেছেন। রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগও জিতেছেন। ইউরোপের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা তাঁকে আন্তর্জাতিক ফুটবলেও গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হিসেবে গড়ে তুলেছিল।
আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়েও দি মারিয়ার অবদান আলাদা করে উল্লেখ করার মতো। জাতীয় দলের হয়ে তাঁর ম্যাচসংখ্যা ১৪৫। লিওনেল স্কালোনির অধীনে আর্জেন্টিনার সোনালি সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন তিনি।
২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে আর্জেন্টিনা দুটি কোপা আমেরিকা, একটি বিশ্বকাপ এবং একটি ফিনালিসিমা জেতে। এই চারটি শিরোপা জয়ের পথেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল দি মারিয়ার। ২০২১ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালে ব্রাজিলের বিপক্ষে তাঁর গোলেই আর্জেন্টিনা শিরোপা নিশ্চিত করেছিল। পরের বছর কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালেও ফ্রান্সের বিপক্ষে গোল করেন তিনি।
জাতীয় দলের হয়ে ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকা জয়ের পর আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন দি মারিয়া। সেই বিদায়ের পর তিনি আবার ফিরে আসেন নিজের শৈশবের ক্লাব রোজারিও সেন্ট্রালে। ফলে যে ক্লাব দিয়ে তাঁর পেশাদার পথচলা শুরু হয়েছিল, সেই ক্লাবেই এখন এক হাজার ম্যাচের বিরল মাইলফলক পূর্ণ করলেন তিনি।
ক্যারিয়ারের পরিসংখ্যানও তাঁর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবের সাক্ষ্য দেয়। এখন পর্যন্ত ১ হাজার ২ ম্যাচে দি মারিয়া করেছেন ২৪৩ গোল এবং সতীর্থদের দিয়ে করিয়েছেন ২৮৪ গোল। পুরো ক্যারিয়ারে লাল কার্ড দেখেছেন ১০ বার।
এক হাজার ম্যাচে পৌঁছানো শুধু দীর্ঘদিন খেলতে পারার স্বীকৃতি নয়। এত বছরের ক্যারিয়ারে বিভিন্ন ক্লাব, দেশ, প্রতিযোগিতা ও প্রজন্মের সতীর্থদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শীর্ষ পর্যায়ে টিকে থাকাও এর সঙ্গে জড়িত। মেসি ও জানেত্তির পর সেই বিরল তালিকায় নিজের নাম লিখিয়ে দি মারিয়া তাই আর্জেন্টাইন ফুটবলের আরও একটি বিশেষ অধ্যায়ের অংশ হয়ে গেলেন।:::