
ফ্রান্স-মরক্কো দ্বৈরথ: ইতিহাসের দুয়ারে নতুন মহাকাব্যের অপেক্ষা
আজ রাতে বদলে যেতে পারে বিশ্ব ফুটবলের চেনা ইতিহাস। একটি ম্যাচের ওপর নির্ভর করছে একটি দেশের ফুটবলীয় মর্যাদা, কোটি মানুষের আত্মবিশ্বাস আর এক সোনালী প্রজন্মের স্বপ্ন। বাংলাদেশ সময় রাত ২টায় যুক্তরাষ্ট্রের মার্সিডিজ-বেন্জ স্টেডিয়ামের চোখধাঁধানো আলোর নিচে মুখোমুখি হচ্ছে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স ও আফ্রিকার অদম্য শক্তি মরক্কো।
প্রায় ৭১ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার এই অত্যাধুনিক স্টেডিয়ামটি আজ রূপ নেবে আবেগ, উত্তেজনা আর কোটি স্বপ্নের মিলনমেলায়। গ্যালারির এক পাশে নীল জার্সিতে ফরাসি সমর্থকদের আকাশ কাঁপানো গর্জন, আর অন্য পাশে মরক্কোর সমর্থকদের ঐতিহ্যবাহী ঢোলের তালে অবিরাম উচ্ছ্বাস তৈরি করবে এক অভূতপূর্ব ফুটবল উৎসবের। বন্ধ ছাদের নিচে স্টেডিয়ামের শব্দের প্রতিধ্বনি ফুটবলারদের স্নায়ুর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে। এই বৈরী ও উত্তাল পরিবেশে যারা নিজেদের স্নায়ু ধরে রাখতে পারবে, তারাই মাঠের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেবে।
ফ্রান্স এই মঞ্চে এসেছে বিশ্বসেরার তকমা ধরে রাখার মিশন নিয়ে। তাদের লক্ষ্য টানা দ্বিতীয়বারের মতো ট্রফি জয়ের পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে যাওয়া। অন্যদিকে মরক্কো এসেছে ফুটবলের এক নতুন ইতিহাস লিখতে। আজকের জয় কেবল তাদের সেমিফাইনালে তুলবে না, বরং পুরো আফ্রিকা মহাদেশের ফুটবলকে নিয়ে যাবে এক অনন্য উচ্চতায়।
কাগজে-কলমে এবং অতীতের মুখোমুখি লড়াইয়ের পরিসংখ্যানে ফরাসিরাই বেশ এগিয়ে। আন্তর্জাতিক ফুটবলে এখন পর্যন্ত এই দুই দল ১৩ বার একে অপরের মুখোমুখি হয়েছে। এর মধ্যে ফ্রান্স জিতেছে ৭টি ম্যাচ, মরক্কোর জয় ২টিতে এবং বাকি ৪টি ম্যাচ অমীমাংসিত বা ড্র হয়েছে। তবে নকআউট পর্বের মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে অতীতের খতিয়ান খুব একটা কাজে আসে না। মাঠের একটি মুহূর্ত, ছোট্ট একটি ভুল কিংবা একক কোনো জাদুকরী নৈপুণ্য পুরো ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে পারে।
চলতি বিশ্বকাপে দুই দলের পথচলাই ছিল রাজকীয়। ফ্রান্স গ্রুপ পর্বে জাপানকে ৩-০, প্যারাগুয়েকে ২-০ এবং কানাডাকে ২-১ গোলে হারিয়ে পূর্ণ পয়েন্ট নিয়ে নকআউট পর্ব নিশ্চিত করে। এরপর শেষ ষোলোর লড়াইয়ে প্যারাগুয়েকে ১-০ গোলে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট কাটে লে ব্লুরা। পুরো টুর্নামেন্টে চার ম্যাচে ফরাসিরা প্রতিপক্ষের জালে বল পাঠিয়েছে ৮ বার, আর গোল হজম করেছে মাত্র ১টি। আক্রমণ ও রক্ষণ—দুই বিভাগেই তারা নিজেদের ভারসাম্য প্রমাণ করেছে।
পিছিয়ে নেই মরক্কোও। গ্রুপ পর্বে তারা দক্ষিণ কোরিয়াকে ২-০ এবং পেরুকে ১-০ গোলে হারানোর পাশাপাশি শক্তিশালী ক্রোয়েশিয়ার সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হিসেবেই পরের রাউন্ডে পা রাখে। এরপর নকআউট পর্বে কানাডাকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নেয় আফ্রিকার প্রতিনিধিরা। চার ম্যাচে মরক্কো গোল করেছে ৭টি আর ফরাসিদের মতোই গোল হজম করেছে মাত্র ১টি। তাদের জমাট রক্ষণভাগ ভাঙা যেকোনো বিশ্বসেরা আক্রমণভাগের জন্যই এখন বড় পরীক্ষা।
ফ্রান্সের সবচেয়ে বড় শক্তির নাম কিলিয়ান এমবাপ্পে। এই ফরোয়ার্ডের গতি আর গোল করার নিখুঁত দক্ষতা যেকোনো রক্ষণভাগকে মুহূর্তে ছিন্নভিন্ন করে দিতে পারে। তার সঙ্গে আক্রমণে থাকছেন উসমান দেম্বেলে, যার ড্রিবলিং প্রতিপক্ষের জন্য বড় ভয়ের কারণ। মাঝমাঠে খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ করবেন অরেলিয়ান শুয়ামেনি এবং রক্ষণভাগের নেতৃত্ব থাকবে উইলিয়াম সালিবার কাঁধে।
বিপরীতে মরক্কোর মূল শক্তি তাদের অটুট দলীয় সংহতি। ডান প্রান্তে আশরাফ হাকিমির গতি ও আক্রমণাত্মক ফুটবল ফ্রান্সকে রক্ষণাত্মক হতে বাধ্য করতে পারে। মাঝমাঠে সুফিয়ান আমরাবাত প্রতিপক্ষের আক্রমণ রুখে দেওয়ার দায়িত্বে থাকবেন, আর সামনে সুযোগের অপেক্ষায় থাকবেন স্ট্রাইকার ইউসুফ এন-নেসিরি।
এই ম্যাচের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর দৃশ্যটি দেখা যাবে এমবাপ্পে ও হাকিমির ব্যক্তিগত দ্বৈরথে। একই ক্লাবে খেলার কারণে তারা একে অপরের শক্তি ও দুর্বলতা খুব ভালো করেই জানেন। আজ একজন চাইবেন গোল করতে, অন্যজন চাইবেন তা রুখে দিতে।
ম্যাচের আগে ফ্রান্সের কোচ দিদিয়ে দেশম সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছেন, মরক্কোকে হালকাভাবে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তারা নিজেদের যোগ্যতায় এই পর্যায়ে এসেছে এবং সেমিফাইনালে যেতে হলে ফরাসিদের সেরা ফুটবলটাই খেলতে হবে। অন্যদিকে মরক্কোর কোচ মোহাম্মদ ওয়াহবি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, তাদের দলে কোনো ভয় নেই। শৃঙ্খলা ও আত্মবিশ্বাস থাকলে যেকোনো পরাশক্তিকে হারানো সম্ভব।
কৌশলগত দিক থেকে ফ্রান্স হয়তো শুরু থেকেই বলের দখল রেখে আক্রমণ করতে চাইবে। আর মরক্কো মুখিয়ে থাকবে প্রতিপক্ষের ভুলের সুযোগ নিয়ে দ্রুত পাল্টা আক্রমণে উঠতে। প্রথমার্ধে ফরাসিরা গোল না পেলে চাপ ক্রমান্বয়ে তাদের ওপরই বাড়বে, যা মরক্কোর জন্য বড় সুযোগ তৈরি করতে পারে। শেষ বাঁশি বাজার পর এক দল উল্লাসে মাতবে, অন্য দল মাঠ ছাড়বে অশ্রুসিক্ত চোখে। তবে রাত শেষে ফুটবল বিশ্ব যে একটি অবিস্মরণীয় গল্পের সাক্ষী হতে যাচ্ছে, তা নিশ্চিত।