
সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড মহাদ্বন্দ্ব: বিশ্বকাপে মুখোমুখি লড়াইয়ে কে এগিয়ে?
ফুটবল বিশ্বের অন্যতম তীব্র এবং ঐতিহ্যবাহী এক প্রতিদ্বন্দ্বিতার নাম আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ড। মাঠের ফুটবল ছাপিয়ে এই দুই দলের লড়াইয়ের পেছনে জড়িয়ে থাকে রাজনৈতিক ইতিহাস, আবেগ আর মাঠের চিরন্তন বৈরিতা। দিয়েগো ম্যারাডোনার বিতর্কিত ‘হ্যান্ড অব গড’ থেকে শুরু করে শতাব্দীর সেরা গোল, কিংবা মাইকেল ওয়েনের একক নৈপুণ্য আর ডেভিড বেকহ্যামের লাল কার্ড—বিশ্বকাপের মঞ্চে এই দুই পরাশক্তির মুখোমুখি হওয়া মানেই ফুটবল ইতিহাসের পাতায় নতুন কোনো নাটকীয় গল্পের জন্ম হওয়া।
বিশ্বকাপের চলতি আসরে আবারও সেই রোমাঞ্চকর ক্ষণ সমাগত। আগামী বুধবার সেমিফাইনালের হাইভোল্টেজ ম্যাচে ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে মুখোমুখি হতে যাচ্ছে এই দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী। কাতার বিশ্বকাপের শিরোপাজয়ী আর্জেন্টিনা এবং ফুটবল সংস্কৃতির জনক ইংল্যান্ডের এই ম্যাচটিকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে উত্তেজনা তুঙ্গে উঠেছে।
বিশ্বকাপের মঞ্চে অতীতের পাঁচ দ্বৈরথ
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ফুটবল বিশ্বকাপে এ পর্যন্ত মোট পাঁচবার একে অপরের মুখোমুখি হয়েছে দল দুটি। প্রতিটি ম্যাচই কোনো না কোনো কারণে স্মরণীয় হয়ে আছে।
দুই দলের প্রথম দেখা হয়েছিল ১৯৬২ সালের চিলি বিশ্বকাপে। গ্রুপ পর্বের সেই ম্যাচে আর্জেন্টিনাকে ৩-১ ব্যবধানে অনায়াসে হারিয়েছিল ইংলিশরা। এর ঠিক পরের বিশ্বকাপেই, অর্থাৎ ১৯৬৬ সালে ইংল্যান্ডের ঘরের মাঠে কোয়ার্টার ফাইনালে আবারও মুখোমুখি হয় তারা। সেই ম্যাচে ১-০ ব্যবধানে জিতে সেমিফাইনালে যায় এবং শেষ পর্যন্ত একমাত্র বিশ্বকাপটি ঘরে তোলে ইংল্যান্ড। তবে ওই ম্যাচে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক আন্তোনিও রাতিনকে দেওয়া লাল কার্ড নিয়ে ম্যাচ শেষে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছিল।
সবচেয়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী ম্যাচটি মাঠে গড়ায় ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে। কোয়ার্টার ফাইনালের সেই ম্যাচে ইংল্যান্ডকে ২-১ ব্যবধানে হারায় আর্জেন্টিনা। ম্যাচের দুটি গোলই করেছিলেন ফুটবল ঈশ্বর দিয়েগো ম্যারাডোনা। প্রথম গোলটি ছিল ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত ‘হ্যান্ড অব গড’ বা ঈশ্বরের হাতের গোল। আর এর ঠিক চার মিনিট পর চারজন ডিফেন্ডার ও গোলরক্ষককে কাটিয়ে ম্যারাডোনা যে দ্বিতীয় গোলটি করেছিলেন, তা পরবর্তীতে ফিফা কর্তৃক ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’ বা শতাব্দীর সেরা গোল হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এই ম্যাচটি দুই দেশের মধ্যকার ফুটবল বৈরিতাকে এক অন্য মাত্রায় নিয়ে যায়।
১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপে শেষ ষোলোর লড়াইয়ে আবারও এই দুই পরাশক্তি মুখোমুখি হয়। নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময়ের খেলা ২-২ গোলে সমতায় শেষ হওয়ার পর টাইব্রেকারে ৪-৩ ব্যবধানে জয় পায় আলবিসেলেস্তেরা। এই ম্যাচটি তরুণ মাইকেল ওয়েনের একক প্রচেষ্টায় করা দুর্দান্ত গোল এবং আর্জেন্টিনার ডিয়েগো সিমিওনেকে ফাউল করে ডেভিড বেকহ্যামের লাল কার্ড দেখার ঘটনার জন্য চিরস্মরণীয় হয়ে আছে।
দুই দলের সর্বশেষ বিশ্বকাপ দেখা হয়েছিল ২০০২ সালের জাপান-দক্ষিণ কোরিয়া যৌথ বিশ্বকাপে। গ্রুপ পর্বের সেই ম্যাচে ১-০ ব্যবধানে জয় পায় থ্রি লায়নসরা। আগের বিশ্বকাপের খলনায়ক ডেভিড বেকহ্যাম পেনাল্টি থেকে গোল করে ইংল্যান্ডের জয় নিশ্চিত করেন এবং চার বছর আগের মধুর প্রতিশোধ নেন।
পরিসংখ্যান বনাম নকআউটের মনস্তত্ত্ব
বিশ্বকাপের সামগ্রিক পরিসংখ্যান বিবেচনা করলে ফলাফলের দিক থেকে কিছুটা এগিয়ে রয়েছে ইংল্যান্ড। পাঁচবারের দেখায় তারা সরাসরি জয় পেয়েছে ৩টি ম্যাচে। বিপরীতে আর্জেন্টিনা মূল সময়ের খেলায় জিতেছে মাত্র ১টি ম্যাচে এবং অন্য একটি ম্যাচের নিষ্পত্তি হয়েছে টাইব্রেকারে আর্জেন্টিনার পক্ষে। গোল করার ক্ষেত্রেও ইংল্যান্ড কিছুটা এগিয়ে, আর্জেন্টিনার ৫ গোলের বিপরীতে তারা করেছে ৭টি গোল।
তবে সাধারণ পরিসংখ্যানের বাইরে যদি নকআউট পর্বের মনস্তাত্ত্বিক লড়াই বিবেচনা করা হয়, তবে আর্জেন্টিনার পাল্লা বেশ ভারী। ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে হাই-প্রোফাইল দুটি নকআউট ম্যাচ—১৯৮৬ সালের কোয়ার্টার ফাইনাল এবং ১৯৯৮ সালের শেষ ষোলো—দুটিতেই শেষ হাসি হেসেছিল লাতিন আমেরিকার দেশটি। নকআউটের চাপ সামলানোর ক্ষেত্রে আর্জেন্টিনার এই অতীত ইতিহাস তাদের আগামী বুধবারের সেমিফাইনালে বাড়তি আত্মবিশ্বাস জোগাবে।
বুধবারের এই সেমিফাইনাল ম্যাচটি তাই কেবল চলতি বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠার লড়াই নয়; বরং এটি দুই ফুটবল পরাশক্তির ঐতিহাসিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের আরও একটি নতুন এবং রোমাঞ্চকর অধ্যায়।