
আর্জেন্টিনাকে কাঁদিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন স্পেন
বিশ্বকাপ ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্বের মুকুটের লড়াইয়ে রোমাঞ্চকর এক ফাইনালের সাক্ষী হলো নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়াম। মাঠের লড়াইয়ে প্রতিপক্ষের একের পর এক আক্রমণে কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল আর্জেন্টিনা। কিন্তু রক্ষণভাগের বীরত্বে কোনোমতে ম্যাচটিকে অতিরিক্ত সময়ে টেনে নিয়ে যায় তারা। তবে শেষ রক্ষা হয়নি। নির্ধারিত সময়ের শেষ মুহূর্তে ১০ জনের দলে পরিণত হওয়া আলবিসেলেস্তেদের ওপর চাপ আরও বাড়িয়ে দেয় লুইস দে লা ফুয়েন্তের শিষ্যরা। অতিরিক্ত সময়ে বদলি খেলোয়াড় ফেররান তরেসের এক জাদুকরী গোলে আর্জেন্টিনাকে ১-০ ব্যবধানে হারিয়ে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের শিরোপা নিজেদের করে নিল স্পেন।
ম্যাচের এই ১-০ স্কোরলাইন দেখে মাঠের আসল উত্তাপ পুরোপুরি বোঝার উপায় নেই। ১২০ মিনিটের লড়াইয়ের সিংহভাগ সময়ই আর্জেন্টিনার ফরোয়ার্ডরা স্পেনের রক্ষণভাগের কোনো পরীক্ষাই নিতে পারেননি। বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা তারকা লিওনেল মেসিকে কীভাবে বোতলবন্দি করে রাখতে হয়, তার এক অনন্য কৌশল দেখালেন স্প্যানিশ ডিফেন্ডাররা। লুইস দে লা ফুয়েন্তের নিখুঁত ছক মাঠে পুরোপুরি বাস্তবায়ন করেন রদ্রি ও দানি ওলমোরা। ফলে রেকর্ড আটবারের ব্যালন ডি’অর জয়ী মেসি পুরো ম্যাচে তার স্বভাবসুলভ কোনো আক্রমণ শাণাতে পারেননি।
Table of Contents
পরিসংখ্যানে স্পেনের একচ্ছত্র আধিপত্য
ম্যাচের বাকি পরিসংখ্যানগুলোর দিকে তাকালে স্পেনের একক দাপট আর আর্জেন্টিনার নাজেহাল অবস্থার চিত্রটি পরিষ্কার হয়ে যায়। পুরো ম্যাচের প্রায় ৬৫ শতাংশ সময় বল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল ২০১০ সালের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা। তারা গোলের উদ্দেশ্যে ২০টি শট নেয়, যার মধ্যে ১২টিই ছিল অন-টার্গেট। বিপরীতে পুরো ম্যাচে আর্জেন্টিনা মাত্র দুটি শট নিতে পেরেছিল, যার একটিও স্পেনের গোলপোস্টের ভেতরে ছিল না।
এই জয়ের মাধ্যমে ফুটবল ইতিহাসে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ ট্রফি ঘরে তুলল স্পেন। এর আগে ২০১০ সালে নেদারল্যান্ডসকে ১-০ গোলে হারিয়ে প্রথমবার বিশ্বজয়ের স্বাদ পেয়েছিল তারা। এবারের আসরে স্প্যানিশদের রক্ষণভাগ ছিল দুর্ভেদ্য। পুরো টুর্নামেন্টে তারা মাত্র একটি গোল হজম করেছে, যা বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে কম গোল খেয়ে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার এক অনন্য রেকর্ড।
প্রথমার্ধের নাটকীয়তা ও আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণ
খেলার প্রথম পাঁচ মিনিটেই আর্জেন্টিনার ডিফেন্সে দুবার কম্পন ধরায় স্পেন। দানি ওলমোর পাস থেকে লামিন ইয়ামালের নেওয়া কোনাকুনি শট দুর্দান্তভাবে রুখে দেন আর্জেন্টাইন প্রাচীর এমিলিয়ানো মার্তিনেস। এর দুই মিনিট পরই পাল্টা আক্রমণে ওঠে আর্জেন্টিনা। মাঝমাঠ থেকে উড়ে আসা বল প্রায় পেয়েই যাচ্ছিলেন মেসি, তবে স্প্যানিশ গোলরক্ষক উনাই সিমোন ডি-বক্সের বাইরে এসে বল ক্লিয়ার করেন।
প্রথম হাইড্রেশন ব্রেকের পর স্পেনের পাউ কুবার্সির এক দুর্বল ব্যাকপাসের সুযোগ নিয়েছিলেন মেসি। কিন্তু এবারও সিমন দ্রুত এগিয়ে এসে বিপদ মুক্ত করেন। ৩৯ মিনিটে স্পেনের মিকেল ওইয়ারসাবাল গোল করার একটি সহজ সুযোগ নষ্ট করেন। বিরতির ঠিক আগে ওইয়ারসাবালকে ফাউল করে হলুদ কার্ড দেখেন আর্জেন্টিনার লিসান্দ্রো মার্তিনেস, যাকে দুই মিনিট পরেই মাঠ থেকে তুলে নেন কোচ স্কালোনি।
উত্তেজনা, লাল কার্ড ও ফেররান তরেসের সেই মহাকাব্যিক গোল
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে মাঠের খেলায় চরম উত্তেজনা ছড়ায়। বদলি নামা আর্জেন্টিনার লেয়ান্দ্রো পারেদেস মাঝমাঠে রদ্রিকে অহেতুক ধাক্কা দিলে দুই দলের খেলোয়াড়রা বিতণ্ডায় জড়ান। সেই জটলার মধ্যেই দানি ওলমোকে ধাক্কা মেরে হলুদ কার্ড দেখেন পারেদেস। নির্ধারিত সময়ের ২৮ মিনিট বাকি থাকতে স্প্যানিশ কোচ মাঠে নামান ফেররান তরেস ও পেদ্রিকে। ম্যাচের যোগ করা সময়ে বড় ধাক্কা খায় আর্জেন্টিনা, যখন পাউ কুবার্সিকে ফাউল করে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড অর্থাৎ লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন এন্সো ফের্নান্দেস। ১০ জনের দল নিয়ে অতিরিক্ত সময়ে খেলতে গিয়ে আরও রক্ষণাত্মক হয়ে পড়ে স্কালোনির দল।
অবশেষে ১০৬তম মিনিটে ডেডলক ভাঙে স্পেন। পেদ্রো পররোর দূরপাল্লার ক্রস আটকাতে মার্তিনেস পজিশন ছেড়ে বেরিয়ে এলে হেডে কাটব্যাক করেন নিকো উইলিয়ামস। চলন্ত বলে অসাধারণ এক জিরো-ডিগ্রি শটে বল জালে জড়ান বার্সেলোনা ফরোয়ার্ড ফেররান তরেস। গ্যালারিতে তখন স্প্যানিশ সমর্থকদের উল্লাসের জোয়ার।
মেসির শেষ চেষ্টা ও বিষাদময় সমাপ্তি
১-০ গোলে পিছিয়ে পড়ে গোল শোধে মরিয়া হয়ে ওঠে কোণঠাসা আর্জেন্টিনা। ১১৫তম মিনিটে মেসির একটি বাঁকানো ক্রস গোলবারের ওপরের জালে লাগলে সমতায় ফেরা হয়নি তাদের। ম্যাচের শেষ মুহূর্তে টানা তিনটি কর্নার পেয়েও সুযোগ হাতছাড়া করেন জুলিয়ানো সিমেওনে। তার নেওয়া শটটি পোস্টের অনেক ওপর দিয়ে চলে গেলে আর্জেন্টিনার শিরোপা ধরে রাখার স্বপ্ন ওখানেই শেষ হয়ে যায়।
ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার পর মেজাজ হারিয়ে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন পারেদেস। এই হারের মাধ্যমে সম্ভবত শেষ হয়ে গেল লিওনেল মেসির বিশ্বকাপ অধ্যায়। টুর্নামেন্টে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আটটি গোল করে আসর শেষ করলেন ফুটবলের এই জীবন্ত কিংবদন্তি।