
পেলে-ম্যারাডোনা কেন কখনো জেতেননি ব্যালন ডি’অর?
বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে সর্বকালের সেরা খেলোয়াড়দের আলোচনায় ব্রাজিলের পেলে ও আর্জেন্টিনার দিয়েগো ম্যারাডোনার নাম অবধারিতভাবেই উঠে আসে। একজন তিনবার বিশ্বকাপ জিতে ফুটবল ইতিহাসে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছেন, অন্যজন ১৯৮৬ বিশ্বকাপে অসাধারণ নৈপুণ্যে আর্জেন্টিনাকে শিরোপা জিতিয়েছেন। অথচ ব্যক্তিগত সাফল্য, অসামান্য প্রতিভা ও বিশ্বজোড়া জনপ্রিয়তা থাকা সত্ত্বেও তাঁদের কারও নামের পাশে নেই ব্যালন ডি’অর জয়ের কৃতিত্ব। এর কারণ অবশ্য তাঁদের ফুটবলীয় সামর্থ্যের অভাব নয়। পুরস্কারটির তৎকালীন যোগ্যতা নির্ধারণের নিয়মই তাঁদের এই স্বীকৃতি থেকে দূরে রেখেছিল।
১৯৫৬ সালে ফরাসি সাময়িকী ফ্রান্স ফুটবল ব্যালন ডি’অর পুরস্কার চালু করে। শুরুতে এর জন্য কেবল ইউরোপীয় ফুটবলারদের বিবেচনা করা হতো। ফলে ব্রাজিলে জন্ম নেওয়া পেলে কিংবা আর্জেন্টিনার ম্যারাডোনা নিজেদের ক্যারিয়ারের সেরা সময়ে এই পুরস্কারের জন্য যোগ্য ছিলেন না। তাঁরা ইউরোপের ক্লাবে খেললেও ইউরোপের বাইরের দেশের নাগরিক হওয়ায় পুরস্কারটির মূল নিয়মের আওতায় পড়তেন না।
১৯৯৫ সালে বদলে যায় যোগ্যতার নিয়ম
ব্যালন ডি’অরের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে ১৯৯৫ সালে। ওই বছর থেকে ইউরোপের ক্লাবে খেলা যেকোনো দেশের ফুটবলারকে পুরস্কারের জন্য বিবেচনা করার সুযোগ দেওয়া হয়। এর ফলে ইউরোপের বাইরের দেশ থেকে আসা খেলোয়াড়দের জন্যও পুরস্কারটি জয়ের পথ খুলে যায়।
সেই বছর লাইবেরিয়ার স্ট্রাইকার জর্জ উইয়াহ প্রথম অ-ইউরোপীয় খেলোয়াড় হিসেবে ব্যালন ডি’অর জেতেন। তখন তিনি ইতালির ক্লাব এসি মিলানে খেলছিলেন। তাঁর এই অর্জন পুরস্কারটির ইতিহাসে নতুন অধ্যায় তৈরি করে। পরবর্তী সময়ে ব্রাজিলের রোনালদো নাজারিও, রিভালদো, রোনালদিনিও ও কাকা ব্যালন ডি’অর জিতে প্রমাণ করেন, ইউরোপের বাইরের দেশ থেকে উঠে এসেও বিশ্বের সেরা ফুটবলার হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া সম্ভব।
তবে ১৯৯৫ সালের পরিবর্তনেও বিশ্বের সব ফুটবলারের জন্য পুরস্কারটির দরজা পুরোপুরি উন্মুক্ত হয়নি। তখনো ইউরোপের ক্লাবে খেলার শর্ত বহাল ছিল। ফলে ইউরোপের বাইরে অন্য মহাদেশের ক্লাবে খেলা ফুটবলাররা এই পুরস্কারের জন্য যোগ্য ছিলেন না।
২০০৭ সালে বিশ্বজুড়ে উন্মুক্ত হয় পুরস্কারটি
২০০৭ সালে ব্যালন ডি’অরের নিয়মে আরও বড় পরিবর্তন আনা হয়। তখন থেকে বিশ্বের যেকোনো দেশের ফুটবলারকে, তিনি যে দেশের ক্লাবেই খেলুন না কেন, পুরস্কারের জন্য বিবেচনা করার সুযোগ তৈরি হয়। এর মধ্য দিয়ে প্রতিযোগিতাটি ভৌগোলিক ও ক্লাবভিত্তিক সীমাবদ্ধতা থেকে আরও বেশি মুক্ত হয়।
এই পরিবর্তনের প্রভাব দেখা যায় পরবর্তী সময়ের ফুটবল ইতিহাসে। আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসি ব্যালন ডি’অরের অন্যতম সফল খেলোয়াড় হয়ে ওঠেন। ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টার মিয়ামিতে খেলার সময়ও তিনি পুরস্কারটি জেতেন। যদিও সেই বছরের পুরস্কার নির্ধারণে বিবেচিত হয়েছিল আগের মৌসুমের পারফরম্যান্স, যার মধ্যে ছিল ২০২২ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার শিরোপা জয়। ফলে মেসির এই অর্জন ব্যালন ডি’অরের বৈশ্বিক যোগ্যতার পরিধি বোঝানোর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
পেলের ক্ষেত্রে সময়ের ব্যবধানই ছিল বড় বাধা
পেলের ফুটবল ক্যারিয়ারের সিংহভাগ কেটেছে ব্রাজিলের ক্লাব সান্তোসে। ব্রাজিলের হয়ে ১৯৫৮, ১৯৬২ ও ১৯৭০ সালে বিশ্বকাপ জিতে তিনি আন্তর্জাতিক ফুটবলে বিরল কৃতিত্ব অর্জন করেন। কিন্তু তাঁর সেরা সময়েও ব্যালন ডি’অরের নিয়ম ছিল ইউরোপীয় খেলোয়াড়দের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
ক্যারিয়ারের শেষ পর্যায়ে পেলে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক কসমসে যোগ দেন এবং ১৯৭৭ সালে পেশাদার ফুটবল থেকে অবসর নেন। অথচ তাঁর অবসরের অনেক পরে, ১৯৯৫ সালে, ইউরোপের ক্লাবে খেলা অ-ইউরোপীয় ফুটবলারদের জন্য পুরস্কারটির যোগ্যতা সম্প্রসারিত হয়। ফলে নিয়ম পরিবর্তনের পরও পেলের নিজের ক্যারিয়ারে ব্যালন ডি’অর জয়ের সুযোগ আর তৈরি হয়নি।
ম্যারাডোনার ক্ষেত্রেও বাধা ছিল একই নিয়ম
ম্যারাডোনা ইউরোপের একাধিক বড় ক্লাবে খেলেছেন। স্পেনের বার্সেলোনা, ইতালির নাপোলি এবং পরবর্তী সময়ে সেভিয়ার হয়ে তাঁর খেলার অভিজ্ঞতা ছিল। বিশেষ করে নাপোলিতে থাকাকালে তিনি ক্লাবটিকে ইতালীয় ফুটবলের শীর্ষ পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৯৮৬ বিশ্বকাপে তাঁর নেতৃত্ব ও অসাধারণ পারফরম্যান্স তাঁকে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত খেলোয়াড়ে পরিণত করে।
তবে ইউরোপের ক্লাবে খেলার পরও ম্যারাডোনা ব্যালন ডি’অরের জন্য যোগ্য ছিলেন না, কারণ তখনো পুরস্কারটি ইউরোপীয় ফুটবলারদের জন্য সংরক্ষিত ছিল। ১৯৯১ সালে মাদক পরীক্ষায় কোকেন ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়ার পর তিনি ১৫ মাসের নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েন। পরে ইউরোপের ক্লাব ফুটবল ছেড়ে ১৯৯৩ সালে আর্জেন্টিনায় ফিরে যান। কিন্তু তাঁর ক্ষেত্রে মূল বাধাটি ছিল পুরস্কারের যোগ্যতা নির্ধারণের নিয়ম; নিষেধাজ্ঞা ও ক্যারিয়ারের অন্যান্য ঘটনা এই নিয়মগত সীমাবদ্ধতার বিকল্প ব্যাখ্যা নয়।
কৃতিত্বের স্বীকৃতি এসেছিল অনেক পরে
পেলে ও ম্যারাডোনার মতো কিংবদন্তিদের ব্যালন ডি’অর না জেতার বিষয়টি ফুটবলপ্রেমীদের কাছে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে তাঁদের অবদান মূল্যায়নের ক্ষেত্রে মনে রাখা জরুরি, পুরস্কারটির পুরোনো নিয়ম তাঁদের যোগ্যতার বাইরে রেখেছিল। পরবর্তী সময়ে ফ্রান্স ফুটবল অতীতের এই সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে ২০১৬ সালে একটি পুনর্মূল্যায়ন প্রকাশ করে। সেখানে বিকল্প যোগ্যতার নিয়ম প্রয়োগ করা হলে অতীতের বিভিন্ন আসরে কারা পুরস্কার জিততে পারতেন, তা বিশ্লেষণ করা হয়। সেই পুনর্মূল্যায়নে পেলে একাধিকবার ব্যালন ডি’অর জিততে পারতেন বলে উঠে আসে।
তবে এই পুনর্মূল্যায়ন আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁদের মূল ক্যারিয়ারে ব্যালন ডি’অর জয়ের রেকর্ড তৈরি করেনি। এটি ছিল পুরোনো নিয়মের সীমাবদ্ধতা বোঝানোর একটি ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ।
সব মিলিয়ে, পেলে ও ম্যারাডোনার ব্যালন ডি’অর না জেতার পেছনে প্রধান কারণ ছিল পুরস্কারটির তৎকালীন যোগ্যতার শর্ত। তাঁদের ফুটবলীয় দক্ষতা, বিশ্বকাপের সাফল্য কিংবা ক্লাব পর্যায়ের অবদান নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই। নিয়ম যদি তাঁদের খেলার সময় বর্তমানের মতো বিস্তৃত থাকত, তাহলে এই দুই কিংবদন্তির নামও ব্যালন ডি’অরের বিজয়ীদের তালিকায় থাকতে পারত।