আতশি কাচের নিচে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল

বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স ও সিদ্ধান্তগুলো এখন বিসিবির (বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড) ঘনিষ্ঠ পর্যবেক্ষণের আওতায় এসেছে। আফগানিস্তানের বিপক্ষে টি–টোয়েন্টি সিরিজ থেকে শুরু করে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সাম্প্রতিক ওয়ানডে সিরিজ পর্যন্ত—প্রতিটি বিতর্কিত সিদ্ধান্তের বিশদ পর্যালোচনা করার উদ্যোগ নিয়েছে বোর্ড। এরই মধ্যে দায়িত্বশীল সূত্রগুলো জানিয়েছে, এসব বিষয়ে কোচ, অধিনায়ক, নির্বাচক ও টিম ম্যানেজমেন্টের ব্যাখ্যা চাওয়া হবে।

নুরুল হাসানের উইকেটকিপিং না করা নিয়ে প্রশ্ন

একজন বিসিবি পরিচালক বলেন,

“সোহান (নুরুল হাসান) দলের সেরা উইকেটকিপার। সে দলে ছিল, ইনজুরিও ছিল না, তবুও কেন কিপিং করল না? সিদ্ধান্তটা কার?”

এই প্রশ্ন ঘিরেই নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে শারজায় অনুষ্ঠিত আফগানিস্তানের বিপক্ষে টি–টোয়েন্টি সিরিজ। তিন ম্যাচের সিরিজেই দলে থাকা সত্ত্বেও নুরুল হাসান উইকেটকিপিং না করে দায়িত্ব পালন করেন জাকের আলি।

বিসিবি সূত্র জানিয়েছে, লিটন দাস চোটে পড়ায় ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক হন জাকের আলি। তিনি মনে করেছিলেন, স্টাম্পের পেছন থেকে মাঠে অবস্থান নিলে দলের নিয়ন্ত্রণ রাখতে সুবিধা হবে। তাই নিজের উদ্যোগেই কিপিং করেন তিনি। অথচ দলের সিনিয়র সহকারী কোচ মোহাম্মদ সালাউদ্দিন এ সিদ্ধান্তের বিপক্ষে ছিলেন। সালাউদ্দিন প্রধান কোচ ফিল সিমন্সকে অনুরোধ করেছিলেন জাকেরকে সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের কথা বলতে, কিন্তু সিমন্স অধিনায়কের সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করতে রাজি হননি।

ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজেও সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন

আফগানিস্তানের বিপক্ষে সিরিজ জিতলেও জাকেরের কিপিং সিদ্ধান্তে বিসিবির শীর্ষ পর্যায়ে ভ্রু কুঁচকে যায়। পরবর্তীতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজেও কিছু সিদ্ধান্ত আলোচনায় আসে।

দ্বিতীয় ওয়ানডে ম্যাচটি সুপার ওভারে গড়ায়। শেষ ওভারে ৫ রান দরকার ছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজের, অথচ বোলিং দেওয়া হয় পার্ট–টাইম স্পিনার সাইফ হাসানকে। মিরপুরের স্পিনসহায়ক উইকেটে চারজন বিশেষজ্ঞ স্পিনার খেলিয়েও অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ তাঁদের বোলিং কোটার সব ব্যবহার করে ফেলেছিলেন ৪৮তম ওভারেই। ফলে শেষ ওভারে সাইফের হাতে বল তুলে দিতে হয়, যা নিয়ে এখন প্রশ্ন তুলছে বোর্ড।

আরও বিস্ময়কর, সাইফই কিন্তু গত মাসে আবুধাবিতে আফগানিস্তানের বিপক্ষে তৃতীয় ওয়ানডেতে ৪ ওভারে মাত্র ৬ রান দিয়ে ৩ উইকেট নিয়েছিলেন। তবুও ৩৮তম ওভারের পর তাঁকে আর বোলিংয়ে না আনার সিদ্ধান্তও বোর্ডের তদন্তের আওতায় আসছে।

অন্যদিকে, ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে টাই ম্যাচে রিশাদ হোসেনকে ৯ নম্বরে নামানো নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ১৪ বলে ৩৯ রানের ঝড়ো ইনিংস খেলে রিশাদ প্রমাণ করেছিলেন, তাঁকে আগে নামালে ম্যাচের ফল ভিন্ন হতে পারত।

বিসিবির নতুন পর্যবেক্ষণ কাঠামো

বোর্ডের ভেতরে এখন এক অলিখিত নীতিমালা কার্যকর হয়েছে—জাতীয় দলের প্রতিটি সিদ্ধান্তে নজর রাখবেন পরিচালনা পর্ষদের চার সাবেক ক্রিকেটার। তাঁরা হলেন—বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম, সহসভাপতি ফারুক আহমেদ, এবং দুই পরিচালক খালেদ মাসুদআবদুর রাজ্জাক

বিসিবির এক পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,

“জাতীয় দলের বর্তমান অবস্থা একেবারে লেজেগোবরে। এখন সময় এসেছে তাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ধরন ও যুক্তি বোঝার। কোচ, অধিনায়ক, নির্বাচকদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলে পুরো প্রক্রিয়াটি বিশ্লেষণ করতে হবে। প্রয়োজনে নির্বাচক কমিটির কার্যক্রমও পুনর্বিবেচনা করা হবে।”

বাংলাদেশ দল আফগানিস্তান ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজে মাঝারি ফল পেলেও, পর্দার আড়ালের এসব সিদ্ধান্ত এখন বোর্ডের তদন্ত টেবিলে। ক্রিকেটপ্রেমীরা তাই অপেক্ষায়—আতশি কাচে দেখা এই মূল্যায়ন থেকে উঠে আসবে কি দলের সিদ্ধান্ত গ্রহণের নতুন স্বচ্ছ রূপরেখা?

Leave a Comment