বিশ্বকাপ ফুটবলের সুদীর্ঘ ইতিহাসে বিভিন্ন সময়ে ভাইদের একসঙ্গে খেলার নজির তৈরি হয়েছে। তবে একই বিশ্বকাপে ভিন্ন ভিন্ন দেশের জার্সি গায়ে ভাইয়ে ভাইয়ে মাঠের লড়াইয়ের দৃশ্য ফুটবল ইতিহাসে বিরল। ঐতিহাসিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বকাপের মঞ্চে এখন পর্যন্ত কেবল এক জোড়া ভাই-ই একে অপরের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন, তারা হলেন জেরোম বোয়াটেং এবং কেভিন-প্রিন্স বোয়াটেং। ২০১০ সালের বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে জার্মানি ও ঘানা মুখোমুখি হলে জার্মানির হয়ে মাঠে নামেন ছোট ভাই জেরোম বোয়াটেং এবং ঘানার প্রতিনিধিত্ব করেন বড় ভাই কেভিনের-প্রিন্স বোয়াটেং। সেই ম্যাচে জার্মানি ১-০ ব্যবধানে জয়লাভ করে। এর চার বছর পর, ২০১৪ সালের বিশ্বকাপেও এই দুই দল এবং দুই ভাই পুনরায় গ্রুপ পর্বে মুখোমুখি হন, যে ম্যাচটি ২-২ গোলে ড্র হয়েছিল।
চলতি বিশ্বকাপের ‘সাড়ে সাত জোড়া’ ভাই ও দলীয় বিন্যাস
চলতি বিশ্বকাপে মোট আট জোড়া ভাইয়ের অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। তবে নেদারল্যান্ডস জাতীয় দলের ডিফেন্ডার জুরিয়েন টিম্বার কুঁচকির চোটের কারণে বিশ্বকাপ স্কোয়াড থেকে ছিটকে যাওয়ায় এই সংখ্যাটি এখন ‘সাড়ে সাত জোড়া’ ভাইয়ের উপস্থিতিতে রূপ নিয়েছে। এই সাড় সাত জোড়া ভাইয়ের মধ্যে চার জোড়া ভাই একই দেশের হয়ে এবং বাকি চার জোড়া ভাই (যার মধ্যে একজন চোটাক্রান্ত) ভিন্ন ভিন্ন দেশের জাতীয় দলের হয়ে খেলছেন।
একই দেশের হয়ে খেলা ভাইদের মধ্যে রয়েছেন ফ্রান্সের থিও হার্নান্দেজ ও লুকাস হার্নান্দেজ। বিশ্বকাপের নবাগত দল কুরাসাও-এর স্কোয়াডে রয়েছেন লিয়ান্দ্রো বাকুনা ও জুনিনিও বাকুনা। অপর নবাগত দল কেপ ভার্দের হয়ে খেলছেন লারোস দুয়ার্তে ও দেরয় দুয়ার্তে। অন্যদিকে, নেদারল্যান্ডস দলে কুইনটেন টিম্বারের সঙ্গে তার ভাই জুরিয়েন টিম্বারার থাকার কথা থাকলেও চোটের কারণে কুইনটেন একাই প্রতিনিধিত্ব করছেন।
ভিন্ন ভিন্ন দেশের হয়ে খেলা চার জোড়া ভাই
চলতি আসরের অন্যতম আকর্ষণীয় দিক হলো ভিন্ন দেশের হয়ে খেলা চার জোড়া ভাই। এদের পারিবারিক ও জাতীয় দলের বিন্যাস নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. দেজিরে দুয়ে ও গুয়েলা দুয়ে: এই দুই ভাইয়ের জন্ম ফ্রান্সে হলেও বড় ভাই গুয়েলা দুয়ে তার বাবার জন্মভূমি আইভরিকোস্ট জাতীয় দলকে বেছে নিয়েছেন। অন্যদিকে ছোট ভাই দেজিরে দুয়ে খেলছেন ফ্রান্সের হয়ে। বিশ্বকাপের প্রস্তুতি ম্যাচে এই দুই দল মুখোমুখি হয়েছিল, যেখানে ফ্রান্স ২-১ গোলে জয়ী হয় এবং আইভরিকোস্টের হয়ে গুয়েলা দুয়ে গোল করেন।
২. ইনাকি উইলিয়ামস ও নিকো উইলিয়ামস: স্পেনের বাস্ক প্রদেশে জন্ম নেওয়া এই দুই ভাইয়ের মধ্যে ৩২ বছর বয়সী বড় ভাই ইনাকি উইলিয়ামস খেলছেন বাবা-মায়ের জন্মভূমি ঘানার হয়ে। অপরদিকে ২৩ বছর বয়সী ছোট ভাই নিকো উইলিয়ামস স্পেনের জাতীয় দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য।
৩. ডেরিক লাকাসেন ও ব্রায়ান ব্রবি: ঘানার সেন্টারব্যাক ডেরিক লাকাসেনের ভাই ব্রায়ান ব্রবি খেলছেন নেদারল্যান্ডস দলের ব্যাকআপ স্ট্রাইকার হিসেবে। এই দুই ভাইয়ের মা একই হলেও তাদের বাবা ভিন্ন।
৪. হ্যারি সউতার ও জন সউতার: স্কটল্যান্ডের অ্যাবেরডিনে জন্ম নেওয়া এই দুই ভাইয়ের মা অস্ট্রেলিয়ান। বড় ভাই জন সউতার খেলছেন স্কটল্যান্ডের হয়ে এবং সাত বছর আগে অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকত্ব পাওয়া ছোট ভাই হ্যারি সউতার খেলছেন অস্ট্রেলিয়ার রক্ষণভাগে।
নিচে চলতি বিশ্বকাপের ‘সাড়ে সাত জোড়া’ ভাইয়ের দলগত বিন্যাস এবং বর্তমান স্থিতি একটি টেবিলের মাধ্যমে প্রদর্শন করা হলো:
| ভাইদের নাম | দেশের নাম (একই দল) | দেশের নাম (আলাদা দল) | বর্তমান স্থিতি ও মন্তব্য |
| থিও হার্নান্দেজ ও লুকাস হার্নান্দেজ | ফ্রান্স | — | উভয়ই ফ্রান্সের মূল স্কোয়াডে রয়েছেন। |
| লিয়ান্দ্রো বাকুনা ও জুনিনিও বাকুনা | কুরাসাও | — | কুরাসাও দলের হয়ে বিশ্বকাপে অভিষেক হতে যাচ্ছে। |
| লারোস দুয়ার্তে ও দেরয় দুয়ার্তে | কেপ ভার্দে | — | কেপ ভার্দে দলের হয়ে বিশ্বকাপে খেলছেন। |
| কুইনটেন টিম্বার ও জুরিয়েন টিম্বার | নেদারল্যান্ডস | — | জুরিয়েন টিম্বার চোটের কারণে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে গেছেন। |
| দেজিরে দুয়ে ও গুয়েলা দুয়ে | — | ফ্রান্স ও আইভরিকোস্ট | দেজিরে খেলছেন ফ্রান্সে, গুয়েলা খেলছেন আইভরিকোস্টে। |
| ইনাকি উইলিয়ামস ও নিকো উইলিয়ামস | — | ঘানা ও স্পেন | ইনাকি ঘানার হয়ে এবং নিকো স্পেনের হয়ে খেলছেন। |
| ডেরিক লাকাসেন ও ব্রায়ান ব্রবি | — | ঘানা ও নেদারল্যান্ডস | ডেরিক ঘানার ডিফেন্ডার, ব্রবি নেদারল্যান্ডসের স্ট্রাইকার। |
| জন সউতার ও হ্যারি সউতার | — | স্কটল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া | জন স্কটল্যান্ডের এবং হ্যারি অস্ট্রেলিয়ার স্কোয়াডে আছেন। |
অভিবাসন ও আফ্রিকান ফুটবলের নতুন দিগন্ত
১১ জুন থেকে শুরু হতে যাওয়া বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের অফিশিয়াল সূচি অনুযায়ী, এই আসরের গ্রুপ পর্যায়ে ভাইয়ে ভাইয়ে সরাসরি মাঠের লড়াইয়ের কোনো সুযোগ নেই। তবে ইউরোপে বিগত কয়েক দশকের অভিবাসনের জোয়ার আফ্রিকান দেশগুলোর ফুটবলে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। প্রবাসী বংশোদ্ভূত ইউরোপীয় ফুটবলারদের নিজেদের জাতীয় দলে অন্তর্ভুক্ত করার কারণে আলজেরিয়া, কেপ ভার্দে, ডিআর কঙ্গো, মরক্কো, সেনেগাল এবং তিউনিসিয়ার মতো দলগুলোর ২৬ সদস্যের বিশ্বকাপ স্কোয়াডে এখন নিজ দেশে জন্ম নেওয়া খেলোয়াড়দের চেয়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে জন্ম নেওয়া খেলোয়াড়দের সংখ্যাই বেশি দেখা যাচ্ছে।
