একজন ফুটবলারের জন্য পুরো লিগ অপরাজিত থাকা গর্বের বিষয় হতে পারে, কিন্তু একজন গোলকিপারের জন্য পুরো লিগে কোনো গোল না খাওয়া বা ‘ক্লিন শিট’ রাখা যেন স্বপ্নের সমতুল্য। সেই স্বপ্নই বাস্তবায়ন করেছেন দক্ষিণ এশিয়ার সেরা গোলকিপার রুপনা চাকমা।
সম্প্রতি কমলাপুর স্টেডিয়ামে শেষ হওয়া নারী জাতীয় ফুটবল লিগে চ্যাম্পিয়ন রাজশাহী স্টারসের হয়ে ৯টি ম্যাচে একটি গোলও হজম করেননি রুপনা। এই অসাধারণ কীর্তির স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি নির্বাচিত হয়েছেন লিগের সেরা গোলকিপার।
রুপনা দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের ঘরোয়া ও আন্তর্জাতিক ফুটবলে প্রথম নামের গোলকিপার হিসেবে খেলে আসছেন। তাঁর ঝুলিতে আছে ২০২২ ও ২০২৪ সালের সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে সেরা গোলকিপার হওয়ার গৌরব।
| বছর | টুর্নামেন্ট | ম্যাচ সংখ্যা | খাওয়া গোল | সেরা গোলকিপার পুরস্কার |
|---|---|---|---|---|
| ২০২২ | সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ | ৫ | ১ | হ্যাঁ |
| ২০২৪ | সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ | ৫ | ৪ | হ্যাঁ |
| ২০২৬ | জাতীয় নারী লিগ | ৯ | ০ | হ্যাঁ |
২০২৬ সালের লিগে রাজশাহী ১০ ম্যাচে ৯০ গোল করে, কোনো গোল হজম করেনি। রুপনাকে একটি দুর্বল দলের বিরুদ্ধে বিশ্রাম দেওয়া হয়। সেই ম্যাচে জাতীয় দলের দ্বিতীয় গোলকিপার স্বর্না রানী মন্ডল খেলেন। এছাড়া দু-তিনটি ম্যাচে রুপনাকে শেষ সময়ে নামিয়ে অন্য খেলোয়াড়দের সুযোগ দেওয়া হয়।
জয়ী হওয়ার পর রুপনা বললেন, “আগের লিগগুলোতে বসুন্ধরা কিংস ও নাসরিন স্পোর্টিংয়ের হয়ে খেলেছি। এক লিগে একটিমাত্র গোল খেয়েছি। এবার কোনো গোলই খাইনি। লিগ কঠিন ছিল, তবে আমি নিজের প্রতি অঙ্গীকার করেছিলাম কোনো গোল খাব না।”
রুপনার সতীর্থদের মধ্যে ছিলেন শিউলি আজিম, ঋতুপর্ণা, আলপি আক্তার, এবং দুজন নেপালি খেলোয়াড়। শক্তিশালী রক্ষণভাগ থাকায় চাপ কিছুটা কম ছিল, তবে চ্যালেঞ্জ কম ছিল না। রুপনার মতে, ফরাশগঞ্জ ও সেনাবাহিনী ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী।
ফরাশগঞ্জের বিরুদ্ধে রাজশাহী জয় পেয়েছিল ১-০, আর শেষ ম্যাচে সেনাবাহিনীকে হারায় ৩-০ ব্যবধানে। লিগে রুপনার কয়েকটি সেভ ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে ফরাশগঞ্জ ম্যাচে। পুরো লিগে তাঁর বিরুদ্ধে একটি পেনাল্টি হয়েছে, সেটিও তিনি রক্ষা করেছেন।
রাঙামাটির কুতুকছড়ির সাধারণ পরিবারে জন্ম নেওয়া রুপনা জন্মের আগে তার কৃষক বাবা গাজামনি চাকমাকে হারান। চার ভাই–বোনের মধ্যে সবার ছোট রুপনা নানা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বড় হয়েছেন। ফুটবলের হাতেখড়ি পেয়েছেন ঘাগড়া স্কুলে, কোচ শান্তিমনি চাকমার তত্ত্বাবধানে। শুরুতে স্ট্রাইকার হলেও একদিন কোচ তাঁকে গোলকিপার হওয়ার প্রস্তাব দেন, যা তিনি গ্রহণ করেন। রুপনার কথায়, “গোলকিপিং একটি বড় দায়িত্ব। একটি ভুল দলকে ডুবিয়ে দিতে পারে, আর একটি ভালো সেভ দলের আত্মবিশ্বাস বাড়ায়।”
গত বছর তিনি ভুটানের লিগে ট্রান্সপোর্ট ইউনাইটেডের হয়ে খেলেছেন। এখন তার লক্ষ্য আরও বড় – ভুটান ও নেপাল ছাড়া এশিয়ার অন্য কোনো লিগে খেলার স্বপ্ন।
এবার জাতীয় দলের গোলরক্ষক হিসেবে রুপনার সামনে চ্যালেঞ্জ হবে এশিয়ান কাপে। প্রথমবারের মতো ২০ বা ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ নারী দল অস্ট্রেলিয়া যাবে। রুপনা বললেন, “আমি প্রস্তুত। নিজের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করব।”
