বিশ্বকাপের উত্তেজনা এখন রূপ নিয়েছে চূড়ান্ত রোমাঞ্চে। ৩২ দলের দীর্ঘ পথচলা শেষে শিরোপার লড়াইয়ে টিকে আছে মাত্র আটটি পরাশক্তি। কোয়ার্টার ফাইনালের মঞ্চে এই দলগুলোই এখন শেষ চারের টিকিট কাটার জন্য একে অপরের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে। এবারের শেষ আটের লাইনআপের দিকে তাকালে বিশ্ব ফুটবলে ইউরোপের একচ্ছত্র আধিপত্যই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কোয়ার্টার ফাইনালে নাম লেখানো আটটি দলের মধ্যে ছয়টিই ইউরোপ মহাদেশের। বাকি দুটি স্থানের একটি দখল করেছে দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবল পরাশক্তি আর্জেন্টিনা এবং অন্যটি আফ্রিকার চমক মরক্কো।
বিশ্ব ফুটবলের অত্যন্ত জনপ্রিয় ও নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যানভিত্তিক বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান ‘অপ্টা’ সম্প্রতি তাদের উন্নত সুপারকম্পিউটার গাণিতিক মডেলের সাহায্য নিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালের সম্ভাব্য ফলাফলের একটি আগাম পূর্বাভাস প্রকাশ করেছে। তাদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও গাণিতিক বিশ্লেষণের ওপর ভিত্তি করে সেমিফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে স্পষ্ট ব্যবধানে এগিয়ে রাখা হয়েছে ফ্রান্স, স্পেন, ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনাকে।
উল্লেখ্য, শেষ ষোলোর ম্যাচগুলোর ক্ষেত্রেও অপ্টার এই গাণিতিক পূর্বাভাস বেশ সফল প্রমাণিত হয়েছিল। নকআউট পর্বের প্রথম ধাপের ১৬টি ম্যাচের মধ্যে ১৪টিরই সম্ভাব্য বিজয়ী একদম সঠিকভাবে নির্ধারণ করতে পেরেছিল এই মডেল। শুধু তাই নয়, শেষ ষোলোর নির্ধারিত আটটি তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ম্যাচের মধ্যে ছয়টিরই মূল ফলাফল হুবহু মিলে গিয়েছিল এই সুপারকম্পিউটারের পূর্বাভাসের সঙ্গে।
অপ্টার এই নিখুঁত পূর্বাভাসটি মূলত তৈরি করা হয় প্রায় ১০ হাজার ভিন্ন ভিন্ন ম্যাচ সিমুলেশনের মাধ্যমে। যেখানে প্রতিটি দলের সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক পারফরম্যান্স, স্কোয়াডে থাকা খেলোয়াড়দের বর্তমান ব্যক্তিগত পরিসংখ্যান, চোটের তালিকা এবং দুই দলের অতীত মুখোমুখি লড়াইয়ের দীর্ঘ রেকর্ড অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করে ম্যাচ জয়ের গাণিতিক সম্ভাবনা নির্ধারণ করা হয়।
অপ্টা সুপারকম্পিউটারের হিসাব অনুযায়ী, কোয়ার্টার ফাইনালের প্রথম ম্যাচে মরক্কোর বিপক্ষে ফ্রান্সের জয়ের সম্ভাবনা ৭২ দশমিক ১০ শতাংশ, যেখানে মরক্কোর পক্ষে বাজি ধরা হয়েছে মাত্র ২৭ দশমিক ৯০ শতাংশ। দ্বিতীয় কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের বিপক্ষে স্পেনের জয়ের সম্ভাবনা ৭০ দশমিক ৭২ শতাংশ এবং বেলজিয়ামের সম্ভাবনা ২৯ দশমিক ২৮ শতাংশ। তৃতীয় ম্যাচে নরওয়ের মুখোমুখি হওয়া ইংল্যান্ডের জয়ের পাল্লা ৬১ দশমিক ৯৬ শতাংশ ভারী, বিপরীতে আর্লিং হালান্ডের নরওয়ের সম্ভাবনা ৩৮.০৪ শতাংশ। শেষ ম্যাচে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার জয়ের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে ৬৩ দশমিক ৬২ শতাংশ এবং সুইসদের সম্ভাবনা ৩৬ দশমিক ৩৮ শতাংশ।
অপ্টার এই গাণিতিক পূর্বাভাসের পাশাপাশি ব্রাজিলের নামী সংবাদমাধ্যম ও গ্লোবো-র নিজস্ব বিশ্লেষণভিত্তিক বিশেষ টুল ‘ক্রিস্টাল বল’-ও কোয়ার্টার ফাইনাল নিয়ে তাদের নিজস্ব মূল্যায়ন প্রকাশ করেছে। ব্রাজিলীয় এই সংবাদমাধ্যমের ডেটা অ্যানালিস্টদের মূল্যায়নেও ফ্রান্স ও আর্জেন্টিনা নিজেদের ম্যাচে স্পষ্ট ব্যবধানে প্রতিপক্ষের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। তবে কাগজের কলমে ব্যবধান থাকলেও মাঠের লড়াইয়ে প্রতিটি ম্যাচই চরম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে বলে মনে করছে তারা।
চলতি টুর্নামেন্ট শুরুর ঠিক আগে যেসব দলকে বিশ্বমঞ্চের শিরোপার অন্যতম প্রধান দাবিদার হিসেবে গণ্য করা হয়েছিল, মাঠের পারফরম্যান্সে ফ্রান্স ও আর্জেন্টিনা এখন পর্যন্ত সেই প্রত্যাশার শতভাগ প্রতিফলন দেখিয়েছে। দুটি দলই টুর্নামেন্টে এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ ১৪টি করে গোল করে নিজেদের আক্রমণভাগের ধার প্রমাণ করেছে। গোলদাতার ব্যক্তিগত তালিকায় আটটি গোল নিয়ে বর্তমানে সবার শীর্ষে রাজত্ব করছেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসি। তবে তার ঠিক পেছনেই সাতটি করে গোল নিয়ে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলেছেন ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে ও নরওয়ের গোলমেশিন আর্লিং হালান্ড।
ও গ্লোবো-র ‘ক্রিস্টাল বল’ টুলের চুলচেরা বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ফ্রান্স ও আর্জেন্টিনা শুধু নিজেদের কোয়ার্টার ফাইনালের ম্যাচেই এগিয়ে নেই, বরং এই দুই পরাশক্তি শেষ পর্যন্ত টুর্নামেন্টের ফাইনালে মুখোমুখি হওয়ারও এক দারুণ সমীকরণ তৈরি করেছে। তাদের গাণিতিক হিসাব বলছে, এবারের বিশ্বকাপের মহাকাব্যিক শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচে মেসি ও এমবাপ্পের দলের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে ১০ দশমিক ৫ শতাংশ। মাঠের আসল লড়াইয়ে এই পরিসংখ্যান কতটুকু মেলে, এখন সেটাই দেখার বিষয়।
