
নেইমার-সান্তোস সম্পর্কে বাড়ছে দূরত্ব
বড় স্বপ্ন আর আবেগ নিয়ে শৈশবের ক্লাব সান্তোসে ফিরেছিলেন নেইমার। সমর্থকদের প্রত্যাশা ছিল, ব্রাজিলিয়ান এই তারকার প্রত্যাবর্তনে নতুন করে ঘুরে দাঁড়াবে ক্লাবটি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই আশাবাদ ম্লান হয়ে এখন সম্পর্কের টানাপোড়েনই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। মাঠের পারফরম্যান্স, ক্লাবের আর্থিক সংকট, ড্রেসিংরুমের পরিবেশ এবং ব্যবস্থাপনার সঙ্গে মতবিরোধ—সব মিলিয়ে সান্তোসে নেইমারের ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চয়তার মুখে।
ব্রাজিলের বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুই পক্ষের সম্পর্ক এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত থাকা বর্তমান চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর সেটি নবায়নের সম্ভাবনা খুবই কম। ক্লাবের ভেতরের পরিবেশ এবং সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ সেই আশঙ্কাকেই আরও জোরালো করেছে।
ব্রাজিলের প্রভাবশালী ক্রীড়া সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, সান্তোসের ড্রেসিংরুমে নেইমারের আচরণ নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে। ক্লাবের ভেতরের একাধিক সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, প্রতিদিনের কার্যক্রমে তাকে সামলানো কঠিন হয়ে উঠেছে এবং তার কিছু আচরণে সতীর্থ, কোচিং স্টাফ ও ক্লাব কর্মকর্তারা বিরক্ত। গত মে মাসে অনুশীলনের সময় রবিনহো জুনিয়রের সঙ্গে তার উত্তপ্ত বাকবিতণ্ডার পর নেতৃত্বের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
মাঠের বাইরের কয়েকটি ঘটনাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। কোপা সুদামেরিকানার একটি ম্যাচ উপলক্ষে সান্তোস দল যখন ভেনিজুয়েলায় অবস্থান করছিল, তখন সাও পাওলোতে একটি পোকার প্রতিযোগিতায় নেইমারের উপস্থিতি সমালোচনার জন্ম দেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই সমালোচনার জবাবও দেন তিনি। পরে শাপেকোয়েন্সের বিপক্ষে গোল করার পর পোকারে কার্ড বিলির ভঙ্গিতে উদযাপন করে আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন ব্রাজিলিয়ান এই ফরোয়ার্ড।
এদিকে ব্রাজিলের সংবাদমাধ্যমে আরও দাবি করা হয়েছে, দীর্ঘদিনের পেশাদার ফুটবল জীবনের নিয়মিত রুটিনে নেইমার ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। এমনকি তিনি অবসর নেওয়ার বিষয়েও চিন্তা করছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তবে তার বাবার সঙ্গে থাকা বিভিন্ন বাণিজ্যিক চুক্তি ও আর্থিক দায়বদ্ধতার কারণে তাকে খেলা চালিয়ে যেতে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে বলেও দাবি করা হয়েছে। যদিও এসব বিষয়ে নেইমার বা তার পরিবারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো নিশ্চিত বক্তব্য দেওয়া হয়নি।
অন্যদিকে নেইমারের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা ক্লাব কর্তৃপক্ষের প্রশাসনিক কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের অভিযোগ, ফুটবল বিভাগের বাইরের ব্যক্তিদের অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ, প্রশাসনিক অস্বচ্ছতা এবং দুর্বল অবকাঠামো ক্লাবটির উন্নয়নে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা মনে করেন, টানা দ্বিতীয় মৌসুমে অবনমন এড়ানোর লড়াইয়ে থাকা একটি ক্লাবকে কেন্দ্র করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা কঠিন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, অনুশীলন কেন্দ্র ও ভিলা বেলমিরো স্টেডিয়ামের উন্নয়নে নেইমার ব্যক্তিগতভাবে আর্থিক সহায়তাও দিয়েছেন।
পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে ক্লাবের আর্থিক সংকট। ব্রাজিলিয়ান সংবাদমাধ্যমগুলোর দাবি, নেইমারের পাওনা হিসেবে সান্তোসের বকেয়া অর্থের পরিমাণ ১৭ মিলিয়ন ডলারের বেশি। পাশাপাশি টানা তিন মাস খেলোয়াড়দের ইমেজ রাইটসের অর্থ পরিশোধ করা হয়নি বলেও খবর প্রকাশিত হয়েছে। এই সংকট সামাল দিতে ক্লাবের একাডেমির প্রতিভাবান খেলোয়াড় লুকা মেইরেলেসকে শাখতার দোনেৎস্কে বিক্রি করে পাওয়া অর্থের একটি অংশ থেকে প্রায় ১.৫ মিলিয়ন ডলার নেইমারের পারিবারিক প্রতিষ্ঠান এনআর স্পোর্টসকে পরিশোধ করেছে সান্তোস।
সাম্প্রতিক সময়ে শাপেকোয়েন্সের বিপক্ষে ২-২ গোলে ড্র হওয়া ম্যাচের বিরতিতে ড্রেসিংরুমে গ্যাব্রিয়েল বোন্তেম্পো ও জোয়াও আনানিয়াসের সঙ্গে নেইমারের উত্তপ্ত বাকবিতণ্ডার খবরও প্রকাশিত হয়। তবে এই অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন তিনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় নেইমার লিখেছেন, পুরো ঘটনাই ভিত্তিহীন এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তার ভাষ্য, ড্রেসিংরুমে যা হয়েছিল, তা ছিল ম্যাচ নিয়ে খেলোয়াড়দের স্বাভাবিক আলোচনা। জয়ের তীব্র ইচ্ছা থেকেই সবাই নিজেদের মতামত দিয়েছেন। কোনো তরুণ ফুটবলারকে অপমান, গালিগালাজ বা অসম্মান করার মতো ঘটনা ঘটেনি বলেও তিনি স্পষ্ট করেন।
সব মিলিয়ে নেইমার ও সান্তোসের দ্বিতীয় অধ্যায় এখন কঠিন এক মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। একদিকে ক্লাবের আর্থিক ও প্রশাসনিক সংকট, অন্যদিকে খেলোয়াড়কে ঘিরে বিতর্ক ও সম্পর্কের অবনতি—এসব কারণে ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও ঘনীভূত হয়েছে। এখন নজর থাকবে, চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে দুই পক্ষের মধ্যে দূরত্ব কমে কি না, নাকি শৈশবের ক্লাবের সঙ্গে নেইমারের এই প্রত্যাবর্তনের গল্প শেষ হবে তিক্ত বিদায় দিয়ে।