ফুটবল বিশ্বকাপের ‘জি’ গ্রুপে এক অবিস্মরণীয় কীর্তি স্থাপন করেছে আফ্রিকা মহাদেশের অন্যতম পরাশক্তি মিশর। গ্রুপ পর্বের এক শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচে নিউজিল্যান্ডকে ৩-১ গোলের ব্যবধানে পরাজিত করে নিজেদের ফুটবল ইতিহাসে এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় রচনা করল মোহামেদ সালাহর দল। বিশ্বমঞ্চে এটিই মিশরের ইতিহাসের সর্বপ্রথম ম্যাচ জয়। এই ঐতিহাসিক জয়ের ফলে তারা শক্তিশালী বেলজিয়ামকে পয়েন্ট তালিকায় পেছনে ফেলে নিজেদের গ্রুপের শীর্ষস্থান দখল করেছে।
Table of Contents
প্রথমার্ধের লড়াই ও কিউইদের স্বপ্ন
ম্যাচের শুরুটা মিশরের জন্য মোটেও আশাব্যঞ্জক ছিল না। খেলার মাত্র ১৫ মিনিটে একটি নিখুঁত কর্নার থেকে উড়ে আসা বলে চমৎকারভাবে মাথা ছুঁইয়ে গোল করেন নিউজিল্যান্ডের ফিন সারম্যান। এই আকস্মিক গোলে ১-০ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ে মিশর। প্রথমার্ধের বাকি সময়ে মিশর সমতা ফেরানোর চেষ্টা করলেও নিউজিল্যান্ডের রক্ষণভাগ সুরক্ষিত থাকে এবং এই ১-০ ব্যবধানের অগ্রগতি নিয়েই বিরতিতে যায় কিউইরা। প্রথমার্ধ শেষে নিউজিল্যান্ডও এক ঐতিহাসিক জয়ের দুয়ারে দাঁড়িয়ে ছিল, কারণ বিশ্বকাপের ইতিহাসে এর আগে তারা কখনো কোনো ম্যাচ জিততে পারেনি।
দ্বিতীয়ার্ধে মিশরের রাজকীয় প্রত্যাবর্তন ও সালাহ-জাদু
দ্বিতীয়ার্ধের খেলা শুরু হতেই ম্যাচের সমস্ত সমীকরণ বদলে দেয় মিশর। আক্রমণের ধার বাড়িয়ে দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই মিশরের পক্ষে প্রথম সমতা ফেরান মোস্তাফা জিকো। নিউজিল্যান্ডের গোলরক্ষক ম্যাক্স ক্রকম্বে প্রথম দফায় শটটি ঠেকিয়ে দিলেও বলটি তাঁর হাতে লেগে শেষ পর্যন্ত জালে জড়িয়ে যায় এবং স্কোরলাইন হয় ১-১।
ম্যাচে সমতা আসার পর শুরু হয় মিশরের তারকা ফুটবলার মোহামেদ সালাহর জাদুকরী প্রদর্শন। ম্যাচের শুরু থেকেই নিউজিল্যান্ডের দুজন রক্ষণভাগের খেলোয়াড় সালাহকে কড়া পাহারায় আটকে রেখেছিলেন এবং তাঁর পাস দেওয়ার পথগুলোও বন্ধ করে দিয়েছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত এই তারকা ফুটবলার নিজের চেনা ছন্দে ফিরে আসেন। সতীর্থ জিকোর বাড়িয়ে দেওয়া বলটি বক্সের ভেতর পেয়ে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডার ও গোলরক্ষককে ফাঁকি দিয়ে জালে জড়ান সালাহ। এই গোলের মাধ্যমে মিশর ম্যাচে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে যায়।
ত্রেজেগের অন্তিম গোল ও নিশ্চিত জয়
দুই গোলে পিছিয়ে পড়ার পর নিউজিল্যান্ড ম্যাচ বাঁচাতে মরিয়া হয়ে ওঠে। একটি গোল পরিশোধের জন্য তারা হন্যে হয়ে মুহুর্মুহু আক্রমণ চালাতে থাকে। তবে মিশরের সুসংহত রক্ষণভাগ অত্যন্ত দক্ষতার সাথে নিউজিল্যান্ডের সেই সমস্ত আক্রমণ প্রতিহত করে দেয়।
ম্যাচের শেষ দিকে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নামেন মাহমুদ হাসান ত্রেজেগে। মাঠে নামার মাত্র দুই মিনিটের মধ্যে নিজের পায়ের তৃতীয় ছোঁয়াতেই এক দুর্দান্ত গোল করেন তিনি। ত্রেজেগের এই গোলের ফলে নিউজিল্যান্ডের ম্যাচ ফেরার সমস্ত আশা শেষ হয়ে যায় এবং ম্যাচের চূড়ান্ত ফলাফল নির্ধারিত হয় ৩-১ ব্যবধানে।
ম্যাচের গোল ও গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের বিবরণী
| সময় (মিনিট/অর্ধ) | গোলদাতা খেলোয়াড় | দলের নাম | গোলের সংক্ষিপ্ত বিবরণ |
| ১৫ মিনিট | ফিন সারম্যান | নিউজিল্যান্ড | কর্নার থেকে চমৎকার হেডের সাহায্যে গোল। |
| দ্বিতীয়ার্ধ | মোস্তাফা জিকো | মিশর | গোলরক্ষকের হাতে লেগে বল জালে জড়ায়। |
| দ্বিতীয়ার্ধ | মোহামেদ সালাহ | মিশর | জিকোর পাস থেকে ডিফেন্ডার ও গোলরক্ষককে ফাঁকি দিয়ে গোল। |
| শেষ দিকে | মাহমুদ হাসান ত্রেজেগে | মিশর | বদলি হিসেবে নেমে মাত্র দুই মিনিটে তৃতীয় ছোঁয়ায় গোল। |
৯২ বছরের অপেক্ষার অবসান
এই জয়ের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ৯২ বছরের এক আক্ষেপ ও অপেক্ষার অবসান ঘটাল মিশর। এর আগে ১৯৩৪ সালের বিশ্বকাপে হাঙ্গেরির বিপক্ষে এক ম্যাচে জোড়া গোল করার কীর্তি স্থাপন করেছিল দলটি, তবে সেই ম্যাচে তারা জয়লাভ করতে পারেনি। ১৯৩৪ সালের পর বিশ্বকাপে তারা বারবার অংশ নিলেও আর কখনো কোনো একক ম্যাচে দুটি গোল করতে সক্ষম হয়নি মিশর। আজ সালাহ, জিকো এবং ত্রেজেগের কল্যাণে দীর্ঘ ৯২ বছর পর সেই কীর্তি পুনরায় গড়ার পাশাপাশি বিশ্বকাপের মঞ্চে নিজেদের ইতিহাসের প্রথম জয়টি তুলে নিল মিশর।
