
সমর্থন হারিয়ে কোণঠাসা ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো
পায়ের তলার মাটি ক্রমশ সরে যাওয়ার তীব্র বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। বিশ্বকাপসহ ফুটবলের বড় বড় টুর্নামেন্টের বাণিজ্যিক স্বত্ব বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির উদ্যোগ নিয়ে শুরু হওয়া তীব্র সমালোচনার ঝড় এখন তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে ঘোর অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছে। বিশ্বজুড়ে প্রবল প্রতিবাদের মুখে শেষ পর্যন্ত সেই বিতর্কিত পরিকল্পনা থেকে সরে আসতে বাধ্য হলেও, প্রভাবশালী ফুটবল সংস্থাগুলো এখন প্রকাশ্যেই তাঁর ওপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। একই সঙ্গে ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফার পক্ষ থেকে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতিও শুরু হয়েছে।
মূলত ‘ফিফা ফরওয়ার্ড এন্টারপ্রাইজেস’ বা এফএফই নামক একটি নতুন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেছিলেন ইনফান্তিনো। এই উদ্যোগের মাধ্যমে ফিফার সবচেয়ে লাভজনক ও বড় টুর্নামেন্টগুলোর শেয়ার বেসরকারি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করার ফন্দি আঁটা হয়েছিল। কিন্তু এই খবর প্রকাশ্যে আসতেই বিশ্ব ফুটবলের অন্দরে প্রতিবাদের দাবানল জ্বলে ওঠে। উয়েফাভুক্ত দেশগুলো ফিফার বৈশ্বিক টুর্নামেন্টগুলো বয়কট করার মতো কঠোর হুংকার দিয়েছিল। পাশাপাশি এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন বা এএফসি এবং উত্তর, মধ্য আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা কনকাকাফও এই বাণিজ্যিকীকরণের তীব্র নিন্দা জানিয়েছিল। বিশ্বব্যাপী এমন নজিরবিহীন প্রতিবাদের মুখে গত শনিবার ফিফা বাধ্য হয়ে শেষ পর্যন্ত এই বিতর্কিত পরিকল্পনা আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল ঘোষণা করে।
পরিকল্পনা বাতিল করা হলেও ইনফান্তিনোর ওপর ইউরোপীয় দেশগুলোর আস্থা আর ফিরছে না। ওয়েলস ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বা এফএডব্লিউ ২০২৭ থেকে ২০৩১ মেয়াদের আসন্ন ফিফা সভাপতি নির্বাচনে ইনফান্তিনোকে দেওয়া তাদের পূর্বঘোষিত সমর্থন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার করে নিয়েছে। এফএডব্লিউ এক কড়া বিবৃতিতে পরিষ্কার জানিয়েছে যে, প্রাতিষ্ঠানিক শাসনব্যবস্থা, নেতৃত্বদানের ক্ষমতা, নৈতিক মানদণ্ড এবং পারস্পরিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে বর্তমান সভাপতির সাম্প্রতিক ব্যর্থতাগুলো তাঁকে বিশ্ব ফুটবলের শীর্ষ পদে টিকিয়ে রাখার আর কোনো নৈতিক ভিত্তি রাখেনি।
বৃটিশ গণমাধ্যম ‘দ্য টাইমস’-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে প্রকাশ পেয়েছে যে, ইংল্যান্ডের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বা এফএ-ও ইনফান্তিনোর পুনর্নির্বাচনের পক্ষে দেওয়া তাদের সমর্থনের চিঠিটি এবার প্রত্যাহার করে নেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর আগে গত শনিবার বিশ্ব ফুটবলের পরিচালনা ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করার স্বার্থে ফিফার শাসন কাঠামোর একটি পূর্ণাঙ্গ ও কঠোর পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছিল ইংলিশরা।
পরিস্থিতি সামাল দেওয়া তো দূরের কথা, উল্টো উয়েফা এখন এই পুরো বিষয়টি নিয়ে বড় ধরনের আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জোরালোভাবে বিবেচনা করছে। ইতোমধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অভিজ্ঞ আইনজীবীদের মাধ্যমে জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে একটি কড়া আইনি নোটিশ পাঠিয়েছে ইউরোপীয় ফুটবলের এই সংস্থাটি। ওই নোটিশে ফিফা ফরওয়ার্ড এন্টারপ্রাইজেস সম্পর্কিত সমস্ত চুক্তিপত্র, নথিপত্র ও গোপনীয় তথ্য কোনোভাবেই ধ্বংস বা নষ্ট না করে তা সুরক্ষিতভাবে সংরক্ষণ করার কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আগামী বছরের মার্চ মাসে নির্ধারিত ফিফা কংগ্রেসে পরবর্তী সভাপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। চতুর্থবারের মতো ফিফার সর্বোচ্চ এই পদে লড়ার পরিকল্পনা থাকলেও সাম্প্রতিক বাণিজ্যিক বিতর্ক এবং একের পর এক প্রভাবশালী সদস্য দেশের সমর্থন হারানোর কারণে ইনফান্তিনোর রাজনৈতিক ক্যারিয়ার এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।