বিশ্বকাপের মঞ্চে আরও একবার ব্রাজিলের হৃদয়ভঙ্গ হলো। ল্যাটিন আমেরিকার পরাশক্তিদের নকআউট পর্ব থেকে বিদায় করে কোয়ার্টার ফাইনালের আগেই বাড়ি পাঠিয়ে দিল ইউরোপের দল নরওয়ে। ১৯৯০ সালের পর এই প্রথম বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর বাধার মুখে পড়ে এত দ্রুত বিদায় নিতে হলো পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের। আর এই চরম হতাশার রাতে চোখের জলে আন্তর্জাতিক ফুটবল ক্যারিয়ারের ইতি টানার ঘোষণা দিলেন ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের অন্যতম মহাতারকা নেইমার জুনিয়র। বিদায়ের ক্ষণে সুখকর ও অনাকাঙ্ক্ষিত—দুই ধরনের রেকর্ডই নিজের নামের পাশে যোগ করেছেন ৩৪ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড।
Table of Contents
মেটলাইফ স্টেডিয়ামের ট্র্যাজেডি ও নেইমারের কান্না
গতকাল দিবাগত রাতে নিউজার্সির ঐতিহ্যবাহী মেটলাইফ স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হয়েছিল ব্রাজিল ও নরওয়ে। ম্যাচের শুরু থেকেই চোট সারিয়ে ফেরা নেইমারকে বেঞ্চে রেখে মাঠে নামে সেলেসাওরা। তবে মাঠের খেলায় একের পর এক সুযোগ হাতছাড়া করার খেসারত দিতে হয় তাদের। আক্রমণভাগের ব্যর্থতায় ম্যাচ থেকে ছিটকে পড়ে কার্লো আনচেলত্তির শিষ্যরা। নরওয়ে যখন ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে, তখন ম্যাচের ৬৭ মিনিটে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নামেন নেইমার। অতিরিক্ত সময়ে তিনি পেনাল্টি থেকে একটি গোল করে ব্যবধান কমালেও তা দলের পরাজয় এড়াতে পারেনি। ২-১ গোলের হার নিয়ে মাঠ ছাড়ার পর আবেগ ধরে রাখতে পারেননি নেইমার; মাঠেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। এর পরেই ইঙ্গিত দেন আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানানোর।
চার বিশ্বকাপের আক্ষেপ এবং অনাকাঙ্ক্ষিত রেকর্ড
এই বিদায়ের সাথে সাথে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত রেকর্ডের অংশীদার হলেন নেইমার। ফুটবল ইতিহাসের মাত্র দ্বিতীয় ব্রাজিলিয়ান খেলোয়াড় হিসেবে চারটি বিশ্বকাপ খেলেও কখনো সোনালী ট্রফিটি ছুঁয়ে দেখতে পারেননি তিনি। নেইমার ২০১৪, ২০১৮, ২০২২ এবং ২০২৬—এই চারটি বিশ্বকাপে ব্রাজিলের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। এর আগে ব্রাজিলের ইতিহাসে এই হতাশাজনক রেকর্ডের একমাত্র মালিক ছিলেন ডিফেন্ডার থিয়াগো সিলভা, যিনি ২০১০ থেকে ২০২২ পর্যন্ত চারটি বিশ্বকাপ খেলেছেন কিন্তু শিরোপার দেখা পাননি।
অথচ ব্রাজিলের ইতিহাসে চার বা তার বেশি বিশ্বকাপ খেলার কীর্তি রয়েছে পেলে, কাফু, রোনালদো নাজারিও, নিলটন সান্তোস, লেয়াও, কাস্তিলহো এবং দালমা সান্তোসের মতো কিংবদন্তিদের। তবে নেইমার ও সিলভার ব্যতিক্রম যে, এই তালিকার বাকি প্রত্যেকেই ক্যারিয়ারে অন্তত একবার হলেও বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন।
পেলের পাশে অনন্য কীর্তি
বেদনার খতিয়ানেও নেইমার নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গেছেন। প্রথম ব্রাজিলিয়ান হিসেবে পেলের পর দ্বিতীয় ফুটবলার হিসেবে চারটি ভিন্ন বিশ্বকাপে গোল করার অনন্য মাইলফলক স্পর্শ করেছেন তিনি। নরওয়ের বিপক্ষে পেনাল্টি থেকে করা গোলটি তাকে পেলের পর এই তালিকায় জায়গা করে দেয়, যা তার ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা এক সুখকর রেকর্ড। চোটের কারণে এবারের ২০২৬ বিশ্বকাপে তিনি মাত্র দুটি ম্যাচ (স্কটল্যান্ড ও নরওয়ের বিপক্ষে) খেলতে পেরেছেন এবং সব মিলিয়ে মাঠে ছিলেন মাত্র ৩৬ মিনিট।
এক নজরে নেইমারের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের পরিসংখ্যান
যদি এই ম্যাচটিই নেইমারের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচ হয়ে থাকে, তবে ব্রাজিলের হলুদ জার্সিতে তার পরিসংখ্যান থাকবে অবিশ্বাস্য এক উচ্চতায়। নিচে নেইমারের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের বিস্তারিত পরিসংখ্যান তুলে ধরা হলো:
| ক্যাটাগরি / টুর্নামেন্ট | অর্জিত পরিসংখ্যান ও তথ্য |
| মোট আন্তর্জাতিক ম্যাচ | ১৩০টি |
| মোট গোল (ব্রাজিলের সর্বোচ্চ) | ৮০টি |
| মোট অ্যাসিস্ট | ৫৮টি |
| অংশগ্রহণকৃত বিশ্বকাপের সংখ্যা | ৪টি (২০১৪, ২০১৮, ২০২২, ২০২৬) |
| জাতীয় দলের হয়ে প্রধান শিরোপা | ২০১৩ ফিফা কনফেডারেশনস কাপ |
| বয়সভিত্তিক দলের বড় সাফল্য | ২০১৬ রিও অলিম্পিকে স্বর্ণপদক (অনূর্ধ্ব-২৩) |
| চারটি বিশ্বকাপে খেলার অন্য ব্রাজিলিয়ান | পেলে, কাফু, রোনালদো, সিলভা, নিলটন সান্তোস, লেয়াও, কাস্তিলহো, দালমা সান্তোস |
| বিশ্বকাপে মোট গোল করার ভিন্ন আসর | ৪টি (পেলের পর একমাত্র ব্রাজিলিয়ান) |
| ২০২৬ বিশ্বকাপে খেলা ম্যাচ সংখ্যা | ২টি (স্কটল্যান্ড ও নরওয়ে) |
| ২০২৬ বিশ্বকাপে মোট খেলার সময় | ৩৬ মিনিট |
“এখানেই শুরু, এখানেই শেষ”— বিদায়ের ইঙ্গিত দিয়ে নেইমারের এই সংক্ষিপ্ত উক্তিটি কোটি ব্রাজিল সমর্থককে স্তব্ধ করে দিয়েছে। ট্রফিহীন এক বুক ভরা আক্ষেপ নিয়ে ব্রাজিলের পোস্টার বয়ের আন্তর্জাতিক অধ্যায়ের অবসান ফুটবল ইতিহাসের এক ট্র্যাজিক গল্প হয়েই থাকবে।
