ফুটবল বিশ্বকাপের ‘জি’ গ্রুপের ম্যাচে এক অবিশ্বাস্য ও রোমাঞ্চকর লড়াইয়ের সাক্ষী হলো ক্রীড়াবিশ্ব। লস অ্যাঞ্জেলেসের সোফি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত অত্যন্ত তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এই ম্যাচে শক্তিশালী বেলজিয়ামকে রুখে দিয়েছে ইরান। আক্রমণ ও পাল্টা-আক্রমণে ঠাসা ম্যাচটি শেষ পর্যন্ত ০-০ গোলে ড্র হয়। ম্যাচের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বেলজিয়ামের তারকা ফুটবলাররা মাঠের দখল এবং বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে মুহুর্মুহু আক্রমণ চালালেও ইরানের ইস্পাতকঠিন রক্ষণভাগ এবং গোলরক্ষকের বীরত্বে তারা গোলের দেখা পাননি। এই ড্রয়ের ফলে দুই ম্যাচ শেষে ২ পয়েন্ট নিয়ে টেবিলের সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে ইরান।
Table of Contents
ম্যাচের পরিসংখ্যান ও গোলরক্ষকদের বীরত্ব
পুরো ম্যাচ জুড়েই বেলজিয়াম একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার করে খেলেছে। তারা ইরানের গোলপোস্ট লক্ষ্য করে সর্বমোট ২৩টি শট নেয়, যার মধ্যে ৭টি শটই ছিল সম্পূর্ণ লক্ষ্যে। কিন্তু ইরানের গোলরক্ষক আলীরেজা বেইরানভান্দ প্রাচীরের মতো দাঁড়িয়ে বেলজিয়ামের সমস্ত প্রচেষ্টা নস্যাৎ করে দেন। তিনি একাই নিশ্চিত ৭টি গোল প্রতিহত বা সেভ করেন।
অন্যদিকে ইরানের রক্ষণভাগ কেভিন ডি ব্রুইনা, রোমেলু লুকাকু এবং জেরেমি ডোকুর মতো বিশ্বখ্যাত তারকা সমৃদ্ধ বেলজিয়ামের আক্রমণভাগকে পুরো ৯০ মিনিট জুড়ে বোতলবন্দী করে রাখতে সক্ষম হয়। ম্যাচে দুই দলের ফুটবলাররাই বল জালে জড়িয়েছিলেন, কিন্তু রেফারি ও প্রযুক্তির নিয়মে তা বাতিল হয়ে যায়। ইরান একবার বল জালে পাঠালেও তা অফসাইডের কারণে বাতিল করা হয়। অন্যদিকে, বেলজিয়ামের করা দুটি গোলও ভিডিও সহকারী রেফারি এবং অফসাইডের কঠোর নিয়মে বাতিল হয়ে যায়।
প্রথমার্ধ ও দ্বিতীয়ার্ধের উত্তেজনাপূর্ণ মুহূর্ত
ম্যাচের শুরুতেই খেলার স্রোতের বিপরীতে গিয়ে ইরান একটি চমৎকার আক্রমণ শাণায়। দলের ডিফেন্ডার হোসেইন কানানি ডি-বক্সের ভেতর ঘুরে দাঁড়িয়ে গোলপোস্টের নিচের কোণ লক্ষ্য করে দুর্দান্ত একটি জোরালো শট নেন। বলটি নিশ্চিতভাবেই জালের ভেতরে প্রবেশ করছিল, কিন্তু বেলজিয়ামের তারকা গোলরক্ষক থিবো কোর্তোয়া অসাধারণ ক্ষিপ্রতায় নিজের ডান দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে সেটি ঠেকিয়ে দেন। কোর্তোয়ার এই অবিশ্বাস্য সেভে নিশ্চিত গোল থেকে বঞ্চিত হয় ইরান।
ম্যাচের ২৪ মিনিটে ইরান একটি অত্যন্ত কৌশলী ফ্রি-কিক থেকে বেলজিয়ামের জালে বল প্রবেশ করাতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু লাইন্সম্যান অফসাইডের পতাকা তোলায় সেই গোলটি বাতিল ঘোষণা করা হয়। ফলে প্রথমার্ধের খেলা গোলশূন্য সমতায় শেষ হয়।
দ্বিতীয়ার্ধের খেলা শুরু হওয়ার পর দুই দলের আক্রমণ আরও তীব্র হয়। ৫৩ মিনিটে বেলজিয়ামের গোলপোস্টের কাছে ডি-বক্সের ভেতর বল পান ইরানের তারকা ফুটবলার মেহদি তারেমি। তিনি অত্যন্ত দ্রুততার সাথে ঘুরে দাঁড়িয়ে একটি জোরালো শট নেন, তবে রিয়াল মাদ্রিদের এই অভিজ্ঞ গোলরক্ষক কোর্তোয়া আবারও তাঁর অবিশ্বাস্য দক্ষতায় সেই শটটি রুখে দিয়ে দলকে রক্ষা করেন।
ম্যাচের ৬০ মিনিটে বেলজিয়াম একটি বড় সুযোগ সৃষ্টি করে। ইরানের রক্ষণভাগের দুর্গে কয়েক দফা খেলোয়াড়দের গায়ে লেগে বল এদিক-ওদিক ছিটকে পড়ার পর তা গিয়ে পড়ে বেলজিয়ামের ম্যাক্সিম ডি কুইপারের সামনে। তিনি গোলমুখ লক্ষ্য করে একটি অত্যন্ত জোরালো শট নেন। কিন্তু এবার ইরানের গোলরক্ষক বেইরানভান্দ নিজের অবিশ্বাস্য দক্ষতায় হাত ছুঁইয়ে বলটি মাঠের বাইরে পাঠিয়ে দেন এবং বেলজিয়াম নিশ্চিত গোল থেকে বঞ্চিত হয়।
লাল কার্ডের ধাক্কা ও ম্যাচের শেষ দিক
ম্যাচের ৬৬তম মিনিটে বেলজিয়াম দল একটি বড় ধাক্কার সম্মুখীন হয়। দলের ডিফেন্ডার নাথান এনগয় সরাসরি লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন। বলটি মূলত এনগয়ের নিয়ন্ত্রণেই ছিল এবং ইরানের মেহদি তারেমি তখন প্রায় ১০ গজ দূরে অবস্থান করছিলেন। এনগয় প্রথমে বলটি নিয়ন্ত্রণে নিলেও পরবর্তী সময়ে আরেকটি স্পর্শ বা টাচ নিতে গিয়ে সামান্য দেরি করে ফেলেন। এই সুবর্ণ সুযোগে তারেমি অত্যন্ত দ্রুত গতিতে ছুটে এসে বলের দখল নেন। তাঁকে গোলমুখে এগিয়ে যাওয়া থেকে আটকাতে গিয়ে এনগয় পিছন থেকে তারেমির জার্সি টেনে ধরেন। পরিস্থিতি বিবেচনা করে রেফারি তাঁকে সরাসরি লাল কার্ডের সিদ্ধান্ত প্রদান করেন।
১০ জনের দলে পরিণত হওয়ার পরও বেলজিয়াম আক্রমণ অব্যাহত রাখে। নির্ধারিত সময়ের খেলা শেষ হওয়ার ঠিক চার মিনিট আগে, অর্থাৎ ৮৬ মিনিটে আরও একটি চমৎকার সেভ করেন ইরানের গোলরক্ষক বেইরানভান্দ। আবারও বেলজিয়ামের ডি কাইপারের একটি জোরালো শট অত্যন্ত চমৎকারভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে আটকে দেন তিনি। ফলে ম্যাচের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কোনো দলই অচলাবস্থা বা ডেডলক ভাঙতে পারেনি।
ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান ও ঘটনাবলী
| ম্যাচের সময় (মিনিট) | দলের নাম | ঘটনার বিবরণ | ফলাফল |
| শুরুতেই | ইরান | হোসেইন কানানির জোরালো শট থিবো কোর্তোয়া কর্তৃক প্রতিহত। | গোল হয়নি |
| ২৪ মিনিট | ইরান | কৌশলী ফ্রি-কিক থেকে বল জালে জড়ানো। | অফসাইডের কারণে বাতিল |
| ৫৩ মিনিট | ইরান | মেহদি তারেমির জোরালো শট কোর্তোয়া কর্তৃক সেভ। | গোল হয়নি |
| ৬০ মিনিট | বেলজিয়াম | ম্যাক্সিম ডি কুইপারের শট বেইরানভান্দ কর্তৃক রক্ষা। | গোল হয়নি |
| ৬৬ মিনিট | বেলজিয়াম | নাথান এনগয় কর্তৃক মেহদি তারেমির জার্সি টেনে ধরা। | সরাসরি লাল কার্ড |
| ৮৬ মিনিট | বেলজিয়াম | ডি কাইপারের জোরালো শট বেইরানভান্দ কর্তৃক প্রতিহত। | গোল হয়নি |
গ্রুপ পর্বের বর্তমান সমীকরণ ও ভবিষ্যৎ সূচি
চলতি ফুটবল আসরে দুটি ম্যাচসহ নিজেদের সবশেষ চারটি বিশ্বকাপে জয়হীন রইল বেলজিয়াম। এই চার ম্যাচে তাদের পরিসংখ্যান হলো ৩টি ড্র এবং ১টি পরাজয়। তারা মিশরের বিপক্ষে ১-১ গোলে ড্র করে এবারের বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করেছিল। অন্যদিকে, এশিয়ার প্রতিনিধি ইরানও এবার তাদের প্রথম দুটি ম্যাচেই ড্র করল। নিজেদের প্রথম ম্যাচে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে দুইবার পিছিয়ে পড়েও তারা ২-২ গোলের সমতায় ম্যাচ শেষ করেছিল।
বর্তমানে ‘জি’ গ্রুপে দুটি করে ম্যাচ শেষে ২ পয়েন্ট নিয়ে গোল ব্যবধান বা অন্য সমীকরণে টেবিলের শীর্ষে অবস্থান করছে ইরান। সমান ২ পয়েন্ট নিয়ে তালিকার দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে বেলজিয়াম। অন্যদিকে, এক ম্যাচ করে খেলা নিউজিল্যান্ড ও মিশরের সংগ্রহ ১ পয়েন্ট করে। গ্রুপ পর্বের শেষ রাউন্ডের ম্যাচে আগামী শনিবার সকালে নিউজিল্যান্ডের মুখোমুখি হবে বেলজিয়াম এবং একই সময়ে মিশরের বিরুদ্ধে মাঠে নামবে ইরান। ফুটবল ইতিহাসে ইরান এর আগে কখনও বিশ্বকাপের নকআউট বা পরবর্তী পর্বে উঠতে পারেনি, তবে এবার তাদের সামনে সেই ঐতিহাসিক সম্ভাবনা বেশ ভালোভাবেই টিকে রয়েছে।
