
মিয়ানমারের সঙ্গে গোলশূন্য ড্রয়ে এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের অভিযান সমাপ্ত
জাপানের মাটিতে অনুষ্ঠিত এশিয়ান গেমসে নিজেদের শেষ ম্যাচে মিয়ানমারের মুখোমুখি হয়েছিল বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল। দুই দলই ম্যাচে গোলের সুযোগ তৈরি করলেও তা কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়। শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত নব্বই মিনিট ও অতিরিক্ত সময়ের খেলা শেষে গোলশূন্য ড্র নিয়ে মাঠ ছাড়তে বাধ্য হয় লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। এই ড্রয়ের ফলে এশিয়ান গেমসের চলতি আসরে বাংলাদেশের পথচলা এখানেই থেমে গেল এবং মাত্র এক পয়েন্ট সংগ্রহ করেই টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিতে হলো তাদের।
ম্যাচের শুরু থেকেই দুই দল জয়ের জন্য মরিয়া হয়ে লড়াই চালায়। গত বছর মিয়ানমারকে তাদেরই মাটিতে পরাজিত করে প্রথমবারের মতো এশিয়া কাপের মূল পর্বে খেলার গৌরব অর্জন করেছিল বাংলাদেশ। ফলে এই ম্যাচের আগে অতীতের সেই সুখস্মৃতি লাল-সবুজ বাহিনীর মনে বাড়তি অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল। তবে দেড় বছর পর দুই দল যখন আবার মুখোমুখি হয়, তখন মাঠের লড়াইয়ে গোলের দেখা পাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। চলতি এশিয়ান গেমসের গ্রুপ পর্বে নিজেদের প্রথম দুটি ম্যাচে বেশ কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়তে হয়েছিল বাংলাদেশকে। শক্তিশালী উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে দশটি এবং দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে ছয়টি গোল হজম করে পরাজিত হতে হয়েছিল দলটিকে। অন্যদিকে মিয়ানমারও তাদের আগের ম্যাচগুলোতে দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে পাঁচ গোল এবং উত্তর কোরিয়ার কাছে আট গোলের বড় ব্যবধানে হেরে টুর্নামেন্টে বেশ চাপে ছিল। ফলে গ্রুপ পর্বের এই শেষ ম্যাচে উভয় দলই নিজেদের সেরাটা দিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নেমেছিল।
ম্যাচের প্রথমার্ধ থেকেই আক্রমণাত্মক খেলার চেষ্টা চালায় মিয়ানমার। তাদের খেলোয়াড়রা মাঠের দুই প্রান্ত ব্যবহার করে বারবার বাংলাদেশের রক্ষণে বড় ধরনের হুমকি সৃষ্টির চেষ্টা করে। বিশেষ করে মিয়ানমারের মূল আক্রমণভাগের খেলোয়াড় উইন থেইঙ্গি তুনকে ঘিরে তাদের বেশিরভাগ গোলের সুযোগ তৈরি হচ্ছিল। ম্যাচের ২৭তম মিনিটে মিয়ানমারের একটি দুর্দান্ত ও শক্তিশালী শট বাংলাদেশের গোলবারের জন্য মারাত্মক বিপদ ডেকে এনেছিল। কিন্তু গোলবারের নিচে আস্থার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা গোলরক্ষক রুপনা চাকমা অসাধারণ দক্ষতায় সেই আক্রমণ রুখে দেন। প্রথমার্ধে রুপনার পাশাপাশি ডিফেন্ডার শিউলি আজিম ও অভিজ্ঞ শামসুন্নাহারদের দৃঢ়তা বাংলাদেশের রক্ষণভাগকে সুরক্ষিত রাখতে সাহায্য করে। অন্যদিকে বাংলাদেশ দলের পক্ষ থেকেও ঋতুপর্ণা চাকমা, মনিকা চাকমা এবং ফরোয়ার্ড তহুরা খাতুনকে সামনে রেখে বেশ কিছু আক্রমণ শানানোর চেষ্টা করা হয়। তবে মিয়ানমারের জমাট রক্ষণ ভাঙতে ব্যর্থ হয় আক্রমণভাগ।
বিরতির পর ম্যাচের কৌশলগত চিত্রে খুব একটা পরিবর্তন আসেনি। দ্বিতীয়ার্ধে মিয়ানমার আরও বেশি চাপ সৃষ্টি করতে থাকে এবং একের পর এক আক্রমণে বাংলাদেশের রক্ষণকে চরম পরীক্ষার মুখে ফেলে। ম্যাচের ৬৮তম মিনিটে বাংলাদেশের মৌমিতা একটি ফাউলে জড়িয়ে পড়লে প্রতিপক্ষ ফ্রি কিক লাভ করে। এরপর খেলার ৮১তম মিনিটে মিয়ানমার গোলমুখে অত্যন্ত বিপজ্জনক একটি আক্রমণ তৈরি করে। তবে বাংলাদেশের একজন ডিফেন্ডার শেষ মুহূর্তের অতন্দ্র প্রহরীর মতো লড়াই করে সেই আক্রমণ প্রতিহত করেন এবং সম্ভাব্য গোল থেকে দলকে বাঁচান। ম্যাচের ৮৪তম মিনিটে বাংলাদেশও আক্রমণে গিয়ে একটি কর্নার আদায় করে নেয়। দলের অধিনায়ক মারিয়া মান্দার সেই কর্নার কিক থেকে গোল করার সুবর্ণ সুযোগ তৈরি হলেও তা কাজে লাগাতে পারেনি ফরোয়ার্ডরা।
ম্যাচের শেষ মুহূর্তগুলোতে উভয় দলই গোলের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। ৮৬ মিনিটে মিয়ানমার আবারও একটি আক্রমণ শানায়, যা গোলপোস্টের পাশ দিয়ে চলে যায়। ঠিক পরের মিনিটেই অর্থাৎ ৮৭তম মিনিটে বাংলাদেশ আরেকটি ফাউল করলে মিয়ানমার বিপজ্জনক জায়গা থেকে ফ্রি কিক পায়। তবে সেই ফ্রি কিক থেকে নেওয়া শটও শেষ পর্যন্ত জালের ঠিকানা খুঁজে পায়নি। নির্ধারিত ৯০ মিনিটের খেলা শেষে যোগ করা সময়ের প্রথম মিনিটে অর্থাৎ ম্যাচের ৯১তম মিনিটে মিয়ানমারের স্ট্রাইকার গোলবারের অত্যন্ত কাছ থেকে একটি জোরালো শট নেন। সেই মুহূর্তেও ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হন গোলরক্ষক রুপনা চাকমা। তার অসাধারণ ও দুর্দান্ত একটি সেভ মিয়ানমারের নিশ্চিত গোলের সুযোগ ভেস্তে দেয়। পুরো ম্যাচজুড়ে মিয়ানমার আক্রমণে এবং শটের সংখ্যায় কিছুটা এগিয়ে থাকলেও বাংলাদেশের রক্ষণ এবং গোলরক্ষক রুপনার দৃঢ় প্রাচীর ভেদ করতে পারেনি। বাংলাদেশ দলও আক্রমণের ধার বাড়াতে না পারায় শেষ পর্যন্ত গোলশূন্য ড্রয়ের হতাশা ও সন্তুষ্টি নিয়ে মাঠ ছাড়তে হয়।