
মায়ামির সৈকতে ফের দেখা মিলতে পারে এমএসএন জুটির
ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে চিরভাস্বর সেই ঐতিহাসিক ত্রয়ী—মেসি, সুয়ারেজ ও নেইমার—যাঁরা একসময় ইউরোপীয় ফুটবলে রাজত্ব করেছিলেন, তাঁদের কি আরও একবার একই জার্সিতে দেখা যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে? সাম্প্রতিক সময়ে ব্রাজিলিয়ান তারকা নেইমারের ক্যারিয়ারের গতিপ্রকৃতি এবং ইন্টার মায়ামির সঙ্গে তাঁর নাম জড়িয়ে নানা গুঞ্জন শুরু হওয়ায় বিশ্বজুড়ে ফুটবল ভক্তদের মনে এই প্রশ্নটি ফের জোরালোভাবে উঁকি দিচ্ছে। সান্তোসের সঙ্গে তাঁর বর্তমান চুক্তির মেয়াদ শেষের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন এক ধোঁয়াশা।
গত মাসের শেষ দিকে শাপেকোয়েনসের সঙ্গে সান্তোসের দুই গোলের ড্রয়ের পরের দিনটি অন্য আট দশটি দিনের মতো ছিল না। সান্তোসের প্র্যাকটিস মাঠে যখন দলের সতীর্থরা কঠোর অনুশীলনে ব্যস্ত, তখন নেইমার ছিলেন সম্পূর্ণ নিজের মেজাজে। ট্রেনিং সেন্টারের মূল ভবনে এসে গাড়ি থেকে নেমে সটান নিজের মতো করে চলে যাওয়ার ঘটনাটি এখন ওই ক্লাবের নিয়মিত দৃশ্যে পরিণত হয়েছে। মাঠে নেমে কখনো ঝলক দেখালেও তাঁর আচরণে একধরনের নির্লিপ্ততা ও গা-ছাড়া ভাব স্পষ্ট। ৩৪ বছর বয়সে এসে একজন ফুটবলারের ক্যারিয়ার যখন গোধূলিলগ্নে উপনীত, তখন তাঁর এই আচরণ ঘিরে নানামুখী আলোচনা চলছে। সান্তোসের সঙ্গে তাঁর বর্তমান চুক্তির মেয়াদ আগামী ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্ধারিত থাকলেও এর আগেই গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছে যে তিনি নতুন কোনো ঠিকানায় পাড়ি জমাতে পারেন কিংবা হুট করেই বুটজোড়া তুলে রাখতে পারেন।
আর এই সমস্ত জল্পনা-কল্পনার ঠিক কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ক্লাব ইন্টার মায়ামি। ফ্লোরিডার এই ক্লাবে আগে থেকেই জাদুকরি নৈপুণ্য দেখিয়ে চলেছেন লিওনেল মেসি এবং লুইস সুয়ারেজ। অতীতে বার্সেলোনা ক্লাবে ২০১৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত এই তিন তারকা মিলে যে ত্রয়ী বা এমএসএন জুটি গড়ে তুলেছিলেন, তা বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে অন্যতম সেরা আক্রমণভাগ হিসেবে স্বীকৃত। সেই সোনালি সময়ে তিন মৌসুমে তারা জিতেছিল মোট নয়টি বড় ট্রফি, যার মধ্যে ইউরোপসেরা উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ এবং ট্রেবল জয়ের অবিস্মরণীয় কীর্তিও রয়েছে। সেবার প্রথম মৌসুমেই এই তিনজন মিলে করেছিলেন অবিশ্বাস্য ১২২টি গোল, যেখানে মেসির নামের পাশে ছিল ৫৮টি, নেইমারের ৩৯টি এবং সুয়ারেজের ২৫টি গোল। কোচ লুইস এনরিকের অধীনে সেই বার্সেলোনা দল প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে মুহূর্তে গুঁড়িয়ে দিত।
তবে সময়ের স্রোতে অনেক কিছুই বদলে গেছে। ইন্টার মায়ামিতে মেসির দীর্ঘদিনের সতীর্থ সার্জিও বুসকেতস ও জর্দি আলবা ইতোমধ্যে তাঁদের সোনালি অধ্যায় শেষ করে বিদায় নিয়েছেন। ডেভিড বেকহামের মালিকানাধীন মায়ামি প্রজেক্টে এখন নতুন এবং বড় কোনো চমকের অপেক্ষা। আর ঠিক এই জায়গাতেই বন্ধু মেসির সান্নিধ্য এবং পুরোনো স্মৃতির টানে নেইমারের মায়ামিতে যোগ দেওয়ার গুঞ্জনটি ডালপালা মেলছে। কিন্তু নস্টালজিয়ার এই মোহের আড়ালে রয়েছে কিছু কঠিন বাস্তবতাও। ক্যারিয়ারের এই পর্যায়ে এসে ঘন ঘন চোটের কারণে নেইমারের শারীরিক ফিটনেস প্রায়ই প্রশ্নের মুখে পড়ে। প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলের দীর্ঘ লড়াইয়ে তিনি আগের মতো নিজের সেরা ছন্দ ধরে রাখতে পারবেন কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
সান্তোস ক্লাব যেমন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে তাঁদের তারকা ফুটবলারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানার জন্য, তেমনি ফুটবল বিশ্বও তাকিয়ে আছে নেইমারের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। ইন্টার মায়ামির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রস্তাব দেওয়া না হলেও বন্ধু মেসির উপস্থিতি সেখানে এক অদৃশ্য চুম্বকের মতো কাজ করছে। কাম্প ন্যু-র সবুজ ঘাসে যে আক্রমণভাগ একসময় ফুটবলকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল, সেই কবিতার শেষ পঙক্তিটি কি তবে মার্কিন মুলুকের মাটিতে রচিত হবে? নাকি সময়ের নিষ্ঠুর বাস্তবতায় সেই স্বপ্ন কেবল স্মৃতির পাতাতেই ঢাকা পড়ে থাকবে—তার উত্তর দেবে কেবল সময়।