আইসিডি ডিভাইসের কার্যকারিতা ও ক্রিস্টিয়ান এরিকসেনের জীবন রক্ষা

আন্তর্জাতিক ম্যাচ চলাকালে ডেনমার্কের তারকা ফুটবলার ক্রিস্টিয়ান এরিকসেন হঠাৎ মাঠে লুটিয়ে পড়লে তার বুকে পূর্বে স্থাপিত বিশেষ হৃদযন্ত্রের ডিভাইস ‘আইসিডি’ (ইমপ্লান্টেবল কার্ডিওভারটার ডিফিব্রিলেটর) দ্রুত সক্রিয় হয়। এই জীবনরক্ষাকারী প্রযুক্তির তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার কারণে তিনি বড় ধরনের বিপদ থেকে রক্ষা পেয়েছেন। বর্তমানে ৩৪ বছর বয়সী এই ডেনিশ মিডফিল্ডার পরিবারের সঙ্গে অবস্থান করছেন এবং সুস্থ হয়ে উঠছেন।

আইসিডি কী এবং এটি যেভাবে কাজ করে

আইসিডি (ইমপ্লান্টেবল কার্ডিওভার্টার ডিফিব্রিলেটর) হলো মানবদেহের ভেতরে স্থাপনযোগ্য ছোট আকারের একটি বিশেষ চিকিৎসা ডিভাইস। এটি মূলত হৃদযন্ত্রের ছন্দের ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি রাখে। হৃদযন্ত্রের স্পন্দনে কোনো বিপজ্জনক পরিবর্তন বা অস্বাভাবিকতা শনাক্ত করার সঙ্গে সঙ্গে এটি তা স্বাভাবিক করার জন্য সক্রিয় হয়ে ওঠে। চিকিৎসকদের মতে, আইসিডি কোনো হৃদরোগের স্থায়ী সমাধান বা নিরাময় নয়; বরং এটি একটি অত্যন্ত কার্যকর সুরক্ষামূলক ও প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা ব্যবস্থা।

এরিকসেনের সাম্প্রতিক শারীরিক জটিলতার ক্ষেত্রে ডিভাইসটি তার হৃদযন্ত্রের অস্বাভাবিক ও অত্যন্ত দ্রুত স্পন্দন (Arrhythmia) শনাক্ত করে। এরপর ডিভাইসটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি নিয়ন্ত্রিত বৈদ্যুতিক শক প্রদান করে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হৃদযন্ত্রের স্পন্দন আবার স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে আসে। ম্যানচেস্টার মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির স্পোর্টস কার্ডিওলজিস্ট অধ্যাপক অ্যানিল মালহোত্রা এই কার্যপদ্ধতিকে ব্যাখ্যা করে বলেন, “এটি অনেকটা কম্পিউটার বন্ধ (শাটডাউন) করে আবার নতুন করে চালু (রিবুট) করার মতো।” নিজের সুস্থতা ও ডিভাইসের কার্যকারিতা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এরিকসেন লিখেছেন, “আমার আইসিডি ঠিক যেভাবে কাজ করার জন্য তৈরি করা হয়েছিল, সেভাবেই আমাকে প্রয়োজনের মুহূর্তে সুরক্ষা দিয়েছে।”

২০২১ সালের ঘটনা ও এরিকসেনের অতীত ইতিহাস

ক্রিস্টিয়ান এরিকসেনের হৃদযন্ত্রের সমস্যা নতুন নয়। এর আগে ২০২১ সালে অনুষ্ঠিত উয়েফা ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপের ম্যাচ চলাকালে তিনি হঠাৎ কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে আক্রান্ত হয়ে মাঠের মধ্যেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। সে সময় মাঠে উপস্থিত চিকিৎসকদের দ্রুত তৎপরতা, কার্ডিওপালমোনারি রিসাসিটেশন (সিপিআর) এবং বহনযোগ্য ডিফিব্রিলেটরের (AED) সাহায্যে তার হৃদযন্ত্র পুনরায় সচল করা সম্ভব হয়েছিল। চিকিৎসকদের মতে, সেই দিন মাঠের তাৎক্ষণিক ব্যবস্থাপনাই তার প্রাণ বাঁচিয়েছিল। ওই ঘটনার পর চিকিৎসকদের পরামর্শে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে এরিকসেনের শরীরে স্থায়ীভাবে আইসিডি ডিভাইসটি স্থাপন করা হয়। পাঁচ বছর পর সাম্প্রতিক ম্যাচে যখন তার হৃদযন্ত্রের ছন্দে আবারও মারাত্মক সমস্যা দেখা দেয়, তখন এই ডিভাইসটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিস্থিতি সামাল দেয়।

ক্রীড়াবিদদের হৃদরোগের কারণ ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট

চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, ক্রীড়াবিদ বা সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে আকস্মিক হৃদরোগ বা কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের পেছনে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট কারণ থাকে। তরুণ ক্রীড়াবিদের ক্ষেত্রে এই ধরনের ঘটনা বিরল হলেও এটি ফুটবল ইতিহাসে একদম নজিরবিহীন নয়। এরিকসেনের পূর্বে ইংলিশ ক্লাব বোল্টনের ফুটবলার ফেব্রিস মুয়াম্বা মাঠে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে বেঁচে ফিরেছিলেন। তবে ক্যামেরুনের ফুটবলার মার্ক ভিভিয়ান ফো ম্যাচ চলাকালে মাঠেই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।

নিচে খেলোয়াড়দের হৃদরোগের মূল কারণ এবং মাঠে ঘটে যাওয়া উল্লেখযোগ্য কয়েকটি ঘটনার বিবরণ টেবিল আকারে উপস্থাপন করা হলো:

হৃদরোগের সম্ভাব্য মূল কারণসমূহমাঠে হৃদরোগে আক্রান্ত উল্লেখযোগ্য খেলোয়াড়ঘটনার পরিণতি ও বর্তমান স্থিতি

১. হৃদযন্ত্রের বৈদ্যুতিক সংকেতের ত্রুটি

 

২. হৃদপেশির প্রদাহ (Myocarditis)

 

৩. হৃদযন্ত্রের গঠনগত সমস্যা বা কার্ডিওমায়োপ্যাথি

 

৪. বংশগত বা জেনেটিক কারণ

 

৫. সংক্রমণ বা ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

ক্রিস্টিয়ান এরিকসেন (ডেনমার্ক)২০২১ ও ২০২৬ সালে আক্রান্ত; আইসিডি ডিভাইসের সহায়তায় বর্তমানে সুস্থ।
ফেব্রিস মুয়াম্বা (কঙ্গো/যুক্তরাজ্য)২০১২ সালে মাঠে আক্রান্ত; চিকিৎসকদের প্রচেষ্টায় বেঁচে যান ও অবসর নেন।
মার্ক ভিভিয়ান ফো (ক্যামেরুন)২০০৩ সালে কনফেডারেশন কাপের ম্যাচ চলাকালে আক্রান্ত ও দুর্ভাগ্যবশত মৃত্যু।

আইসিডি নিয়ে খেলাধুলার নিয়ম ও ভবিষ্যৎ

চিকিৎসা গবেষণায় দেখা গেছে, যথাযথ সতর্কতা এবং হৃদরোগ বিশেষজ্ঞদের নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও পরামর্শ মেনে অনেক খেলোয়াড় আইসিডি নিয়েই পুনরায় পেশাদার খেলাধুলায় অংশ নিতে পারেন। বর্তমান চিকিৎসা ব্যবস্থায় বিশেষজ্ঞরা খেলোয়াড়দের সঙ্গে এর ঝুঁকি ও সুবিধা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ওপর জোর দেন।

তবে এই বিষয়ে বিভিন্ন দেশের ফুটবল ফেডারেশনের আইন ও নীতিমালায় ভিন্নতা রয়েছে। যেমন ইতালির চিকিৎসা প্রবিধান ও আইন অনুযায়ী, শরীরে আইসিডি স্থাপন করা কোনো ফুটবলারকে অপেশাদার কিংবা পেশাদার—কোনো পর্যায়ের প্রতিযোগিতামূলক ফুটবল ম্যাচেই অংশ নিতে দেওয়া হয় না। এরিকসেন ভবিষ্যতে পুনরায় পেশাদার ফুটবল মাঠে ফিরবেন কি না, তা এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। তার ফুটবল ক্যারিয়ারের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের পূর্বে চিকিৎসকদের নিশ্চিত হতে হবে যে সাম্প্রতিক ম্যাচে ঠিক কী কারণে তার হৃদযন্ত্রের ছন্দ আকস্মিক বদলে গিয়েছিল এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে কী কী দীর্ঘমেয়াদী ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।

আকস্মিক কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান

যুক্তরাজ্যের একটি শীর্ষস্থানীয় দাতব্য সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশটিতে প্রতি সপ্তাহে ৩৫ বছরের কম বয়সী প্রায় ১২ জন মানুষ আকস্মিক কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারান। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক তথ্য হলো, এই ধরনের আক্রান্তদের মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রে পূর্বে কোনো দৃশ্যমান লক্ষণ বা উপসর্গ প্রকাশ পায় না। হৃদরোগ বিশেষজ্ঞরা তাই খেলাধুলার জগতে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে নিয়মিত উন্নত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও আধুনিক জীবনরক্ষাকারী প্রযুক্তির ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করছেন। ক্রিস্টিয়ান এরিকসেনের এই সাম্প্রতিক ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, সঠিক সময়ে সঠিক প্রযুক্তির ব্যবহার মানবজীবন বাঁচাতে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

Leave a Comment