কারাতে খেলার আইন কানুন আইন কানুন নিয়ে আজকের আয়োজন। আপনারা জানে খেলাধুলার আইন নিয়ে আমরা দীর্ঘ সিরিজ করছি। এবার কারাতে বা ক্যারাটে। জুডোর মত ক্যারাটে খেলাও একটি জনপ্রিয় খেলা। এই খেলা শুধুমাত্র আত্মরক্ষামূলক নয়, এই খেলার লক্ষ্য হলো প্রতিপক্ষের আক্রমণ প্রতিহত করাসহ পান্টা প্রতিঘাত করে শত্রুকে কাহিল করা। এই খেলার জন্য খোলোয়াড়দের যথেষ্ট পরিমাণে শারীরিক শক্তি অর্জন করতে হয়। শরীর হলো এই খেলার মূল অস্ত্র। এই খেলায় খেলোয়াড়েরা কোন রকম অস্ত্র ব্যবহার করেন না। অর্থাৎ প্রতিযোগীকে খালি হাতে লড়তে হয়। খালি হাতে শত্রুর হাত থেকে বাঁচার জন্য ক্যারাটে খেলা মানুষকে রক্ষা করে।
খেলোয়াড়ের শরীরের প্রতিটি অঙ্গ প্রত্যঙ্গ হলো এক একটি অস্ত্র। এই খেলাকে সহজে আয়ত্তে আনা যায়। অন্যন্য খেলা থেকে ক্যারাটে প্রতিযোগিতায় আহত হবার সম্ভাবনা থাকে বেশি। এই কারণে শরীরকে কঠিন পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে তৈরি করতে হয়। ইস্পাত কঠিন শরীর ক্যারাটের জন্য অতীব প্রয়োজনীয়।
কারাতে খেলার আইন কানুন । খেলাধুলার আইন
ক্যারাটে খেলার উৎপত্তি দেশ নিয়ে যতেষ্ট মতভেদ রয়েছে। অনেক দেশই নিজেদের ক্যারাটে খেলার জন্মদাতা দেশ হিসেবে দাবি করে। তবে ক্যারাটের উৎপত্তি হয় সম্ভবতঃ চীন ও জাপানে। তারাই আধুনিক বিশ্বে ক্যারাটে খেলাকে একটি জনপ্রিয় খেলা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া ছাড়াও ব্যাপক প্রচার প্রসার ছড়িয়ে দেয়।
চীনের কোনো শব্দ থেকে ক্যারাটের জন্ম। চীনাদের কোনো জাপানীদের হাতে ক্যারাটেই রূপ নিয়েছে। ১৬০৯ সালে জাপানে আইন করা হয়, “অস্ত্র ছাড়ো, কেংনো শেখো। পরবর্তীতে এই কেংনো খেলা সারা বিশ্বে ক্যারাটে হিসেবে ছড়িয়ে পড়ে।
পণ্ডিতদের ধারণায় ওকিনাওয়ারে সপ্তদশ শতাব্দীতে ক্যারাটের প্রচলন ছিল। সমাজতান্ত্রিক আমলে ঐদেশের লোকেরা রাজা বা জমিদারের শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। তারা কোন রকম অস্ত্র ব্যবহার করতে পারতেন না। ফলে তাদের বিনা অস্ত্রে আত্মরক্ষা করতে হতো।
এ কারণে তাদের বিভিন্ন কীশল আয়ত্ত্বে আনতে হয়েছিল। এর ফলে তারা বিনা অস্ত্রে আত্মরক্ষার এক নতুন কৌশল রপ্ত করে। একজন ক্যারাটেবিদের কাজ হবে দ্রুত লাফিয়ে শরীরকে শূন্যে তুলে পা জোড়া টান টান করে আক্রমণকারীর মুখ লক্ষ করে আঘাত করা, যাতে তার শক্ত পায়ের ঘায়ে আক্রমণকারী দূরে ছিটকে যায় এবং সেই অবসরে তিনি নিজেকে গুছিয়ে নিতে পারেন।
ধরা যাক একজন ক্যারাটেম্যান বেকায়দায় মাটিতে পড়ে গেছেন তখন তিনি কি কৌশল অবলম্বন করবেন? এই অবস্থায় তার উচিত শরীরকে মোচড় দিয়ে ঘুরিয়ে আক্রমণকারীর পেট লক্ষ করে পা দিয়ে আঘাত করা। এভাবে নিজেকে বাঁচাবার জন্য। ক্যারাটেম্যান হাত, পা, মাথা, হাতের আঙ্গুল, চেটো, চেটোর পাশ, গোড়ালি, পায়ের পাতা প্রভৃতিকে অস্ত্রের মত ব্যবহার করবেন। তবে এই সাথে একটা কথা মনে রাখতে হবে, ক্যারাটে শেখার বিপদ অনেক।
ক্যারাটে অনুশীলন এত কঠিন যে অনেক সময় জীবন সংশয়ের প্রশ্ন দেখা দেয়। সুতরাং আধুনিককালে ক্রীড়া গবেষকরা ক্যারাটোকে অনেকখানি সংশোধন করে ফেলেছেন। আর তাই আজ সারা পৃথিবী জুড়ে ক্যারাটের জয় জয়কার। বিশেষ করে আত্মরক্ষার কথা ভেবে সবাই এর প্রতি ঝুঁকে পড়ছেন।
ক্যারাটে শিক্ষা একজন খেলোয়াড়কে অতি পটু করে তুলতে পারে বলেই খেলোয়াড়দের মধ্যে গড়ে ওঠে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস। এই বিশেষ আত্মবিশ্বাসের ফলে তার প্রতি গড়ে ওঠে অন্যকে বা তার পাশাপাশি কোন দুর্বল মানুষকে অত্যাচারীর হাত থেকে রক্ষা করার দায়িত্ব। এ কারণে ক্যারাটে শেখার আগে প্রত্যেকে নিম্নোক্ত শপথ নিতে হয়ঃ
(১) আমি এ খেলা শিখছি এর কলা কৌশলের সব কটা ক্রিয়া স্পষ্ট ও সরলভাবে বুঝে নেয়ার জন্য।
(২) আমি কারো প্রতি হিংস্র হয়ে উঠবো না। এ খেলায় যতই দক্ষতা অর্জন করি না। কেন অহংকার আমাকে যেন স্পর্শ না করে।
(৩) আমি কোন অস্ত্রে বিশ্বাসী নই। আমি আমার ও অসহায় মানুষের জীবন রক্ষার জন্য শুধু এ বিদ্যা প্রয়োগ করবো।
(৪) কারো ওপর প্রতিহিংসা প্রয়োগের জন্য আমি এ বিদ্যা শিখবো না। অন্যকে আঘাত করা উদ্দেশ্য নয়, আত্মরক্ষার জন্য শেখা।
ক্যারাটে বর্তমানে একটি আন্তর্জাতিক খেলা। এই খেলাকে জনপ্রিয় করে তোলার জন্য এর বর্বর অংশকে বাদ দেয়া হয়েছে। প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, প্রতিযোগী প্রতিপক্ষকে খুব জোরে বা মারাত্মকভাবে আঘাত করতে পারবে না। পারফেক্ট ব্রো বা সঠিক মার এবং কিলিং ব্রো বা মারাত্মক মার প্রতিযোগীর গায়ে স্পর্শ করলেই চলে।
স্পর্শ করলেই প্রতিযোগী পুরো পয়েন্ট যাবে। তিন পয়েন্ট হলেই এক রাউন্ড শেষ হবে। যে প্রতিযোগী আগে ঐ পয়েন্ট জিতবে তিনি সে রাউন্ডে জয়ী হবেন। মার ঠিক না হলেও প্রতিদ্বন্দ্বিকে স্পর্শ করা যায়। তাতে আধ পয়েন্ট পাওয়া যায় ।
নিম্নোক্ত শরীরের অংশগুলো কোমল ও বেশি অনুভূতিশীল অঙ্গ বিধায় এইসব স্থানে আঘাত হানতে হবে;
(ক) মাথার তালু
(খ) গলার দু’পাশের অংশ
(গ) চোখ
(ঘ) কান
(ঙ) নাকের দু’পাশের অংশ
(চ) মুখ
(ছ) কন্ঠনালীর নিচের গর্ত
(জ) কাঁধের নিচের পাশের অংশ
(ঝ) পাঁজরা
(ঞ) হাঁটুর উপরের অংশ
(ট) কোমরের দু’পাশের অংশ
(ঠ) হাঁটুর নিচের হাড়
(ড) হাতের বা পায়ের তালু।

শরীরের যে অংশ দিয়ে প্রতিযোগী আঘাত করবেন, তা হলোঃ
(১) মাথার তালুতে মুষ্টি দ্বারা।
(২) গলার দু’পাশে—অঙ্গুলের ডগা দিয়ে।
(৩) চোখের কোনে আঙ্গুল দিয়ে।
(৪) কানে হাতের চেটোর বিপরীত অংশ দিয়ে।
(৫) নাকে—সরাসরি আঘাত করা উচিত নয়। রক্ত ঝরতে পারে। ফলে নাকের দু’পাশে মুষ্টি দ্বারা আঘাত করা যেতে পারে।
(৬) মুখের দু’পাশে-মুষ্টি প্রয়োগ করা যেতে পারে।
(৭) কণ্ঠনালীর নিচের গর্তে আঙ্গুলের চাপ দিয়ে, তবে তা সাংঘাতিক হবে না।
(৮) কাঁধের নিচের অংশে আঙ্গুলকে ছুরির মত ফলা করে ।
(৯) পাঁজরার ঠিক মধ্যস্থলে আঙ্গুলের ডগা দিয়ে ।
(১০) কনুইয়ের জোড়ায় করতল মুষ্ঠি করলে আঙ্গুলের যে গাঠগুলো ফুলে ওঠে তা দিয়ে।
(১১) নাভির পাশে আঙ্গুলে ডগা দিয়ে।
(১২) হাঁটুর উপরের অংশে—মুক্তি দিয়ে।
(১৩) কোমরের দু’পাশে কোমল স্থানে Knife hand ব্যবহার করা ভার ।
(১৪) হাঁটুর নিচের অংশে—হাড়ের উপর আঘাত হানবে পা দিয়ে অর্থাৎ সজোরে লাথি মেরে।(১৫) হাত বা পায়ের আঙ্গুল উল্টো দিকে মুড়ে ধরতে হবে ।
আগেই বলা হয়েছে, খেলোয়াড়েরা শরীরের প্রতিটি অঙ্গ অস্ত্রের মত ব্যবহার করবে। হাত, পা, আঙ্গুল, চেটো, আঙ্গুলের ডগা চেটোর দু’পাশ তাই শক্ত করে। হয় । এর জন্য গরম পানি, বালির বস্তায় ঘুষি, দড়ি জড়ানো কাঠের উপর ঘা মেরে বা নিতে ঘুষি মেরে এগুলি শক্ত করে নিতে হয়। হাতের চেটোর পাশকে লড়াইতে তলোয়ারের কোপের মত ব্যবহার করবে। এই মার কে বলা হয় ‘চপ’। ক্যারাতে লড়াইয়ে চপ হলো সেরা মার।
ক্যারাটে শিখতে বা প্রতিযোগিতায় শরীরকে নমনীয় রাখতে হয়। অর্থাৎ লড়াইয়ের সময় শরীরকে যেন যে কোন দিকে বাঁকানো যায়। এ জন্য রীতিমত ব্যায়াম করা দরকার।
খালি হাতে আত্মরক্ষার কৌশল সবার আগে আয়ত্ত্ব করতে হয়। তারপর আক্রমণ করার অনুশীলন। কব্জির প্রান্ত, পুরো বাহুর তলা বা নিচেকার অংশ দিয়েই প্রতিহত করার কাজ করতে হয়। প্রতিহত করাকে বলা হয় ব্লকিং। ব্লকিং পদ্ধতি আটাশ রকমের অনুশীলনে করা হয় ।
আক্রমণ প্রতিহত করার পর জানতে হয় প্রতি আক্রমণ করার পদ্ধতি। আক্রমণের প্রধান অস্ত্র হলো পা। এর জন্য ক্যারাটেম্যানকে বহু ধরনের লাথি মারার অভ্যেস করতে হয়।
এই দুই পদ্ধতির পর একজন ক্যারাটেম্যানকে শিখতে হয়, একইসাথে আক্রমণ প্রতিহত ও পাল্টা আক্রমণ পদ্ধতি। ইংরেজীতে একে বলা হয় “কমবাইনিং ডিফেন্স উইথ কাউন্টার এ্যাটাক”।
ক্যারাটে শিক্ষা একা একা শেখা সম্ভব নয়। এরজন্য সহযোগী প্রয়োজন। প্রাথমিক পর্যায়ে অনুশীলন ধীর গতিতে করা শ্রেয়। পরে মারগুলি আয়ত্ত্ব হলে দ্রুতলয়ে অনুশীলন করা দরকার ।
যিনি যত বেশি অনুশিলন করবেন তিনি তত বেশি দক্ষতা অর্জন করবেন। অনুশলীনই হলো ক্যারাটের মুল চাবিকাঠি।
